মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিঙাড়ার জন্মকথা

মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাঙালির রান্নাঘরে

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৮:৪২, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাঙালির রান্নাঘরে

বাঙালির বিকেলের আড্ডা, চায়ের কাপ কিংবা অতিথি আপ্যায়ন— সবখানেই শিঙাড়ার উপস্থিতি বেশ পরিচিত। মচমচে খোলসের ভেতরে আলু, মশলা আর কখনো বাদাম কিংবা মটরশুঁটির পুর। রাস্তার পাশের দোকান থেকে অভিজাত মিষ্টির দোকান, সর্বত্রই এই খাবারের কদর। তবে শিঙাড়া কি আদতেই বাঙালির নিজস্ব খাবার? এর জন্ম কোথায়, কীভাবেই বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে এসে পৌঁছাল এই জনপ্রিয় মুখরোচক খাবার?

শিঙাড়ার ইতিহাসের সূত্র খুঁজতে গেলে যেতে হয় মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। ধারণা করা হয়, পারস্য অঞ্চলের একটি খাবার থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে শিঙাড়ার আগমন। পারসি শব্দ ‘সংবোসাগ’ বা ‘সাম্বুসা’ থেকে শিঙাড়া নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করেন একদল ইতিহাসবিদ। ইরানি ব্যবসায়ীদের হাত ধরে কয়েকশ বছর আগে এই খাবার ভারতবর্ষে আসে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাণিজ্যের কাজে ঘুরে বেড়ানো ব্যবসায়ীদের জন্য এটি ছিল সহজে বহনযোগ্য খাবার। ময়দার খোলের মধ্যে মাংসের পুর ভরে তৈরি করা হতো সাম্বুসা। রাতে সরাইখানায় অবস্থানকালে পরদিনের পাথেয় হিসেবেও তারা এই খাবার সঙ্গে রাখতেন।

শিঙাড়ার প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মধ্যযুগের নানা ঐতিহাসিক বর্ণনা। ইরানি ঐতিহাসিক আবুল ফজল বৈহাকির ‘তারিখ-এ-বৈহাগি’ গ্রন্থে সাম্বোসার উল্লেখ পাওয়া যায় বলে জানা যায়। তবে এই খাবারের ইতিহাস কেবল ব্যবসায়ীদের পথের খাবারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে এটি জায়গা করে নেয় রাজদরবারের খাবারের তালিকায়।

চতুর্দশ শতকের পর্যটক ইবন বতুতার বিবরণেও শিঙাড়ার কথা পাওয়া যায়। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের রাজসভায় পরিবেশন করা হতো এই খাবার। তবে সেই শিঙাড়া ছিল আজকের পরিচিত আলুর শিঙাড়ার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। তাতে পুর হিসেবে ব্যবহার করা হতো মাংস, পেস্তা, আখরোট ও বাদাম। রাজদরবারের রসনাবিলাসে শিঙাড়া যে বিশেষ স্থান করে নিয়েছিল, তা এসব বর্ণনা থেকেই বোঝা যায়।
মধ্যযুগের রান্নার ইতিহাসেও শিঙাড়ার বৈচিত্র্যের পরিচয় পাওয়া যায়। মালোয়ার সুলতানের রাজসভায় পরিবেশিত শিঙাড়ার কথা উল্লেখ রয়েছে বলে জানা যায়। পারসি ভাষায় লেখা মধ্যযুগের রান্নার বই ‘নিমতনামা’য় প্রায় আট ধরনের শিঙাড়ার বিবরণ রয়েছে। কোনো শিঙাড়ায় থাকত মাংস, কোনোটি তৈরি হতো হরিণের মাংস দিয়ে। আবার বাদাম, ক্ষীর ও গোলাপজলের মতো উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হতো মিষ্টি পুরের শিঙাড়া। অর্থাৎ শিঙাড়া তখন শুধু নোনতা খাবার ছিল না, মিষ্টি খাবার হিসেবেও এর প্রচলন ছিল।

মোগল আমলেও শিঙাড়ার পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা বাড়ে। আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থে ‘কুতাব’ নামে একটি খাদ্যদ্রব্যের উল্লেখ রয়েছে, যা ‘সামবোশাহ’ নামে পরিচিত ছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে মধ্যযুগের ভারতীয় রান্নায় এ ধরনের পুরভরা খাবারের উপস্থিতি দেখা যায়। তবে তখনকার শিঙাড়ার সঙ্গে আজকের বাঙালি শিঙাড়ার সবচেয়ে বড় পার্থক্য ছিল এর পুরে। আলু তখনো শিঙাড়ার অপরিহার্য উপাদান হয়ে ওঠেনি।
শিঙাড়ার ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আসে আলুর আগমনের পর। ষোড়শ শতকে পর্তুগিজদের মাধ্যমে আমেরিকা মহাদেশের এই ফসল ভারতীয় উপমহাদেশে পৌঁছায়। পর্তুগিজরা আলুকে ‘বাতাতা’ বা ‘বাটাটা’ নামে পরিচিত করেছিল। পরবর্তী সময়ে বাংলার রান্নাঘরেও জায়গা করে নেয় এই নতুন সবজি। ধীরে ধীরে আলু হয়ে ওঠে বাঙালির দৈনন্দিন খাবারের অন্যতম প্রধান উপকরণ। আলুর সহজলভ্যতা, স্বাদ এবং নানা মশলার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা একে জনপ্রিয় করে তোলে।

আলু যখন বাঙালির রান্নাঘরে নিজের জায়গা করে নিল, তখন শিঙাড়ার পুরেও তার প্রবেশ ঘটল। মাংসের পরিবর্তে আলু, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, আদা ও নানা মশলার মিশ্রণে তৈরি হতে থাকল নতুন ধরনের পুর। সেই পুর ময়দার খোলের মধ্যে ভরে তেলে ভেজে তৈরি হতে লাগল বাঙালির পরিচিত আলুর শিঙাড়া। তবে ঠিক কোন সময়ে এবং কোথায় আলুর শিঙাড়ার এই রূপটি প্রথম তৈরি হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।
বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতিতে শিঙাড়ার জনপ্রিয়তা বাড়ার পেছনে এর সহজলভ্যতা ও বহুমুখী ব্যবহারের ভূমিকা রয়েছে। অল্প উপকরণে তৈরি করা যায়, দীর্ঘ সময় ধরে ভাজা অবস্থায় রাখা সম্ভব এবং চায়ের সঙ্গে খেতেও বেশ সুস্বাদু। ফলে ঘরের রান্নাঘর থেকে শুরু করে রাস্তার খাবারের দোকান— সবখানেই শিঙাড়া হয়ে উঠেছে পরিচিত খাবার। অঞ্চলভেদে এর পুর ও আকৃতিতেও এসেছে নানা পরিবর্তন। কোথাও আলুর পুরে বাদাম, কোথাও মটরশুঁটি, আবার কোথাও ফুলকপি বা অন্য সবজির ব্যবহার দেখা যায়।

শিঙাড়া এখন বাঙালির সামাজিক জীবনেরও একটি পরিচিত অনুষঙ্গ। অতিথি এলে চায়ের সঙ্গে শিঙাড়া পরিবেশন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় শিঙাড়া ভাগাভাগি কিংবা বৃষ্টির দিনে গরম শিঙাড়া খাওয়ার আনন্দ— সবকিছুর মধ্যেই মিশে আছে এই খাবারের দীর্ঘ পথচলার গল্প।

মধ্যপ্রাচ্যের ব্যবসায়ীদের পথের খাবার থেকে রাজদরবারের বিলাসী পদ, সেখান থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের নানা অঞ্চলের রান্নাঘর ঘুরে বাঙালির বিকেলের নাশতা— শিঙাড়ার এই যাত্রা খাদ্য সংস্কৃতির এক চমৎকার ইতিহাস। আজকের আলুর শিঙাড়ায় হয়ত সেই প্রাচীন সাম্বুসার স্বাদ নেই, কিন্তু তার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার রয়ে গেছে প্রতিটি মচমচে কামড়ে। বিদেশ থেকে আসা একটি খাবার কীভাবে স্থানীয় উপকরণ ও রুচির সঙ্গে মিশে একান্ত আপন হয়ে উঠতে পারে, শিঙাড়া তারই এক সুস্বাদু উদাহরণ।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: