সুন্দরবনের গাছপালার গঠন বদলে যাচ্ছে। মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে একসময় প্রভাবশালী সুন্দরী গাছের বিস্তার সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, লবণসহিষ্ণু গেওয়া ও গরানের উপস্থিতি বাড়ছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এ সময়ে সুন্দরবনের ৫২ দশমিক ৮৯ শতাংশ চারা মারা গেছে। তবে টিকে থাকা চারাগুলোর বৃদ্ধি ছিল উল্লেখযোগ্য। গবেষণার এ চিত্র সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম ও পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
Ecological Influences on Regeneration Dynamics in the Sundarbans, Bangladesh: Exploring Biotic and Abiotic Factors Across Time and Space শীর্ষক এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের ম্যানগ্রোভ সিলভিকালচার বিভাগের গবেষকেরা সুন্দরবনের বিভিন্ন লবণাক্ততা অঞ্চলে গাছের চারা, কিশলয় ও পূর্ণবয়স্ক গাছের অবস্থা বিশ্লেষণ করেন। গবেষণায় দেখা যায়, লবণাক্ততার মাত্রা বাড়ার সঙ্গে চারার মৃত্যুহারও বেড়েছে।
লবণাক্ত এলাকায় চারার মৃত্যুহার ৮২ শতাংশের বেশি
গবেষণায় সুন্দরবনের লবণাক্ততাকে চারার টিকে থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কম লবণাক্ত এলাকায় চারার মৃত্যুহার ছিল ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। মাঝারি লবণাক্ত এলাকায় তা বেড়ে ৩৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং উচ্চ লবণাক্ত এলাকায় ৮২ দশমিক ৮৪ শতাংশে পৌঁছায়।
গবেষণায় গরান চারার মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি, ২২ দশমিক ৬৩ শতাংশ পাওয়া গেছে। সুন্দরীর ক্ষেত্রে এ হার ১৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অন্যদিকে, কাঁকড়া ও গেওয়া চারার মৃত্যুহার ছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক ১২ ও ১ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ সব প্রজাতি একইভাবে লবণাক্ততার প্রভাব মোকাবিলা করতে পারছে না।
তবে টিকে থাকা চারাগাছের বৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক। ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এসব চারার বৃদ্ধির হার ছিল ২৩০ দশমিক ৩১ শতাংশ। কম লবণাক্ত এলাকায় কিশলয়ের বৃদ্ধি ৩০১ দশমিক ১ শতাংশ, মাঝারি লবণাক্ত এলাকায় ৯৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং উচ্চ লবণাক্ত এলাকায় ২৩২ শতাংশ পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, চারার মৃত্যু ও টিকে থাকা গাছের বৃদ্ধির তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেই বনের পুনর্জন্মের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে হবে।
চাঁদপাইয়ে সুন্দরী-গেওয়ার বিস্তার কমেছে
সুন্দরবনের গাছের প্রজাতিগত পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে আরেকটি গবেষণায়। উবঃবপঃরড়হ ড়ভ কধহশৎধ ঞৎবব ঊীঢ়ধহংরড়হ রহ ঃযব ঘড়ৎঃযবৎহ ঝঁহফধৎনধহং শীর্ষক এ গবেষণায় স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে ১৯৮৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত খুলনা রেঞ্জের চাঁদপাই এলাকায় গাছের বিস্তারের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালে চাঁদপাই রেঞ্জে সুন্দরী ও গেওয়াপ্রধান এলাকার আয়তন ছিল ১৭ হাজার ৩২ হেক্টর। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১২ হাজার ২২ হেক্টরে। একই সময়ে ঘন কাঁকড়াগাছের বিস্তৃত এলাকা ১২১ হেক্টর থেকে বেড়ে ২ হাজার ১৬ হেক্টরে পৌঁছায়।
ঘনত্বের ভিত্তিতে বিশ্লেষণেও কাঁকড়ার বিস্তার বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া গেছে। উচ্চ ঘনত্বের এলাকায় কাঁকড়ার অংশ ১৯৮৮ সালের শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশে দাঁড়ায়। মাঝারি ঘনত্বের এলাকায় এ হার ১ দশমিক ৯৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়। এ শ্রেণির কাঁকড়াপ্রধান এলাকার আয়তন ৫৩৯ হেক্টর থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৪১৮ হেক্টরে পৌঁছায়।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এই পরিবর্তন পুরো সুন্দরবনের চিত্র নয়। বাংলাদেশ স্পেস রিসার্চ অ্যান্ড রিমোট সেন্সিং অর্গানাইজেশনের (স্পারসো) মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি মূলত চাঁদপাই রেঞ্জের নির্দিষ্ট এলাকার পরিবর্তন তুলে ধরেছে। প্রায় ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবনের মধ্যে চাঁদপাই রেঞ্জের আয়তন ২৭২ বর্গকিলোমিটার। ফলে একটি এলাকার তথ্য দিয়ে পুরো বনের প্রজাতিগত পরিবর্তন নির্ধারণ করা যাবে না।
মিঠাপানির প্রবাহ কমায় বাড়ছে ঝুঁকি
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের ম্যানগ্রোভ সিলভিকালচার বিভাগের জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা মোমিনুল ইসলাম নাহিদের মতে, সুন্দরবনে গেওয়া প্রায় সব এলাকাতেই কিছুটা বেড়েছে। লবণাক্ত এলাকায় গরান ও গেওয়ার উপস্থিতি বেশি হলেও সুন্দরী এখনো কম লবণাক্ত এলাকায় প্রধান প্রজাতি হিসেবে রয়েছে। তিনি বলেন, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছের টিকে থাকার পরিবেশ বদলে যাচ্ছে। উজান থেকে মিঠাপানি বনে পৌঁছাতে না পারলে লবণাক্ত পানি আরও ভেতরে প্রবেশ করে। এতে লবণসহিষ্ণু গাছ সুবিধাজনক পরিবেশ পায়, আর কম লবণাক্ত পানির ওপর নির্ভরশীল প্রজাতি সংকটে পড়ে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক কামরুজ্জামান বলেন, স্যাটেলাইটের তথ্যেও কাঁকড়ার বিস্তার বৃদ্ধি এবং সুন্দরীর দীর্ঘমেয়াদি পতনের চিত্র দেখা গেছে। সুন্দরী গাছের আগা শুকিয়ে যাওয়ার রোগও এ প্রজাতির ক্ষতির একটি কারণ। তাঁর মতে, ফারাক্কা বাঁধের পর মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, ছত্রাকের আক্রমণ এবং গাছের অনুপযোগী হয়ে ওঠা পরিবেশ—সবই সুন্দরীর সংকটে ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি জানান, সুন্দরীর আগামরা রোগে আক্রান্ত গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ১৯৯৮-৯৯ সালের দিকে। সে সময় আক্রান্ত গাছের পাশাপাশি সুস্থ গাছও কাটা পড়েছিল। বর্তমানে সংরক্ষণনীতির কারণে গাছ কাটা নিষিদ্ধ থাকলেও সুন্দরী পুনরুদ্ধারে পুনরায় রোপণ ও আবাসস্থল পুনর্বাসনের সম্ভাবনা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের চাপ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট—দুই ধরনের প্রক্রিয়ায় সুন্দরবনের লবণাক্ততা বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, হিমবাহ ও বরফ গলে যাওয়া, উজানে বাঁধ ও ব্যারাজের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা তৈরি হওয়ায় মিঠাপানির প্রবাহ কমছে। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়াও পরিস্থিতিকে জটিল করছে।
তাঁর মতে, মিঠাপানির ওপর নির্ভরশীল গাছের প্রজাতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে তেলবাহী ট্যাংকার ও কয়লাবাহী জাহাজডুবির মতো দুর্ঘটনা সুন্দরবনের ওপর মানুষের সৃষ্ট চাপ আরও বাড়িয়েছে।
সুন্দরবন রক্ষায় প্রয়োজন পানির স্বাভাবিক প্রবাহ
গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে স্পষ্ট, সুন্দরবনের পরিবর্তন শুধু গাছের প্রজাতি বদলে যাওয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পানির প্রবাহ, লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের কর্মকাণ্ড। সুন্দরী কমে যাওয়ার বিপরীতে গেওয়া ও গরানের বিস্তার বৃদ্ধি বনের অভিযোজনের একটি দিক হলেও একে সামগ্রিক পরিবেশগত সুস্থতার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না।
স্পারসোর গবেষক মাহমুদুর রহমানের মতে, সুন্দরবনের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রকে নিজের মতো চলতে দেওয়া এবং আগের মতো পানির প্রবাহ বজায় রাখা জরুরি। বনকে কৃত্রিমভাবে পরিচালনার চেষ্টা না করে উজান থেকে মিঠাপানি আসছে কি না, নদীর প্রবাহে কী পরিবর্তন ঘটছে এবং অন্য কোন কোন কারণে গাছের প্রজাতিগত ভারসাম্য বদলাচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশ খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় বিস্তৃত, যার আয়তন প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। সুন্দরী, গেওয়া, গরান, পশুর, ধুন্দল, বাইন, কাঁকড়া ও কেওড়াসহ নানা প্রজাতির গাছ এই বনের জীববৈচিত্র্য গড়ে তুলেছে। এসব প্রজাতির টিকে থাকা নির্ভর করছে তাদের উপযোগী পরিবেশ কতটা বজায় থাকছে, তার ওপর।


























