‘পানিই জীবন’—এই প্রবাদ যশোরের অনেক মানুষের বাস্তবতার সঙ্গে যেন ক্রমেই সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক, আয়রন, লবণাক্ততা ও অন্যান্য দূষণের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বেসরকারি এএএন এর তথ্য অনুযায়ী যশোরে চলতি বছরে আর্সেনিক আক্রান্ত ১১ জন মারা গেছেন।
যশোরের গ্রামীণ এলাকার ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে প্রকাশিত এক গবেষণায় ৭৩ শতাংশ নমুনায় আর্সেনিক এবং ৯৭ শতাংশ নমুনায় আয়রনের মাত্রা পানির মানদণ্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষণায় আর্সেনিকের কারণে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে পানিতে আর্সেনিকের মান ০.০১ মিলিগ্রাম/লিটার। বাংলাদেশের জাতীয় মানদণ্ডে তা ০.০৫ মিলিগ্রাম/লিটার। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় মানদণ্ডে সিসার সীমা ০.০৫ মিলিগ্রাম/লিটার।
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, যশোর জেলার ৯৭ দশমিক ৫২ শতাংশ সাধারণ খানার খাবার পানির প্রধান উৎস নলকূপ। জেলায় নলকূপের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার। এ ছাড়া পৌর ও গ্রামীণ এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিপুলসংখ্যক সাবমার্সিবল ও গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। ফলে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা অনেকাংশেই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল।
উপজেলাভেদে ঝুঁকি ভিন্ন
গবেষণা ও স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, যশোরের বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির সমস্যার ধরন এক নয়। কোথাও আর্সেনিক ও আয়রন, কোথাও লবণাক্ততা আবার কোথাও অন্যান্য দূষণের ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষ করে ঝিকরগাছা এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক, আয়রন ও ম্যাঙ্গানিজ নিয়ে একাধিক গবেষণা হয়েছে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত যশোরের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর আরেক গবেষণায় পৌর এলাকার পানির মান নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায়। গবেষণায় ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনাকে ‘গুড’, ৩২ দশমিক ৫ শতাংশকে ‘পুওর’, ২০ শতাংশকে ‘ভেরি পুওর’ এবং ২০ শতাংশকে ‘আনড্রিঙ্কেবল’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। গবেষণায় আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ও আর্সেনিককে কয়েকটি এলাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর্সেনিকের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, দীর্ঘদিন আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করলে স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা ০.০১ মিলিগ্রাম/লিটার বা তার বেশি হলে এটি মানুষের আর্সেনিক গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে।
যশোরের গ্রামীণ এলাকার গবেষণাতেও দীর্ঘমেয়াদি আর্সেনিক গ্রহণের সম্ভাব্য ক্যানসারজনিত ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে।
চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর ইউনিয়নের মাড়ুয়া গ্রামের বাসিন্দা কবির হোসেন বলেন, ‘আমার একটা বোন আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। আমাদের গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগী আছে। আমরা বিষ পান করছি জেনেও বাধ্য হয়ে এই পানিই খাচ্ছি।’
যশোর সদর উপজেলার চুরামনকাটি ইউনিয়নের ঝাউদিয়া গ্রামের সেফালী বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী গত বছর আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে তিল তিল করে মারা গেছেন। এখন আমার নিজের ও আমার ছোট ছেলের শরীরেও আর্সেনিকের সমস্যা হয়েছে।’
গবেষকের সতর্কতা
যশোর অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির এই বিপর্যয় নিয়ে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এবং কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ টরেন্টোর পিএইচডি গবেষক উম্মে ফারহানা খুশি।
উম্মে ফারহানা খুশি বলেন, ‘যশোর অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ও শিলাতাত্ত্বিক বুনট অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষ করে চৌগাছা ও সংলগ্ন এলাকায় মাটির পলি ও খনিজ স্তরে আর্সেনিক ও আয়রনের উপস্থিতি প্রাকৃতিকভাবেই বেশি।’
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন পরিকল্পনাহীনভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর নেমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পরিবেশে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। এর ফলে পানিতে বিভিন্ন উপাদানের ঘনত্ব বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
সিসা ও আর্সেনিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সিসা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশেষ করে শিশুদের বিকাশে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আর্সেনিকের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।’
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, ‘সুপেয় পানির সংকটজনিত কারণে জেলায় পানিবাহিত রোগ ও আর্সেনিকোসিস রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগ আক্রান্তদের চিকিৎসার পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছে।’
সরকারি উদ্যোগ
যশোর জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল আলিম গাজী বলেন, ‘আমরা সংকট নিরসনে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি। যেসব এলাকায় আর্সেনিক ও আয়রনের মাত্রা বেশি, সেখানে গভীর অ্যাকুইফার থেকে নিরাপদ পানি সংগ্রহের জন্য গভীর নলকূপ স্থাপনের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পানির মান অতিরিক্ত খারাপ হওয়া এলাকায় রিভার্স ওসমোসিস ও সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হচ্ছে। যশোর জেলায় নিরাপদ সুপেয় পানির জন্য মোট ২ হাজার ৫৫টি প্ল্যান্ট বসানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় সরকারি পানির উৎস পর্যাপ্ত নয়। কোথাও স্থাপিত নলকূপ ও ফিল্টার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা বাবুল আক্তার বলেন, ‘সরকারিভাবে যে গভীর নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। অনেক জায়গায় স্থাপনের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় নলকূপ অকেজো হয়ে পড়ে থাকে।’


























