কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল থেকে গম সরবরাহে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার মধ্যে আবারও ভারত থেকে গম আমদানি শুরু করেছে বাংলাদেশ। ২০২২ সালে ভারত গম রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপের পর এবারই প্রথম বড় পরিসরে দেশটি থেকে গম কেনা হচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, আগস্টের শেষ দিকে ভারত গম রপ্তানিতে বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করার পর বাংলাদেশের আমদানিকারকেরা দেশটি থেকে দুই লাখ টনের বেশি গমের বুকিং দিয়েছেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল থেকে শস্য পরিবহনে এখনো বিভিন্ন ধরনের বাধা রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান গম রপ্তানি অঞ্চল হওয়ায় এ অঞ্চলের সরবরাহে চাপ তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দামেও এর প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশে বছরে ৭০ লাখ টনের বেশি গমের প্রয়োজন হয়। ২০২২ সালের আগে দেশের আমদানি করা গমের বড় অংশই ভারত থেকে আসত। ভারত রপ্তানি বন্ধ করার পর বাংলাদেশ আর্জেন্টিনা, কানাডা, রাশিয়া ও ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে গম আমদানি বাড়ায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল থেকে।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত থেকে বাংলাদেশে আমদানি করা গমের বড় অংশ রেলপথে পরিবহন করা হবে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর ভারতীয় গমের দাম প্রতি টন ৩০৫ থেকে ৩২৬ ডলার হতে পারে।
ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ধরে হিসাব করলে প্রতি কেজি গমের দাম দাঁড়ায় প্রায় ৩৭ টাকা ৫২ পয়সা থেকে ৪০ টাকা ১০ পয়সা। তবে এর সঙ্গে স্থানীয় পরিবহন, সংরক্ষণ, মজুত ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হলে বাজারদর আরও বাড়তে পারে।
সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার আমদানিকারকেরাও ভারত থেকে প্রায় ৬০ হাজার টন গম কিনেছেন। জাহাজে তোলার আগে প্রতি টনের দাম ছিল প্রায় ৩২৫ ডলার।
অভ্যন্তরীণ বাজারে গমের দাম বৃদ্ধি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ভারত ২০২২ সালের মে মাসে গম রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। এরপর নিয়মিত বাণিজ্যিকভাবে গম রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
প্রায় চার বছর পর ২০২৬ সালে নির্দিষ্ট কোটার আওতায় সীমিত পরিসরে আবার গম রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে ভারত। এই সুযোগেই বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের আমদানিকারকেরা ভারতীয় গম কেনা শুরু করেছেন।
এদিকে দেশে গমের তৈরি পরিশোধিত আটার দামও বেড়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে ঢাকার বাজারে পরিশোধিত গমের আটার দাম ১৭ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশে গম দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত খাদ্যশস্য। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম বাড়লে দেশের আটা-ময়দার বাজারেও এর প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে খাদ্য মূল্যস্ফীতির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের এশিয়া-প্যাসিফিক কৃষিপণ্য গবেষণা বিভাগের প্রধান ভ্লাদিমির জিনকোভস্কি ব্লুমবার্গকে বলেছেন, বাংলাদেশের জন্য বড় উদ্বেগ গমের সরবরাহ নয়; বরং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে গমের দাম রাখা।
তার মতে, গমের দাম বাড়তে থাকলে ভোক্তাদের একটি অংশ গমের পরিবর্তে চালের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে দেশের চালের চাহিদাও বাড়তে পারে।
ভারত থেকে নতুন করে গম আমদানির ফলে দেশের সরবরাহ পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম, আমদানি ব্যয় ও স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাপনার ওপরই শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব নির্ভর করবে।


























