কপোতাক্ষ নদের তীরে কপিলমুনি। নদীর জল, প্রাচীন জনপদের ধ্বংসাবশেষ, ঋষি কপিলের আশ্রমের কিংবদন্তি আর বারুণীর মেলা— সব মিলিয়ে এই জনপদের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু শতাব্দীর বিস্মৃত স্মৃতি। একসময় সুন্দরবনের অংশ বলে ধারণা করা এই অঞ্চলে মানুষের বসতি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রাচীন স্থাপনার যে চিহ্ন ছড়িয়ে রয়েছে, তার বিবরণ পাওয়া যায় যশোরের তৎকালীন কালেক্টর জেমস ওয়েস্টল্যান্ডের লেখায়।
ওয়েস্টল্যান্ডের বিবরণ অনুযায়ী, টাল্লা থেকে কিছুটা ভাটির দিকে কপোতাক্ষ নদের তীরে কপিলমুনি নামের স্থানে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ঋষি কপিলের আশ্রম বলে পরিচিত একটি স্থাপনার অবশেষ। স্থানীয় বিশ্বাস অনুসারে, বহু আগে ঋষি কপিল এখানে আশ্রম স্থাপন করেছিলেন। তখন এলাকাটি সম্ভবত সুন্দরবনের বিস্তৃত অরণ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি ছিলেন একজন সাধক বা ভক্ত এবং কপিলেশ্বরী দেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে ধারণা প্রচলিত ছিল। তবে তাঁর জীবন সম্পর্কে এর বেশি কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
জেমস ওয়েস্টল্যান্ড তাঁর বিবরণে স্পষ্ট করেছেন, এই কপিলের সঙ্গে হিন্দু পুরাণে বর্ণিত মহর্ষি কপিলের কোনো সম্পর্ক ছিল না। পুরাণে বর্ণিত সেই ঋষি রাজা সাগরের পুত্রদের ধ্বংস করেছিলেন। কপিলমুনির স্থানীয় সাধককে সেই পৌরাণিক ঋষির সঙ্গে এক করে দেখার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি তিনি পাননি। ফলে কপিলমুনির নামকরণের পেছনে স্থানীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সাধকের স্মৃতিই প্রধান সূত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
স্থানটির সবচেয়ে বিস্ময়কর নিদর্শন ছিল একটি বিশাল বটগাছ। নদীর তীরে বেড়ে ওঠা গাছটি তার শিকড় দিয়ে একসময়ের গৃহের ইটের দেয়াল আঁকড়ে ধরেছিল। ওয়েস্টল্যান্ডেরবর্ণনায়, গাছটি যেন প্রাচীন স্থাপনার ভেতর থেকেই জন্ম নিয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার শিকড় বাড়িটির কাঠামো চিরে ফেলেছে, আবার ভগ্নাংশগুলোকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। নদীপথে নৌকায় যাতায়াতের সময় গাছের নিচে কেবল বাড়িটির দেয়ালগুলোই দেখা যেত। প্রকৃতির এই দীর্ঘ আগ্রাসন ও সংরক্ষণের অদ্ভুত সহাবস্থান প্রাচীন স্থাপনাটিকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল।
কপিলেশ্বরী দেবীর পুরোনো মন্দিরটি ওয়েস্টল্যান্ডের সময়ের অনেক আগেই ধসে পড়েছিল। পরে ঝিকরগাছার স্থানীয় এক কৃষক বা ইজারাদার মিস্টার ম্যাকেঞ্জি প্রায় পঁচিশ বছর আগে সেখানে একটি নতুন মন্দির নির্মাণ করেন। সেটি ছিল সমতল ছাদ ও বিমের ওপর দাঁড়ানো আধুনিক ধরনের ভবন। কিন্তু ১৮৬৭ সালের প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে সেই মন্দিরটিও ভেঙে পড়ে। ওয়েস্টল্যান্ডের লেখায় জানা যায়, তাঁর সময়ের জমিদার দেবী কপিলেশ্বরীর জন্য নতুন মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছিলেন। তখন দেবীকে একটি সাধারণ খড়ের ঘরে রাখা হয়েছিল। মন্দিরের বারবার ধ্বংস ও পুনর্র্নিমাণের এই ইতিহাস কপিলমুনির ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবও তুলে ধরে।
কপিলমুনির ধর্মীয় ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় প্রকাশ ছিল চৈত্র মাসে অনুষ্ঠিত বারুণী মেলা। প্রতি বছর বারুণী তিথিতে কপিলেশ্বরী দেবীর সম্মানে এখানে বিশাল মেলার আয়োজন হতো। দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ সমবেত হতেন। স্থানীয় বিশ্বাস ছিল, বছরের ওই বিশেষ দিনে কপিলমুনির পাশ দিয়ে প্রবাহিত কপোতাক্ষ নদ গঙ্গার জলের মতো পবিত্রতা ও পুণ্য লাভ করে। সেই বিশ্বাসে বহু মানুষ নদীতে স্নান করতেন। ওয়েস্টল্যান্ডের বিবরণে উল্লেখ রয়েছে, উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে এই বিশ্বাসের প্রচলন তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও নিম্নবর্ণের মানুষেরা নির্দিষ্ট দিনে পবিত্রতার আশায় নদীতে স্নান করতেন। তাঁদের বিশ্বাসে এই পবিত্রতার উৎস ছিলেন ঋষি কপিল ও দেবী কপিলেশ্বরী।
বারুণী মেলাকে ঘিরে মানুষের এই সমাবেশ কপিলমুনিকে একটি বৃহত্তর ধর্মীয় ও সামাজিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। নদীকেন্দ্রিক জনপদে ধর্মীয় আচার, মেলা ও তীর্থযাত্রা শুধু বিশ্বাসের বিষয় ছিল না, মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ ও স্থানীয় অর্থনীতিরও অংশ ছিল। তবে ওয়েস্টল্যান্ডের বিবরণ থেকে মেলার সূচনাকাল বা তার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।
কপিলমুনির ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই অঞ্চলে একসময় যে প্রাচীন জনবসতি ছিল, তার কোনো ধারাবাহিক লোকস্মৃতি তখনকার মানুষের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। ওয়েস্টল্যান্ডের ধারণা ছিল, কৃষিকাজের প্রসারের ফলে প্রায় একশো বছর আগে নতুন বসতি স্থাপনকারীরা এই এলাকায় আসেন। তাঁদের আগমনের আগে এখানে নিরবচ্ছিন্ন জনবসতি ছিল না বলেই তিনি মনে করেছিলেন। ফলে নতুন বসতি স্থাপনকারীরা প্রাচীন আশ্রম বা ধ্বংসাবশেষ সম্পর্কে যা কিছু জানতে পেরেছিলেন, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কেবল সেই সীমিত স্মৃতিই পৌঁছেছিল।
কপিলমুনি থেকে প্রায় এক মাইল দূরে আগ্রা নামের স্থানে প্রাচীন বসতির আরও কিছু নিদর্শন ছিল। সেখানে দুই-তিনটি বড় ঢিবি দেখতে পেয়েছিলেন ওয়েস্টল্যান্ড। এর মধ্যে একটি ঢিবি খনন করে তিনি প্রাচীন ইটের তৈরি বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান। খনন করা গর্তে নেমে বাড়ির দেয়াল ও জানালার চিহ্ন স্পষ্টভাবে দেখা যেত। তাঁর ধারণা ছিল, অন্য ঢিবিগুলোর নিচেও একই ধরনের স্থাপনা চাপা পড়ে রয়েছে। এসব বাড়ির নির্মাণকাল কিংবা সেখানে কারা বসবাস করতেন, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব হয়নি।
ওয়েস্টল্যান্ডের পর্যবেক্ষণে আরও জানা যায়, টাল্লা থেকে দক্ষিণে চাঁদখালি পর্যন্ত প্রায় চৌদ্দ মাইল দীর্ঘ এলাকায় বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের ঢিবি ছড়িয়ে ছিল। অর্থাৎ কপিলমুনি ও তার আশপাশের অঞ্চলজুড়ে একসময় একাধিক প্রাচীন বসতি গড়ে উঠেছিল বলে ধারণা করা যায়। ঢিবির নিচে পাওয়া বাড়িগুলোর আকার ছিল স্বচ্ছল কৃষকের বাড়ির মতো। তবে আরও বড় স্থাপনা সেখানে ছিল কি না, সে সম্ভাবনাও তিনি উড়িয়ে দেননি। কিছু নিচু জায়গা ও গর্ত দেখে তাঁর ধারণা হয়েছিল, সেগুলো হয়ত একসময় বাড়ির পাশে থাকা পুকুরের অবশিষ্টাংশ। তবে তিনি যে ঢিবিগুলো পরীক্ষা করেছিলেন, সেগুলোর চারপাশে কোনো প্রতিরক্ষা দেয়াল বা পরিখার চিহ্ন পাননি।
ওয়েস্টল্যান্ডের অনুমান ছিল, তাঁরা হয়ত এই অঞ্চলের প্রাচীন অধিবাসী ছিলেন, যাঁরা পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যান। তাঁদের বসতি, স্থাপনা ও কীর্তির চিহ্ন মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকলেও পরবর্তী জনগোষ্ঠীর কাছে তাঁদের পরিচয় অজানাই থেকে যায়।
তবে ওয়েস্টল্যান্ডের এই পর্যবেক্ষণকে প্রাচীন জনবসতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিবরণ হিসেবে দেখা গেলেও, ঢিবিগুলোর সুনির্দিষ্ট বয়স বা সেখানে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর পরিচয় নির্ধারণের জন্য প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।


























