সোমবার ১৯ অক্টোবর ২০২৬

২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফেরাউনের দেশে, ইতিহাসের খোঁজে

মাহমুদুল হাসান

প্রকাশিত: ১৮:১৪, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ফেরাউনের দেশে, ইতিহাসের খোঁজে

ভ্রমণপ্রিয় মানুষের কাছে নতুন দেশ মানেই নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন সংস্কৃতি ও নতুন কিছু জানার সুযোগ। সময়ের সঙ্গে সেই আগ্রহ অনেকের কাছে নেশায় পরিণত হয়। আমার এবারের গন্তব্য ছিল আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দেশ মিশর—যে দেশকে আমরা ফেরাউনের দেশ হিসেবেই বেশি চিনি।

মিশর ভ্রমণের ইচ্ছা জাগে ছোটবেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বইয়ে পিরামিডের ছবি দেখে। বইয়ের পাতায় দেখা সেই বিশাল স্থাপনা কীভাবে হাজার হাজার বছর আগে নির্মিত হয়েছিল—এ প্রশ্ন তখন থেকেই মনে কৌতূহল তৈরি করেছিল। ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময় সেই পিরামিড নিজের চোখে দেখার আকাঙ্ক্ষা থেকেই একসময় মিশর ভ্রমণের পরিকল্পনা শুরু করি।

মিশর ভ্রমণ বাংলাদেশিদের জন্য সহজ নয়। ভিসা প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ, আর ভ্রমণ ব্যয়ও কম নয়। দীর্ঘদিনের সঞ্চয় এবং পরিবারের অনুমতি নিয়ে শুরু করি প্রস্তুতি।
ভিসার জন্য ঢাকায় ছুটে চলা

মিশর যেতে প্রথমেই প্রয়োজন বৈধ ভিসা। বাংলাদেশি পাসপোর্টে মিশরের ভিসা পেতে সময় লাগে—এমন কথা আগে থেকেই শুনেছিলাম। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে যশোর থেকে মোটরসাইকেলে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিই।

রাতে ঢাকায় পৌঁছে চলে যাই গুলশান-১-এ অবস্থিত মিশরীয় দূতাবাসে। সেখানে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, আগের মতো এখন আর দীর্ঘ লাইন হয় না। ভিসা প্রক্রিয়া কঠিন হওয়ায় আবেদনকারীর সংখ্যাও তুলনামূলক কম।

সেই রাতটি ঢাকায় বসবাসরত বড় ভাই বাপিনের বাসায় কাটিয়ে ভোর ৪টায় আবার দূতাবাসে চলে আসি। গিয়ে দেখি, আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। দূতাবাসের নিরাপত্তাকর্মীদের কাছ থেকে জানতে পারি, সকাল ৯টায় টোকেন দেওয়া হবে এবং ১১টায় শুরু হবে কার্যক্রম।

সকাল ৯টার দিকে দূতাবাসের দরজা খোলার পর একজন কর্মকর্তা আরবিতে জানতে চাইলেন, ‘প্রথমে কে এসেছেন?’ আমি জানালাম, আমি এবং আমার সঙ্গে আরও একজন আছি। পরে আরও কয়েকজন আবেদনকারী আসেন। আমাদের আট-নয়জনকে টোকেন দেওয়া হলো।

হাতে তখনও প্রায় দুই ঘণ্টা সময়। অপেক্ষা করতে করতে আমার সঙ্গী আকাশ ও আমি আশপাশের বিভিন্ন দূতাবাস ঘুরে দেখি। পরে এক ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাঁর বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নির্ধারিত সময়ে আবার দূতাবাসে ফিরে আসি।

একপর্যায়ে আমাদের পাঁচজনকে ভেতরে ডাকা হয়। নাম-ঠিকানা লিপিবদ্ধ করার পর একে একে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেওয়া হয়। কাগজপত্র জমা নিয়ে জানানো হয়, ভিসা অনুমোদন হলে এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হবে।
এরপর শুরু হয় অপেক্ষা।

অবশেষে এলো কাঙ্ক্ষিত বার্তা
কতদিন অপেক্ষা করতে হবে, তা নিয়ে আমাদের মধ্যে নানা আলোচনা চলছিল। পরিচিত অনেকের কাছ থেকে শুনেছিলাম, ভিসার সিদ্ধান্ত পেতে কয়েক মাসও সময় লেগে যায়। এর মধ্যেই একদিন আমার সঙ্গী আকাশের মোবাইলে বার্তা এলো—মিশরের ভিসার জন্য তাঁকে মনোনীত করা হয়েছে। নির্দিষ্ট ফি ও পাসপোর্ট জমা দিয়ে ভিসা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আমি তখন কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমরা দুজন একসঙ্গে আবেদন করেছিলাম, কিন্তু আমার কোনো বার্তা আসেনি। কয়েক দিন পর নিজ উদ্যোগে দূতাবাসে ই-মেইল করি। পরদিন সকালে আমার মোবাইলেও কাঙ্ক্ষিত বার্তা আসে।

খুশিতে মন ভরে গেল। অল্প বয়সে মিশর ভ্রমণ—যে স্বপ্ন ছোটবেলা থেকে মনের মধ্যে ছিল, সেটি যেন বাস্তব হতে চলেছে।
নির্দিষ্ট ফি দিয়ে পাসপোর্ট জমা দিলাম। কয়েক দিন পর আবার ঢাকায় গিয়ে পাসপোর্ট সংগ্রহ করি। পাসপোর্ট খুলে মিশরের ভিসার স্টিকার দেখে যে আনন্দ পেয়েছিলাম, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। একজন ভ্রমণকারীর কাছে পাসপোর্টে নতুন একটি ভিসা যুক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে বিশেষ অনুভূতি।

মিশর ও ওমরাহ—একসঙ্গে দুই পরিকল্পনা
মিশর ও সৌদি আরব পাশাপাশি হওয়ায় আমরা পরিকল্পনা করলাম, মিশর ভ্রমণের সঙ্গে ওমরাহও করব। ঢাকা-মিশর-সৌদি আরব-ঢাকা রুটে টিকিট খুঁজতে শুরু করলাম। ঢাকার বড় ভাই আলমগীর হোসেন রাজুর সহযোগিতায় কয়েক দিনের মধ্যেই টিকিট করা হয়ে গেল।
কেনাকাটা ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে নির্ধারিত দিনে আমরা ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলাম।

বিমানবন্দরে উৎকণ্ঠার সময়
আমাদের ফ্লাইট ছিল এয়ার অ্যারাবিয়ায়। নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন ঘণ্টা আগে বিমানবন্দরে পৌঁছাই। বোর্ডিং পাস নেওয়ার সময় বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা জানতে চাইলেন, কোথায় যাচ্ছি এবং কেন যাচ্ছি। মিশর ভ্রমণের কথা শুনে তাঁরা কিছুটা বিস্মিত হন।

আমাদের জানানো হলো, মিশরের ইমিগ্রেশন থেকে ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পরই বোর্ডিং পাস দেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম।
দুই-তিন ঘণ্টা পর অবশেষে জানানো হলো, আমাদের যাওয়ার অনুমতি মিলেছে। বোর্ডিং পাস নিয়ে ইমিগ্রেশনের দিকে এগিয়ে গেলাম।
ইমিগ্রেশনে কর্মকর্তা জানতে চাইলেন, কোথায় যাচ্ছি, একা কি না, আগে কোন কোন দেশ ভ্রমণ করেছি, কী করি, বাড়ি কোথায়—এমন নানা তথ্য। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে যাওয়ার অনুমতি মিলল।
এরপর বিমানবন্দরের লাউঞ্জে কিছু সময় কাটিয়ে বিমানে উঠে পড়লাম। মনে হচ্ছিল, স্বপ্ন এবার সত্যিই বাস্তব হতে যাচ্ছে।

কায়রোয় প্রথম রাত
প্রায় ছয় ঘণ্টার যাত্রা শেষে রাত ২টার দিকে পৌঁছালাম কায়রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ইমিগ্রেশনে যাওয়ার পর একজন কর্মকর্তা আমাদের নানা বিষয়ে প্রশ্ন করলেন—কী করি, কী ধরনের ব্যবসা করি, কেন মিশরে এসেছি, কোথায় থাকব ইত্যাদি। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমরা বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে আসি।
মানি এক্সচেঞ্জ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ বদলে একটি ট্যাক্সি নিয়ে ডাউনটাউন কায়রোর হোটেলে পৌঁছাই। তখন রাত প্রায় ৩টা। হোটেলে চেক-ইন করে ঘুমিয়ে পড়ি।

কায়রোয় প্রথম সকাল
পরদিন দুপুরের দিকে ঘুম থেকে উঠি। আগের রাতে ঘুম কম হওয়ায় শরীর বেশ ক্লান্ত ছিল। হোটেলের সকালের নাশতাও মিস হয়ে যায়।
গোসল শেষে জুমার নামাজ পড়তে পাশের একটি মসজিদে যাই। নামাজ শেষে একটি মিশরীয় রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেয়ে বের হই।
প্রথম গন্তব্য ছিল আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়। শুক্রবার হওয়ায় ক্যাম্পাস বন্ধ ছিল। ফলে বাইরে থেকেই দেখে চলে আসতে হয়।
এরপর যাই মিশরের জাতীয় জাদুঘরে। সেদিন বিশেষ সময়সূচি থাকায় সন্ধ্যার পর আবার টিকিট দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। অপেক্ষার পর জাদুঘরে প্রবেশের সুযোগ পাই।
জাদুঘরে প্রাচীন মিশরের নানা নিদর্শনের পাশাপাশি ফেরাউনদের মমি সংরক্ষিত রয়েছে। রামেসিস দ্বিতীয়সহ বিভিন্ন শাসকের মূর্তি ও প্রাচীন নিদর্শন দেখে ইতিহাসের বইয়ের পাতাগুলো যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠছিল।
মমিগুলো সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং হাজার বছরের পুরোনো নিদর্শন দেখে বিস্মিত হয়েছি। অনেক স্থানে ছবি তোলার অনুমতি ছিল না। জাদুঘর থেকে বের হয়ে মনে হলো, মিশরের ইতিহাস যেন শেষ হওয়ার নয়।

গিজায় পিরামিডের সামনে
পরদিন সকালে রওনা হলাম গিজার উদ্দেশে। গিজা মিশরের সেই শহর, যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত পিরামিডগুলো দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা এখানে আসেন পিরামিড দেখার জন্য।
আমরা এমন একটি হোটেলে উঠলাম, যার ছাদ থেকেই পিরামিড দেখা যায়। হোটেলে ব্যাগ রেখে পিরামিড দর্শনে বেরিয়ে পড়লাম।
প্রখর রোদ, চারদিকে মরুভূমির আবহ—তবু সেদিন কোনো ক্লান্তি অনুভব করিনি। টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করতেই বিশাল পাথরের স্থাপত্য চোখে পড়ে। কিছু দূর হাঁটার পর বুঝলাম, পুরো এলাকা হেঁটে ঘুরে দেখা কঠিন। আমরা ঘোড়া ও উট ভাড়া করলাম।
পিরামিডের কাছাকাছি গিয়ে সত্যিই বিস্মিত হতে হয়। বিশাল বিশাল পাথরের স্তর একটির ওপর আরেকটি সাজিয়ে কীভাবে এমন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল—প্রশ্নটি বারবার মনে আসছিল। হাজার হাজার বছর আগে নির্মিত এই স্থাপনাগুলো আজও মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্র।
যে পিরামিডের ছবি ছোটবেলায় বইয়ের পাতায় দেখেছি, সেদিন সেটি নিজের চোখে দেখলাম, ছুঁয়ে দেখলাম। মুহূর্তটি আমার ভ্রমণজীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।

নীল নদের তীরে
পরদিন আমাদের আলেকজান্দ্রিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। সেখানে বিখ্যাত গ্রন্থাগার ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে। কিন্তু সময় স্বল্পতার কারণে পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হয়।
এর পরিবর্তে আমরা নীল নদের তীরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।
নীল নদকে ঘিরেই প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার বিকাশ। নদীর তীরজুড়ে গড়ে উঠেছে নানা বিনোদনকেন্দ্র। সন্ধ্যার পর বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও স্থানীয় মানুষ পরিবার নিয়ে নদীর তীরে সময় কাটান।
আমরাও কিছু সময় নীল নদের তীরে কাটালাম। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর সৌন্দর্য যেন আরও বেড়ে গেল।

কায়রোর শেষ দিন
মিশরে আমাদের শেষ দিনে শহরের বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখি। তাহরির স্কয়ার, মসজিদ, জাদুঘরসহ নানা জায়গায় ঘুরেছি।
মিশরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করলেও মুসলিমদের ধর্মীয় অনুশীলন চোখে পড়ার মতো। কাজের মধ্যেও নামাজের সময় হলে অনেককে নামাজের প্রস্তুতি নিতে দেখেছি।
রাতে বের হই কেনাকাটা করতে। বিভিন্ন দোকানে নারীদের ব্যবসা পরিচালনা করতে দেখেছি। নানা বয়সী নারীকে নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সামলাতে দেখেছি। মিশরের কিছু ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী কিনে হোটেলে ফিরে আসি।
পরদিন সকালে আমাদের সৌদি আরবের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা।

স্বপ্নপূরণের অনুভূতি
মিশর ভ্রমণ আমাকে অনেক আনন্দ দিয়েছে। ছোটবেলায় বইয়ের পাতায় দেখা পিরামিড, ফেরাউন, মমি ও প্রাচীন মিশরের ইতিহাস এতদিন ছিল কেবল পড়ার বিষয়। এবার সেগুলো নিজের চোখে দেখার সুযোগ হয়েছে।
একটি ভ্রমণ শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন এবং নিজের পরিচিত পৃথিবীর বাইরে অন্য এক বাস্তবতাকে জানার সুযোগ।
মিশর আমাকে সেই সুযোগই দিয়েছে।

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: