শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রয়টার্সের প্রতিবেদন

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ

রানার ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:৪৫, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান জ্বালানি সংকটের প্রভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে বাংলাদেশে। এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়ে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বাড়ছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও কোথাও বন্ধও রাখতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পেও এর প্রভাব পড়েছে। ক্রেতারা রপ্তানি আদেশ কমিয়ে দিচ্ছেন বা বাতিল করছেন। একই সঙ্গে উৎপাদন বিলম্বের কারণে বাড়ছে জ্বালানি পরিবহন ব্যয়।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে এশিয়ার স্পট বাজারে এলএনজির দাম চলতি সপ্তাহে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে প্রায় ৩০ ডলারে উঠেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে দাম ছিল প্রায় ১০ ডলার। মধ্যপ্রাচ্য থেকে চলতি বছর বিশ্ববাজারে প্রায় কোটি ৬০ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ কমেছে বলে শেল-এর হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কাতারের সরবরাহে ধাক্কা

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানি করা এলএনজিনির্ভর। একসময় এই এলএনজির প্রায় ৯৫ শতাংশই কাতার থেকে আসত। কাতার থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশকে এখন স্পট মার্কেট থেকে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

জ্বালানি সরবরাহের এই সংকটের প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নেই। শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। এতে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ রয়টার্সকে বলেন, ‘শিল্পের প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যাচ্ছে এবং উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

পোশাকশিল্পে অর্ডার কমছে

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে সংকটের চিত্র আরও স্পষ্ট। পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর এক জরিপে দেখা গেছে, আগস্টের শেষ দিক থেকে গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ৫৫ শতাংশ নিট পোশাক কারখানা ক্রেতাদের কাছ থেকে রপ্তানি আদেশ বাতিল বা কমানোর মুখে পড়েছে। ৭৮ শতাংশ কারখানা আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে একটি পোশাক কারখানার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন চলাকালে কারখানাটির বয়লার নষ্ট হয়ে যায়। পরে মালিককে চীন থেকে কাপড় সংগ্রহ করতে হয়। এতে উৎপাদন সরবরাহে বিলম্ব হওয়ায় এক ক্রেতা ৫০ হাজার পিসের অর্ডার কমিয়ে ৪০ হাজার পিস করেন।

আরেক কারখানাকে উৎপাদন বিলম্বের কারণে ফ্রান্সের ক্রেতার কাছে নির্ধারিত সময়ে হুডি জ্যাকেট পৌঁছাতে বিমানপথে পাঠাতে হয়েছে। এতে তাদের অতিরিক্ত ৫০ হাজার ডলার ব্যয় হয়েছে বলে জানান ফাতুল্লাহ অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাজলি শামীম এহসান।

তিনি বলেন, ‘এর ওপর কারখানা চালু রাখতেই আমাদের ডিজেলের পেছনে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হয়েছে।

বিদ্যুৎ সংকটে খামার-হাসপাতাল

জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে উৎপাদন সেবার অন্যান্য খাতেও। টাঙ্গাইলে একজন পোলট্রি খামারি জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ না থাকায় খামারের শেডে বৈদ্যুতিক পাখা চালানো যাচ্ছে না। এতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি মুরগি মারা যাচ্ছে।

দেশের হাসপাতালগুলোতেও প্রায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জেনারেটরের সাহায্যে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র চালু রাখা সম্ভব হলেও ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। গরম ভিড়ের মধ্যে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগীদের।

এলএনজি টার্মিনাল সচলের উদ্যোগ

সংকট মোকাবিলায় সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের ফজলুল হক জানান, অচল একটি এলএনজি টার্মিনাল সচল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। টার্মিনালটি চালু হলে আরও বেশি এলএনজি ট্যাংকার থেকে গ্যাস খালাস করা সম্ভব হবে।

ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ সাম্প্রতিক দিনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ার কথাও জানিয়েছেন। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির উচ্চমূল্য সরবরাহ সংকট অব্যাহত থাকলে দেশের শিল্প বিদ্যুৎ খাতে চাপ কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে আমদানি সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর।

হরমুজ লোহিত সাগরে সংকট

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয় মাসেরও বেশি আগে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে সৌদি আরব ইরান-সমর্থিত হুতিদের মধ্যে সংঘাত লোহিত সাগর দিয়ে বাণিজ্য চলাচলেও ঝুঁকি তৈরি করেছে।

এই দুই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এশিয়ার এলএনজি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ এশিয়ার যেসব দেশের সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত, তারা সংকট মোকাবিলায় বাড়তি চাপে পড়েছে।

শেয়ার করুনঃ