বুধবার ০৭ অক্টোবর ২০২৬

২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ওয়েস্টল্যান্ডের চোখে জেলার চিত্র

ইংরেজ শাসনের শুরুতে যশোরের জমিদারি 

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৩:০৭, ৬ অক্টোবর ২০২৬

ইংরেজ শাসনের শুরুতে যশোরের জমিদারি 

যশোরের ইতিহাসে ইংরেজ শাসনের সূচনাপর্ব ছিল এক গভীর পরিবর্তনের সময়। মুঘল প্রশাসনের দীর্ঘ পর্ব পেরিয়ে জেলা যখন ইংরেজদের হাতে আসে, তখন এখানকার ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা, জমিদারি কাঠামো এবং স্থানীয় ক্ষমতার বিন্যাস ছিল বেশ জটিল। নতুন শাসকগোষ্ঠীকে সেই বিদ্যমান ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়েই তাদের প্রশাসন গড়ে তুলতে হয়েছিল। 

যশোরের তৎকালীন কালেক্টর জেমস ওয়েস্টল্যান্ড তাঁর ‘এ রিপোর্ট অন দ্যা ডিস্ট্রিক্ট অফ যশোর’ গ্রন্থে ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রথম ত্রিশ বছর— ১৭৮১ থেকে ১৮১১ সাল পর্যন্ত জেলার পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ দিয়েছেন। ১৮৭১ সালের পূর্বে জেলার অবস্থা নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি ব্রিটিশদের হাতে যশোরের প্রশাসন চলে আসার সময়কার জমিদারি কাঠামো সম্পর্কে বেশ কিছু মূল্যবান তথ্য তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের বিশেষত্ব হলো— জেলার প্রাচীন নথিপত্রে সবকিছু সরাসরি ও স্পষ্টভাবে লেখা না থাকলেও প্রথম দিকের সরকারি নথিতে ছড়িয়ে থাকা নানা তথ্য পর্যালোচনা করে সেই সময়ের বাস্তব পরিস্থিতির একটি চিত্র পাওয়া যায়।
ওয়েস্টল্যান্ডের বর্ণনা থেকে জানা যায়, ইংরেজদের হাতে যশোর আসার সময় জেলাটি মূলত তিন বা চারটি বড় জমিদারির মধ্যে বিভক্ত ছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল রাজা শ্রীকান্ত রায়ের ইসফপুর এস্টেট। ভৈরব ও পশুর নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল থেকে পশ্চিমে প্রায় ইছামতি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বিশাল ভূখণ্ডের জমিদার ছিলেন তিনি। উত্তরে তাঁর জমিদারির সীমানা এমন একটি অঞ্চলে গিয়ে শেষ হয়েছিল, যার মধ্য দিয়ে পরবর্তীকালে কলকাতা থেকে যশোর ও ঢাকা পর্যন্ত রাজকীয় সড়ক নির্মিত হয়।

এই বিশাল জমিদারিটি ছিল ইসফপুর এস্টেট নামে পরিচিত। তবে ওয়েস্টল্যান্ডের তথ্য অনুযায়ী, পুরো জমিদারিটি রাজা শ্রীকান্ত রায়ের হাতে ছিল না। মূল জমিদারির বারো আনা অংশ তাঁর অধীনে থাকলেও চার আনা অংশ আলাদা করে একজন মুসলমান জমিদারকে দেওয়া হয়েছিল। পৃথক এই অংশের মধ্যে প্রধানত সৈয়দপুর ও সাহোস পরগনার জমি ছিল। সৈয়দপুরের নাম অনুসারেই এস্টেটটি সৈয়দপুর এস্টেট নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
ইসফপুরের উত্তরে ছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জমিদারি—মুহাম্মদশাহী। সে সময় এটি নলডাঙ্গা পরিবারের অধিকারে ছিল। ওয়েস্টল্যান্ড এর সীমানাকে তৎকালীন মানচিত্রে মুহাম্মদশাহী পরগনার জন্য নির্ধারিত সীমানার সঙ্গে প্রায় অভিন্ন বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ নলডাঙ্গা রাজপরিবারের জমিদারি প্রভাব যশোরের উত্তরাঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য ভূখণ্ডে বিস্তৃত ছিল।

এরপর ছিল ভূষণা জমিদারি। এটি ছিল নাটোরের রাজার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। ভূষণা জমিদারির বিস্তার ছিল অত্যন্ত বড়। এর মধ্যে বর্তমান ফরিদপুর জেলার একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছাড়াও যশোরের নলদি পরগনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ওয়েস্টল্যান্ডের বর্ণনায় বৃহত্তর অর্থে সাতোর ও মকিমপুরের মতো পরগনাও এই ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে ভূষণা নাটোরের রাজার বিশাল রাজ্যের অংশ হলেও প্রশাসনিক ও জমিদারি কাঠামোর দিক থেকে এটি একটি পৃথক জমিদারি হিসেবেই বিবেচিত হতো।

এই বড় জমিদারিগুলোর বাইরে যশোরে ছিল আরও কয়েকটি ছোট জমিদারি। সেগুলোর মধ্যে হোগলা ও বেলফুলিয়া পরগনা ছিল উল্লেখযোগ্য। ওয়েস্টল্যান্ডের বর্ণনা অনুযায়ী, এই দুই পরগনা কৃষ্ণ সিং রায়ের মালিকানাধীন ছিল। তাঁর পরিবার সম্পর্কে ওয়েস্টল্যান্ড তেমন কোনো তথ্য দিতে পারেননি। শুধু জানিয়েছেন, পরবর্তীকালে তাঁর উত্তরাধিকারীরা নিজেদের অংশ নিয়ে দীর্ঘদিন বিরোধে লিপ্ত ছিলেন। 

জেলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের জমিদারি কাঠামোও ছিল বেশ বৈচিত্র্যময়। পূর্বে উল্লিখিত জমিদারি ও সেলিমাবাদের সঙ্গে মিলে এই অঞ্চলের একটি অংশ পূর্ণ করেছিল সুলতানপুর পরগনা। এর জমিদার ছিলেন কাশীনাথ দত্ত। কিন্তু তাঁর জমিদার হয়ে ওঠার কাহিনি ওয়েস্টল্যান্ডের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই ঘটনা থেকেই তিনি দেখাতে চেয়েছেন— চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পূর্ববর্তী সময়ে ভূমির মালিকানা সম্পর্কে ব্রিটিশ প্রশাসনের ধারণা কতটা ভিন্ন ছিল এবং জমিদারি অধিকার তখনও কতটা অনিশ্চিত অবস্থায় ছিল।

১৭৭৪ সালে সুলতানপুরের তৎকালীন জমিদাররা রাজস্বের বকেয়া পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন। শুধু ব্যর্থই হননি, তাঁরা বকেয়া পরিশোধ করবেন না বলেও জানিয়েছিলেন। রাজস্ব কমিটি তখন সভাপতি ও পরিষদের কাছে সুপারিশ করে যে, ওই জমিদারদের জমিদারি থেকে উচ্ছেদ করা হোক। একই সঙ্গে কাশীনাথ দত্তের প্রস্তাবের কথা জানানো হয়। তিনি বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করতে প্রস্তুত ছিলেন এবং জমিদারিটি তাঁর নামে হস্তান্তর করা হলে ভবিষ্যতের রাজস্বও পরিশোধের দায়িত্ব নিতে সম্মত হয়েছিলেন।

১৭৭৪ সালের ১৬ মে গভর্নর জেনারেল এই প্রস্তাব অনুমোদন করেন। এর কিছুদিন পর রাজস্ব কমিটি আবার জানায়, কাশীনাথ দত্ত বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করেছেন এবং ভবিষ্যতের রাজস্ব দেওয়ার অঙ্গীকারও করেছেন। এর ফলেই তাঁকে সুলতানপুর জমিদারির দখল দেওয়া হয়। 

ওয়েস্টল্যান্ড তাঁর আলোচনায় চাঁচড়া রাজার বংশের ইতিহাসের কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, চাঁচড়া রাজপরিবারের ইতিহাসে এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা তিনি দেখেছেন, যেখানে শাসকগোষ্ঠী কোনো খেলাপি জমিদারের কাছ থেকে বকেয়া আদায়ের নিশ্চয়তার বিনিময়ে একজন বহিরাগত ব্যক্তির কাছে জমিদারির মালিকানা হস্তান্তর করেছিল। তবে ব্রিটিশ সরকার একই ধরনের নীতি গ্রহণ করেছিল—এমন দৃষ্টান্ত তাঁর জানা মতে খুব বেশি ছিল না। সুলতানপুরের ঘটনাটিই ছিল তাঁর নজরে আসা অন্যতম দৃষ্টান্ত।

এই ঘটনার পরিণতিও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। পুরোনো জমিদাররা কাশীনাথ দত্তের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাঁদের দাবি ছিল, কাশীনাথ দত্ত প্রকৃত জমিদার নন; তিনি কেবল আজীবনের জন্য একজন কৃষক বা দখলদার হিসেবে জমি পেয়েছেন। তাঁদের যুক্তির আরেকটি দিক ছিল—সরকার যে প্রক্রিয়ায় তাঁদের জমিদারি থেকে সরিয়ে কাশীনাথ দত্তকে দখল দিয়েছিল, সেই সিদ্ধান্তে পুরোনো জমিদারদের স্থায়ীভাবে উচ্ছেদের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
ওয়েস্টল্যান্ড ১৭৯০ সালের ১৯ অক্টোবরের একজন বিচারকের চিঠির সূত্রে এই ঘটনার কথা জানতে পেরেছিলেন। সেই চিঠিতে কাশীনাথ দত্তকে ঘিরে উদ্ভূত আইনি কার্যক্রমের উল্লেখ ছিল। তবে মামলার চূড়ান্ত রায় কী হয়েছিল, সে বিষয়ে ওয়েস্টল্যান্ড নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি। কিন্তু একটি বিষয় তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন—কাশীনাথ দত্ত শেষ পর্যন্ত জমিদারিটি ধরে রেখেছিলেন।

পরবর্তীকালে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদারদের অধিকারের ক্ষেত্রে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে। কিন্তু ওয়েস্টল্যান্ডের বর্ণিত সুলতানপুরের ঘটনা তার আগের সময়ের বাস্তবতা বুঝতে সাহায্য করে। তখন জমিদারি অধিকার এখনও এমন কোনো সুস্পষ্ট ও স্থায়ী সম্পত্তিগত অধিকারে পরিণত হয়নি, যা পরবর্তী চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের যুগে দেখা যায়। বরং রাজস্ব আদায়ের প্রয়োজন এবং সরকারের সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে জমিদারির নিয়তি নির্ধারণ করত।

ওয়েস্টল্যান্ডের চোখে আঠারো শতকের শেষভাগের যশোর তাই ছিল এক বহু বিভক্ত জমিদারি ভূখণ্ড। ইংরেজ প্রশাসন যখন এই অঞ্চলে নিজেদের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করল, তখন তাদের সামনে ছিল এই জটিল জমিদারি কাঠামো। পরবর্তী কয়েক দশকে সেই কাঠামোর ওপর দিয়েই গড়ে উঠল নতুন রাজস্ব প্রশাসন, আদালত ও জেলা শাসনের ব্যবস্থা। 
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: