সকাল হলেই স্টিয়ারিংয়ে হাত। এরপর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে এক মাঠ থেকে আরেক মাঠে ছুটে চলা। কখনো কৃষকের জমি পরিদর্শন, কখনো সরকারি প্রণোদনা বিতরণ, কখনো কৃষি বিভাগের কর্মসূচি। কাদা-পানি, রোদ-বৃষ্টি কোনো কিছুই দায়িত্ব পালনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। কৃষকের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে প্রতিদিনই সচল থাকে সরকারি গাড়ির চাকা।
কিন্তু সেই গাড়ির চাকা সচল রাখা মানুষগুলোর সংসারের চাকা যেন থেমে গেছে। প্রায় ১১ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না ঝিনাইদহের পাঁচ উপজেলা কৃষি অফিসে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া পাঁচ গাড়িচালক। চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে তাঁদের বেতন বন্ধ রয়েছে। নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেও পারিশ্রমিক না পাওয়ায় পরিবার নিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন তাঁরা।
ঝিনাইদহ সদর, মহেশপুর, শৈলকূপা, কোটচাঁদপুর ও হরিণাকুণ্ডু উপজেলা কৃষি অফিসে কর্মরত এসব চালকের এখন একটাই প্রশ্ন—দায়িত্ব পালন করেও তাঁদের প্রাপ্য বেতন কবে মিলবে?
১৩ বছর চাকরি, তবু অনিশ্চয়তা
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি অফিসের গাড়িচালক আব্দুর রাজ্জাক ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেন। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে একই দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। চাকরিজীবনে বিভিন্ন সময়ে বেতন পেতে বিলম্ব হয়েছে, কখনো বন্ধও থেকেছে। কিন্তু চাকরি ছাড়েননি। কারণ, এই চাকরিই তাঁর পরিবারের প্রধান অবলম্বন।
সদর উপজেলার পোড়াহাটি ইউনিয়নের ধানহাড়িয়া-চুয়াডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘২০১৩ সাল থেকে চাকরি করছি। এত বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছি। বেতন দেরি হয়েছে, বেতন বন্ধও ছিল। তারপরও চাকরি ছেড়ে দিইনি। কারণ এই চাকরিটাই আমার পরিবারের ভরসা। কিন্তু ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে এক টাকাও বেতন পাইনি।’
দুই সন্তান নিয়ে তাঁর সংসার। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে ও ১৬ মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে পরিবার। স্ত্রী দর্জির কাজ করে যে সামান্য আয় করেন, সেটিই এখন সংসারের প্রধান ভরসা।
আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘প্রতিদিন অফিসের গাড়ি নিয়ে বের হই। কর্মকর্তাদের নিয়ে মাঠে যাই, কৃষকের কাছে যাই। অথচ নিজের সন্তানদের জন্য ঠিকমতো খাবার বা প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দিতে পারি না।’
মেয়ের আবদারেও জোটে না বাবার উত্তর
বেতন না পাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সন্তানদের ওপর। আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমার মেয়েটা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। তার স্কুলের খরচ আছে, পড়াশোনার খরচ আছে। ছোট ছেলেটার বয়স মাত্র ১৬ মাস। ওর জন্যও কত কিছু দরকার।’
‘মেয়েটা কিছু চাইলে অনেক সময় বলতে হয়—এখন না, পরে দেব। কিন্তু সেই পরে আর আসে না। একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে?’
সংসার চালাতে স্ত্রী দর্জির কাজ করছেন। তাতেও প্রয়োজন মেটানো যাচ্ছে না। আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘একদিকে বাজারের খরচ, অন্যদিকে সন্তানদের পড়াশোনা—সব মিলিয়ে খুব কষ্টে আছি। ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে। মানুষকে হাত পাততেও লজ্জা লাগে। আমরা তো কাজ করছি, আমাদের বেতনটা চাইছি; কারও দয়া চাইছি না।’
নিজের অবস্থার কথা বলতে গিয়ে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘সারাদিন অন্যের সংসারের কাজ সচল রাখতে গাড়ি চালাই। কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে গেলে কৃষকের কাজ হয়, কৃষকের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে যায়।’
এরপরই তাঁর প্রশ্ন, ‘কিন্তু দিন শেষে যখন নিজের ঘরে ফিরি, তখন মনে হয়—আমার সংসারের চাকা কেন চলছে না?’
তিনি বলেন, ‘গাড়ির চাকা থামলে ঠিক করা যায়, কিন্তু সংসারের চাকা থেমে গেলে সন্তানদের মুখের দিকে তাকানো খুব কঠিন।’
একই পরিস্থিতি অন্য চার উপজেলায়
শুধু আব্দুর রাজ্জাক নন, একই পরিস্থিতির মুখোমুখি জেলার অন্য চার উপজেলা কৃষি অফিসে কর্মরত আউটসোর্সিংয়ের গাড়িচালকেরাও।
শৈলকূপা উপজেলা কৃষি অফিসের গাড়িচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বেতন না পাওয়ায় দোকানে বাকি হয়েছে, মানুষের কাছ থেকে ধার করতে হয়েছে। সন্তানদের প্রয়োজন মেটাতে না পারলে একজন বাবার যে কষ্ট হয়, সেটা ভাষায় বলা যায় না।’
তিনি বলেন, ‘অফিসের গাড়ি ঠিকমতো চলার জন্য যেমন জ্বালানি লাগে, আমাদের সংসার চালাতেও তো টাকার প্রয়োজন। আমরা কাজ করছি, তাই আমাদের প্রাপ্য বেতনটুকু সময়মতো পাওয়াই আমাদের দাবি।’
চালকদের অভিযোগ, বেতন বন্ধ থাকলেও কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে তাঁদের দায়িত্ব বন্ধ হয়নি। প্রতিদিন সরকারি গাড়ি নিয়ে কর্মকর্তাদের নির্ধারিত কর্মসূচিতে পৌঁছে দিচ্ছেন তাঁরা। কৃষকের জমি পরিদর্শন, সরকারি প্রণোদনা বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতেও গাড়ি চালাতে হচ্ছে। ফলে দায়িত্ব পালন করেও পরিবার চালাতে ধারদেনার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বেতন বন্ধ, দায়িত্ব বন্ধ নেই
চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন বেতন না পেলেও তাঁরা দায়িত্ব পালন অব্যাহত রেখেছেন। সরকারি গাড়ি নিয়ে প্রতিদিন মাঠে যাচ্ছেন, কর্মকর্তাদের কর্মসূচিতে সহযোগিতা করছেন।
অর্থাৎ বেতন বন্ধ থাকলেও তাঁদের দায়িত্ব বন্ধ নেই। এ অবস্থায় তাঁদের প্রশ্ন—নিয়মিত দায়িত্ব পালন করা একজন কর্মীর প্রাপ্য পারিশ্রমিক পেতে এত দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে কেন?
‘তাদের কষ্ট আমাদের চোখের সামনে দেখতে হয়’
ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কামরুজ্জামান বলেন, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া গাড়িচালকদের বেতন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় তাঁরা কষ্টে আছেন।
তিনি বলেন, ‘তারা খুবই নিম্নআয়ের মানুষ। মাসের পর মাস বেতন না পাওয়ায় তাদের সংসার চালানো, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা—সবকিছুই কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই তাদের কষ্ট আমাদের চোখের সামনে দেখতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘একজন মানুষ সারাদিন দায়িত্ব পালন করার পরও যদি মাস শেষে তার পারিশ্রমিক না পান, তাহলে তার পরিবারের ওপর কী ধরনের চাপ পড়ে, সেটা সত্যিই বেদনাদায়ক। আমরা বিষয়টি নিয়ে নিজেরাও উদ্বিগ্ন।’
বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা হলে এসব পরিবারের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে বলে জানান তিনি।
দয়া নয়, প্রাপ্য পারিশ্রমিক চান তাঁরা
কৃষকের মাঠে সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে যাঁদের গাড়ি প্রতিদিন ছুটে চলে, তাঁদের নিজেদের পরিবারেই এখন আর্থিক অনিশ্চয়তা। সন্তানদের পড়াশোনা, বাজার-সদাই ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামলাতে হচ্ছে ধারদেনা করে।
তবু তাঁদের দাবি খুব বেশি নয়। তাঁরা দান বা অনুদান চান না। চান, যে কাজ করছেন তার ন্যায্য পারিশ্রমিক।
চালকদের প্রত্যাশা, দ্রুত তাঁদের বেতন চালু করা এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া পারিশ্রমিক পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে। তবেই অন্যের কৃষির চাকা সচল রাখতে ছুটে চলা এই মানুষগুলোর নিজেদের সংসারের চাকাটিও আবার ঘুরতে শুরু করবে।


























