রোববার ১১ অক্টোবর ২০২৬

২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যশোরে ব্রিটিশ পুলিশের পুনর্গঠন 

১৭৮১ সালে মুরলিকে কেন্দ্র করে নতুন ব্যবস্থা

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৪:৫৪, ১০ অক্টোবর ২০২৬

১৭৮১ সালে মুরলিকে কেন্দ্র করে নতুন ব্যবস্থা

১৭৮১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে মি. হেনকেল যশোরের মুরলিতে এসে পৌঁছান। এর কিছুদিন পরই তিনি জেলার পুলিশ ব্যবস্থার পুনর্গঠনের জন্য প্রস্তাব পেশ করেন। যশোরে ব্রিটিশ শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, ডাকাতি ও দস্যুতা দমন এবং প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বিস্তারের ক্ষেত্রে তাঁর এই উদ্যোগ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। 

হেনকেল যশোরে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই ফৌজদারদের পদ ও কর্তৃত্ব প্রত্যাহার করা হয়েছিল। ফৌজদারদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ এই সিদ্ধান্তে স্বস্তি পেয়েছিল। তৎকালীন পুলিশ ব্যবস্থার চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে পরিচালিত এই ব্যবস্থার সঙ্গে নিপীড়ন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। পুলিশ প্রশাসনের অধীনে থাকা কিছু কর্মকর্তা এবং তাদের অধস্তন কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ ছিল। ফলে অপরাধ দমনের জন্য গড়ে ওঠা ব্যবস্থাটিই অনেক ক্ষেত্রে জনসাধারণের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

তৎকালীন যশোর জেলায় চারটি প্রধান থানা ছিল— ভূষনা, মির্জানগর, নয়াবাদ ও ধর্মপুর। মির্জানগর ছিল ত্রিমোহিনীর নিকটবর্তী এলাকায়, নয়াবাদ বর্তমানে খুলনা অঞ্চলের অন্তর্গত বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব থানার অধীনে কয়েকটি চৌকিও ছিল। অন্য একটি স্থানে শাহজিয়ালী নামের একটি থানার উল্লেখ রয়েছে। এই বিবরণ থেকে বোঝা যায়, জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একটি প্রাথমিক পুলিশি কাঠামো আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। তবে সেই কাঠামোর কার্যকারিতা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন ছিল।

থানাগুলোতে বেতনভুক্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত থাকলেও চৌকিগুলো পরিচালিত হতো মূলত বিনা বেতনের গোয়েন্দা বা গুপ্তচরদের মাধ্যমে। জীবিকা নির্বাহের জন্য এসব লোক নিরপরাধ ব্যক্তিদের আটক করে তাঁদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করত বলে বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব ছিল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ফৌজদার ও থানাদারদের। কিন্তু তাঁরা এই অনিয়ম বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছিলেন, এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদেরও এই দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে পুলিশি কার্যক্রমের সঙ্গে অপরাধ দমনের পাশাপাশি নির্যাতন ও অবৈধ অর্থ আদায়ের একটি প্রবণতাও যুক্ত হয়ে পড়েছিল।
তবে তৎকালীন পুলিশ ব্যবস্থা অপরাধ দমনে একেবারেই অকার্যকর ছিল, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। হেনকেল নিজেই দাবি করেছিলেন, চারটি থানার প্রতিষ্ঠার ফলে ডাকাত ও দস্যুদের পক্ষে শাস্তি এড়িয়ে লুটপাট চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে ফৌজদারদের অত্যাচার এবং অধস্তন কর্মচারীদের সঙ্গে ডাকাতদের আঁতাতের অভিযোগ পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হেনকেল যশোরে দায়িত্ব গ্রহণের সময় জেলায় প্রায় ৫০ জনের একটি শক্তিশালী ডাকাত দল ঘুরে বেড়াচ্ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, বিদ্যমান পুলিশ ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অপরাধ দমনে গুরুতর সীমাবদ্ধতা ছিল।

তৎকালীন প্রশাসনের কাছে পুলিশি সাফল্যের মানদণ্ডও বর্তমান সময়ের মতো ছিল না। মিঃ হেনকেলের প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য ছিল বিদ্যমান ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলার পরিবর্তে পুলিশি দায়িত্বে নতুন লোক নিয়োগ এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা। বিলুপ্ত দুটি ফৌজদারি পদের ক্ষমতা ও দায়িত্ব নিজের হাতে নিয়ে তিনি চারটি থানায় একজন করে প্রধান পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগের প্রস্তাব করেন। তাঁদের প্রধান কাজ হতো ডাকাতদের গ্রেপ্তার করা এবং বিচারের জন্য মুরলিতে পাঠানো। অর্থাৎ, মুরলিকে কেন্দ্র করে অপরাধ দমনের একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা গড়ে তোলাই ছিল তাঁর পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য।

হেনকেলের প্রস্তাবে পুলিশ সদস্যদের নিয়োগ ও চরিত্রের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। তাঁর ধারণা ছিল, স্থানীয় বারকানদাজরা অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি থাকায় তাদের পরিবর্তে বিদেশি সিপাহিদের নিয়োগ করা প্রয়োজন। ফলে তাঁর পরিকল্পিত পুলিশ বাহিনীর মধ্যে গোয়েন্দা কার্যক্রমের চেয়ে সামরিক বৈশিষ্ট্যই বেশি প্রাধান্য পায়। তৎকালীন পরিস্থিতিতে এই পরিকল্পনার পেছনে একটি বাস্তব কারণও ছিল। তখন পুলিশের প্রধান লক্ষ্য ছিল ছোটখাটো অপরাধের বিচার বা দৈনন্দিন অপরাধের তদন্ত নয়; বরং ডাকাতি, খুন ও দস্যুতার মতো গুরুতর অপরাধ দমন করা।

ডাকাতির ঘটনা ঘটলে পুলিশি অভিযানের প্রধান কাজ ছিল অপরাধীদের অনুসরণ করে তাদের আস্তানা কিংবা বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছানো। ডাকাত দলগুলো সাধারণত গোপন কৌশলের চেয়ে দলীয় শক্তির ওপর বেশি নির্ভর করত। এ কারণে তাদের গ্রেপ্তারের অভিযান অনেকটা আধা-সামরিক অভিযানের রূপ নিত। পুলিশি দল ডাকাতদের অবস্থান শনাক্ত করে সেখানে পৌঁছালে স্থানীয় জমিদারের সহযোগিতা প্রত্যাশা করা হতো। জমিদার তাঁর কর্মচারীদের মাধ্যমে অপরাধীদের ধরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন। 

এখানে জমিদারদের ভূমিকা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাঁদের পৃথক কোনো পুলিশ বাহিনী ছিল— এমন উল্লেখ পাওয়া যায় না। বরং নিজেদের সম্পত্তি লুণ্ঠনের হাত থেকে রক্ষা করা এবং অপরাধীদের সরকারি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব পালনে তাঁরা সাধারণ কর্মচারীদের ব্যবহার করতেন। জমিদারদের এসব কর্মচারীর দায়িত্বের মধ্যে এক ধরনের আধা-পুলিশি ভূমিকা ছিল। হেনকেলের নিয়োগ করা থানাদারদের কাজ ছিল এই দায়িত্ব পালনে জমিদারদের সহযোগিতা করা এবং প্রয়োজনে তাঁদের কর্মচারীদের কাছ থেকে সহায়তা নিশ্চিত করা।

তবে জমিদারদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক সব সময় সহযোগিতামূলক ছিল না। হেনকেলের একটি পুরোনো চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছিল, ভূষনার জমিদারের নায়েব পুলিশকে নিয়মিত সহায়তা করার জন্য পাইক ও নাকড়ি—অর্থাৎ সশস্ত্র পদাতিক কর্মী—দিতে অস্বীকার করেছিলেন। 

হেনকেলের প্রস্তাবের পর মুরলি, ভূষনা, মির্জানগর ও ধর্মপুরে পুলিশি জনবল বণ্টনের একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা কার্যকর করা হয় বলে বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। মুরলিতে ৫০ জন সিপাহির একটি বাহিনী মোতায়েন করা হয়। মির্জানগর ও ভূষনায় রাখা হয় ৩০ জন করে সিপাহি। অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত ছোট থানা ধর্মপুরে নিয়োগ করা হয় মাত্র চারজন সিপাহি। এই জনবল বণ্টন থেকে মুরলির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুরলিকে কেন্দ্র করে পুলিশি অভিযান পরিচালনা এবং জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব কার্যকর করার পরিকল্পনাই এখানে প্রতিফলিত হয়েছে।

নয়াবাদে একই ধরনের কোনো পুলিশবাহিনী মোতায়েনের উল্লেখ নেই। এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে খুলনায় লবণ বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর উপস্থিতিকে বিবেচনা করা যায়। সম্ভবত প্রশাসনের ধারণা ছিল, ওই অঞ্চলে বিদ্যমান সামরিক শক্তিই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য যথেষ্ট। 

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুরলিতে থানা প্রতিষ্ঠা হেনকেলের প্রাথমিক প্রস্তাবের অংশ ছিল না। পূর্ববর্তী পুলিশ ব্যবস্থাতেও সেখানে থানা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়নি। ধারণা করা যায়, হেনকেল নিজেই মুরলিতে বসে এমন কিছু দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছিলেন, যা অন্যান্য এলাকায় থানাদাররা পালন করতেন। পরে তাঁর প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করলে মুরলিতে ৫০ জন সিপাহির বাহিনী স্থাপন করা হয়। 
 

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ: