রোববার ০১ নভেম্বর ২০২৬

১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যশোরের লবণ বিভাগে হেঙ্কেলের সংস্কার

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৭:৪০, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

যশোরের লবণ বিভাগে হেঙ্কেলের সংস্কার

ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে যশোর ও সুন্দরবন অঞ্চলে লবণ উৎপাদন ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব আয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এই উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষ, যাঁদের তৎকালীন নথিতে মাইহান্ডার ও মালঙ্গি নামে উল্লেখ করা হয়েছে। লবণ উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমিকদের ওপর জোরপূর্বক নিয়োগ, অগ্রিম টাকা দিয়ে আটকে রাখা এবং মধ্যস্থতাকারীদের অত্যাচারের অভিযোগ ছিল। এই ব্যবস্থার পরিবর্তনে উদ্যোগী হয়েছিলেন মি. হেঙ্কেল। তবে তাঁর সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে লবণ বিভাগের আরেক কর্মকর্তা মি. ইওয়ার্টের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয়।

জেমস ওয়েস্টল্যান্ড তাঁর ‘ এ রিপোর্ট অন দ্যা ডিস্ট্রিক্ট অফ যশোর’ গ্রন্থে যশোরের প্রাথমিক ব্রিটিশ প্রশাসন ও লবণ বিভাগের কার্যক্রমের বিবরণ দিতে গিয়ে এ ঘটনার উল্লেখ করেছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, গভর্নর জেনারেল হেঙ্কেলের প্রস্তাব অনুমোদন করে তাঁকে রায়মঙ্গল বিভাগের লবণ এজেন্সির দায়িত্ব দেন। ফলে মি. ইওয়ার্টকে বাকেরগঞ্জ অংশের দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়।

দায়িত্ব গ্রহণের পর হেঙ্কেল একটি ঘোষণা জারি করেন। এতে নির্দিষ্ট এলাকার মাইহান্ডারদের স্বেচ্ছায় লবণ উৎপাদনের কাজে যোগ দেওয়ার আহŸান জানানো হয়। তিনি আশ্বাস দেন, কাউকে জোর করে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করা হবে না। একই সঙ্গে আগের সেই প্রথা বাতিল করা হয়, যেখানে এক বছরের জন্য কাজে নিযুক্ত ব্যক্তিকে পরবর্তী বছরগুলোতেও জোরপূর্বক শ্রমিক নিয়োগের দায়িত্ব বহন করতে হতো।

বোর্ড অব রেভিনিউ এই ঘোষণার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যুক্ত করে। বলা হয়, রায়তদের স্বেচ্ছাসম্মতির ভিত্তিতে লবণ উৎপাদন চালানো সম্ভব না হলে সরকার এই উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করবে। অর্থাৎ শ্রমিকদের জোর করে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে প্রয়োজনে উৎপাদন বন্ধ করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল।

নতুন নীতির ফলে প্রথম দিকে লবণ সরবরাহে কিছুটা ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দেয়। হেঙ্কেলও প্রথম বছরে উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সরকার জোরপূর্বক শ্রমিক নিয়োগের পুরোনো ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে রাজি হয়নি। লর্ড কর্নওয়ালিসের ১৭৮৮ সালের ডিসেম্বর মাসের লবণ বিভাগের বিধিমালায় হেঙ্কেলের সংস্কার প্রস্তাবের অধিকাংশ বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৭৯৩ সালের ২৯ নম্বর প্রবিধানে এগুলো সংহত করা হয়। এতে লবণ প্রস্তুতকারকদের ইচ্ছামতো কাজ করা বা কাজ না করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়। তাঁদের দুর্ব্যবহার থেকে রক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়। মধ্যস্থতাকারীদের পরিবর্তে সরাসরি শ্রমিকদের সঙ্গে লেনদেনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ, প্রশাসনের পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছিল, আগের অধিকাংশ অনিয়মের উৎস ছিল এই মধ্যস্থতাকারীরা।

তবে নতুন ব্যবস্থা মি. ইওয়ার্ট ভালোভাবে গ্রহণ করেননি। তাঁর অভিযোগ ছিল, এই ঘোষণার কারণে তাঁর দায়িত্বাধীন এলাকায় শ্রমিক পাওয়া কঠিন হবে। সরকার ঘোষণার কার্যকারিতার সীমানা নির্দিষ্ট করে তাঁর আপত্তি খারিজ করে দেয়। এরপরও ইওয়ার্টের মালঙ্গিরা হেঙ্কেলের রায়মঙ্গল বিভাগের এলাকায় প্রবেশ করে মাইহান্ডারদের বাড়িতে অগ্রিম টাকা রেখে আসত। পরে সেই অগ্রিমের অজুহাতে শ্রমিকদের আটক করা হতো। ইওয়ার্ট দায়িত্ব হস্তান্তরেও অনীহা দেখান এবং আগের মতো কার্যক্রম চালিয়ে যান।

হেঙ্কেল অভিযোগ করেন, ইওয়ার্টের এই কর্মকাÐ তাঁর সংস্কার পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে। লবণ বিভাগের নিয়ন্ত্রক ইওয়ার্টকে দায়িত্ব হস্তান্তর এবং ইতোমধ্যে দেওয়া অগ্রিম টাকা আদায়ের নির্দেশ দেন। কিন্তু হেঙ্কেল এতে আপত্তি জানান। তাঁর দাবি ছিল, অগ্রিমের দায়ে জড়িয়ে পড়া পরগনাগুলো তাঁর বিভাগ থেকে আলাদা করতে হবে।

এ নিয়ে বিরোধ আরও বাড়ে খুলনার লবণ বিভাগের কার্যালয় ও গুদাম দখলকে কেন্দ্র করে। হেঙ্কেল সেগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইলে ইওয়ার্ট আপত্তি জানান। তাঁর দাবি, স্থাপনাগুলোর অন্তত একাংশ তাঁর নিজস্ব সম্পত্তি। হেঙ্কেল বিকল্প হিসেবে জয়নগরের বাড়িগুলো ব্যবহারের দাবি করেন। কিন্তু লবণ বিভাগের নিয়ন্ত্রক এ ক্ষেত্রেও হেঙ্কেলের পক্ষে সিদ্ধান্ত দেননি।

শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস কার্যকর হয় এবং দুই কর্মকর্তার বিরোধ সাময়িকভাবে থামে। তবে হেঙ্কেল লবণ এজেন্ট হিসেবে কতটা সফল হয়েছিলেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য ওয়েস্টল্যান্ড পাননি। পরবর্তী কয়েক বছরের হিসাবপত্রও তাঁর হাতে আসেনি। প্রায় তিন বছর পর আবার দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা হয়। তবে ওয়েস্টল্যান্ড মনে করেন, এটি হেঙ্কেলের সংস্কার ব্যর্থ হওয়ার প্রমাণ নয়; বরং লর্ড কর্নওয়ালিসের বৃহত্তর প্রশাসনিক পুনর্গঠনের ফলও হতে পারে।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: