আঠারো শতকের শেষভাগে যশোরের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা ছিল দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও শাস্তি কার্যকরের নানা অসংগতিতে পরিপূর্ণ। অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিচার শেষ হতে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর লেগে যেত। কারাগারে বন্দিদের জীবনযাপন ও শাস্তি কার্যকরের ব্যবস্থাও ছিল অপর্যাপ্ত। অনেক বন্দিকে নির্দিষ্ট মেয়াদ ছাড়াই কারাগারে আটকে রাখা হতো। ব্রিটিশ শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে যশোরের ফৌজদারি প্রশাসনের এমন চিত্র তুলে ধরেছেন জেমস ওয়েস্টল্যান্ড তাঁর এ রিপোর্ট অন দ্য ডিস্ট্রিক্ট অব যশোর গ্রন্থে।
ওয়েস্টল্যান্ডের বিবরণ অনুযায়ী, ১৭৮১ থেকে ১৭৯০ সাল পর্যন্ত যশোরের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত সীমিত। ম্যাজিস্ট্রেটের নিজস্ব প্রাথমিক ফৌজদারি বিচারক্ষমতা ছিল না বললেই চলে। তাঁর কাজ ছিল অধস্তন পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মামলা গ্রহণ করা এবং প্রয়োজন মনে করলে সেগুলো বিচারের জন্য দারোগার কাছে পাঠানো। দারোগা ছিলেন নাজিমের অধীন কর্মকর্তা। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধের অভিযোগ উঠলেও তার বিচার নিষ্পত্তির জন্য একাধিক প্রশাসনিক স্তর অতিক্রম করতে হতো।
১৭৮৫ সালে সরকার ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতা কিছুটা বাড়ায়। হামলা, নির্যাতন ও চুরির মতো ছোটোখাটো অপরাধের মামলা শুনানি এবং সর্বোচ্চ চার দিনের কারাদণ্ড কিংবা ১৫টি বেত্রাঘাতের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা তাঁদের দেওয়া হয়। তবে লর্ড কর্নওয়ালিসের প্রশাসনিক সংস্কার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগপর্যন্ত দারোগাদের বিচারিক ক্ষমতায় এর বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি।
জেমস ওয়েস্টল্যান্ড ১৭৯০ সালের বিবরণ উল্লেখ করে জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে দারোগার হাতে পৌঁছাতেই গড়ে এক মাস সময় লেগে যেত। এরপর দারোগার অধীনে তাঁদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হতো। বিচারব্যবস্থা পরিচালনার প্রায় দশ বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট জানান, অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি পাওয়া গেলে কিংবা দ্রুত সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করা সম্ভব হলে সাত-আট মাসের মধ্যে রায় দেওয়া যেত। কিন্তু এমন সুযোগ না থাকলে বিচার শেষ হতে চার থেকে ছয় বছরও লেগে যেত। বিচার শেষ হওয়ার পরও দুর্ভোগের অবসান হতো না। দারোগার আদালতে বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর নাজিমের কাছ থেকে চূড়ান্ত আদেশ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতো।
জেমস ওয়েস্টল্যান্ডের তথ্য অনুযায়ী, ম্যাজিস্ট্রেট ও দারোগার মধ্যে গড়ে প্রতিদিন মাত্র একটি মামলার নিষ্পত্তি হতো। তাঁর মতে, এর অন্যতম কারণ ছিল বিচারব্যবস্থার অযৌক্তিক কাঠামো। বাংলার প্রায় প্রতিটি ফৌজদারি মামলার রায় স্থানীয় পর্যায়ে চূড়ান্ত না করে আদেশের জন্য রায় নাজিমের কাছে পাঠাতে হতো। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক স্তর যুক্ত হয়ে নিষ্পত্তিতে বিলম্ব ঘটত।
দারোগাদের আদালতে বিচার কতটা ন্যায়সংগতভাবে পরিচালিত হতো, সে বিষয়ে ওয়েস্টল্যান্ড নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি। তবে তাঁর বিবরণে দারোগাদের তুলনামূলক লঘু দণ্ড দেওয়ার প্রবণতার কথা উঠে এসেছে। একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট ডাকাতি ও হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে স্বল্প শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে অভিযোগ করেন। ১৭৯১ সালের এপ্রিলের একটি প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ড ও ডাকাতির কয়েকটি মামলায় ৩৯টি বেত্রাঘাত কিংবা চার মাস থেকে এক বছরের কারাদণ্ডের মতো শাস্তির উল্লেখ পাওয়া যায়।
সে সময় ফৌজদারি অপরাধে মৃত্যুদণ্ড, কারাদণ্ড, বেত্রাঘাত ও অঙ্গহানির শাস্তি প্রচলিত ছিল। কারাদণ্ডের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ করা হতো না অনেক সময়। কাউকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হতো, কাউকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখা হতো। আবার কারও মুক্তি নির্ভর করত ক্ষতিপূরণ পরিশোধ, সচ্চরিত্রের জামিন কিংবা কর্তৃপক্ষের ইচ্ছার ওপর।
১৭৯২ সালের শুরুতে ব্রিটিশ সরকার কারাগারগুলোর দায়িত্ব গ্রহণ করলে যশোর কারাগারের বন্দিদের অবস্থা সম্পর্কে একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে আসে। ওয়েস্টল্যান্ড জানান, কারাগারের ৩০০ বন্দির মধ্যে ১০৮ জনকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন হত্যার অপরাধে দণ্ডিত হলেও অধিকাংশই ডাকাতির মামলার আসামি ছিলেন। এমনকি মারধরের একটি মামলার বন্দীকেও অনির্দিষ্টকালের জন্য কারাগারে আটকে রাখার নজির ছিল।
বিচারব্যবস্থার আরেকটি অদ্ভুত দিক ছিল অভিযুক্তের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নিয়ম। কাউকে গ্রেপ্তার করার সময় তাঁর সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা হতো। চূড়ান্তভাবে দণ্ডিত হলে সেই সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত থাকত। কিন্তু অভিযুক্ত খালাস পেলে পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে করা কর্তন বাদ দিয়ে সম্পত্তি ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। অথচ সম্পত্তি ফেরত দেওয়ার দায়িত্বও ছিল সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর। ওয়েস্টল্যান্ডের মতে, একজন ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা, তাকে দণ্ডিত করা, অপরাধের ক্ষতিপূরণ আদায়ের শর্ত দেওয়া এবং তা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে আটকে রাখা—সব মিলিয়ে পুরো ব্যবস্থাটিই ছিল অত্যন্ত অযৌক্তিক।
কারাগারের ব্যবস্থাপনাও ছিল দুর্বল। কারাগারগুলো দারোগাদের দায়িত্বে পরিচালিত হতো, ম্যাজিস্ট্রেটদের অধীনে নয়। বন্দিদের দেখভাল, শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বন্দিদের চলাফেরার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তারা বাইরের মানুষের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করতে পারত এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের প্রয়োজনীয় বাজারসামগ্রী কেনার জন্যও বাইরে যাওয়ার সুযোগ পেত। বন্দিদের জন্য নিয়মিত কোনো উৎপাদনমূলক কাজের ব্যবস্থাও ছিল না। ফলে কারাবাসের মাধ্যমে অপরাধ দমনের যে উদ্দেশ্য থাকার কথা, তা কার্যকর হচ্ছিল না।
বন্দিদের শ্রমে নিয়োজিত করার চিন্তাও তখন প্রশাসনের আলোচনায় আসে। ১৭৮২ সালের প্রথম দিকে মি. হেনকেল কুখ্যাত বন্দিদের সমুদ্রগামী জাহাজে পাঠানোর প্রস্তাব দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, সে সময় অনেক জাহাজের ক্যাপ্টেন দেশীয় নাবিকের অভাবে ভুগছিলেন। বন্দিদের সমুদ্রে পাঠানো হলে তাঁদের প্রচলিত সামাজিক পরিচয় ও জাতিগত বিধিনিষেধের ধারণা অনুযায়ী জাতিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতো, যা হেনকেলের বিবেচনায় শাস্তির একটি নতুন উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারত।
তবে এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি। পরে হেনকেল সুন্দরবন পুনরুদ্ধারের একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেন, যা ‘সুন্দরবন পরিকল্পনা’ নামে পরিচিতি পায়। পরিকল্পনার একটি অংশে জমিদার ও তালুকদারদের অনুদানের মাধ্যমে এবং অন্য অংশে দণ্ডিত বন্দিদের শ্রম ব্যবহার করে সুন্দরবনের অনাবাদি অঞ্চল পুনরুদ্ধারের কথা বলা হয়। এ পরিকল্পনার অধীনে, সবচেয়ে নৃশংস অপরাধী ছাড়া অন্য বন্দিদের ছোট ছোট জমি দিয়ে একটি কয়েদি উপনিবেশ গড়ে তোলার প্রস্তাব ছিল। হেনকেলের ধারণা ছিল, এর মাধ্যমে বন্দিদের শ্রমকে উৎপাদনশীল কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
তৎকালীন রাজস্ব বোর্ড, যার হাতে ফৌজদারি বিষয়েও কর্তৃত্ব ছিল, এই পরিকল্পনা অনুমোদন করে। হেনকেল তাঁর প্রস্তাবিত কয়েদি উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার জন্য আশপাশের জেলাগুলো থেকে দীর্ঘমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের তাঁর কাছে পাঠানোর আবেদন জানান। কিন্তু বন্দিদের পুনর্বাসন বা স্থানান্তরের বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
পরবর্তী সময়ে হেনকেল বন্দিদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও একটি প্রস্তাব দেন। এতে দীর্ঘমেয়াদি সাজাপ্রাপ্তদের নির্বাসনে পাঠানো এবং স্বল্পমেয়াদি সাজাপ্রাপ্তদের রাস্তা নির্মাণের কাজে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। গভর্নর জেনারেল প্রস্তাবটি অনুমোদন করে নায়েব নাজিমের কাছে তা গ্রহণের সুপারিশ করেন। এই পরিকল্পনা তখন কতটা কার্যকর হয়েছিল, সে বিষয়ে ওয়েস্টল্যান্ড নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি। তবে তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, ফৌজদারি প্রশাসনের দায়িত্ব মুসলিম শাসনব্যবস্থা থেকে ব্রিটিশদের হাতে হস্তান্তরের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বন্দিদের দিয়ে রাস্তা নির্মাণের কাজ করানোর ব্যবস্থা চালু হয়।


























