সম্রাট আকবরের সময় যদি বিরিয়ানি রান্না হতো, তাতে কি আলু থাকত? আজকের বাঙালির কাছে প্রশ্নটি শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে। কারণ আলু ছাড়া বিরিয়ানি, আলু ছাড়া মাংসের ঝোল কিংবা আলু ছাড়া দৈনন্দিন তরকারির কথা ভাবতেই অনেকের কষ্ট হয়। অথচ ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, একসময় ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের রান্নাঘরে আলুর কোনো অস্তিত্বই ছিল না। বাঙালির যে আলুপ্রেম আজ সর্বজনবিদিত, তা কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস, সমুদ্রযাত্রা, বাণিজ্য এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফল।
আলু সেদ্ধ, আলুভর্তা, আলুভাজা, আলু পোস্ত, আলুর দম, আলুর চপ কিংবা আলু দিয়ে মাছ-মাংসের ঝোলÑবাঙালির খাবারের তালিকায় আলুর উপস্থিতি সর্বত্র। ডাল-ভাতের সঙ্গে এক টুকরো আলুভাজা যেমন তৃপ্তি এনে দেয়, তেমনি শীতের সকালে গরম লুচির সঙ্গে আলুর তরকারিও বাঙালির রসনাবিলাসের পরিচিত অনুষঙ্গ। আবার বিরিয়ানির হাঁড়িতে বড় এক টুকরো আলু থাকলে অনেকের কাছে সেই খাবারের স্বাদই যেন পূর্ণতা পায়। যে আলু একসময় এ অঞ্চলের মানুষের কাছে অচেনা ছিল, সেই আলুই আজ বাঙালির রান্নাঘরে প্রায় অপরিহার্য।
তবে সম্রাট আকবরের বিরিয়ানিতে আলু না থাকার গল্পটি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত কোনো ঘটনা নয়। বরং আলুর ইতিহাসের সঙ্গে মুঘল সম্রাট আকবরের সময়কাল মিলিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, তাঁর আমলে ভারতীয় রান্নায় আলুর প্রচলিত ব্যবহার থাকার সম্ভাবনা ছিল না। আকবরের শাসনকাল ছিল ১৫৫৬ থেকে ১৬০৫ সাল। আর আলুর আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পার্বত্য অঞ্চল, বিশেষ করে বর্তমান পেরু ও বলিভিয়ার আশপাশের এলাকা। সেখানকার আদিবাসীরা হাজার হাজার বছর আগে থেকেই আলুর চাষ করত এবং খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করত।
এটি মাটির নিচে জন্মানো একধরনের কন্দজাতীয় খাদ্যশস্য। উদ্ভিদবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আলু গাছের কন্দই মানুষের প্রধান খাদ্য।
ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা আমেরিকা মহাদেশে পৌঁছানোর পর ধীরে ধীরে আলুর পরিচয় ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ষোড়শ শতকে স্পেনীয়দের মাধ্যমে আলু ইউরোপে প্রবেশ করে। প্রথমদিকে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে আলুকে সহজে গ্রহণ করা হয়নি। কোথাও একে অদ্ভুত উদ্ভিদ মনে করা হতো, কোথাও এর খাদ্যগুণ সম্পর্কে সংশয় ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আলুর চাষ ছড়িয়ে পড়ে এবং ইউরোপের বহু দেশে এটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্যে পরিণত হয়।
পর্তুগিজদের সমুদ্রবাণিজ্য ও উপনিবেশ বিস্তারের সঙ্গে আলুর ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ষোড়শ শতকে পর্তুগিজরা ভারতের পশ্চিম উপক‚লে নিজেদের বাণিজ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। গোয়া হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইউরোপীয় খাদ্যদ্রব্য ও কৃষিজ ফসলের পরিচিতি বাড়তে থাকে। আলুও সেই পথ ধরে এ অঞ্চলে প্রবেশ করে বলে সাধারণভাবে মনে করা হয়। তবে ঠিক কোন সালে, কোন বন্দর দিয়ে এবং কার হাত ধরে প্রথম আলু বাংলায় পৌঁছেছিল, তা নিয়ে ইতিহাসে নির্দিষ্ট ও সর্বসম্মত তথ্য নেই।
বাংলায় আলুর বিস্তারের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ শাসনামল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আঠারো শতকের শেষভাগ থেকে উনিশ শতকে আলুর চাষ ও ব্যবহার ক্রমে বাড়তে থাকে। কলকাতা ও তার আশপাশের অঞ্চলে আলু চাষের প্রসার ঘটে। ব্রিটিশরা আলুকে একটি সম্ভাবনাময় কৃষিজ ফসল হিসেবে দেখেছিল। অল্প জায়গায় চাষ করা যায়, তুলনামূলকভাবে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব এবং নানা ধরনের খাবার তৈরিতে ব্যবহার করা যায়Ñএসব বৈশিষ্ট্য আলুকে জনপ্রিয় করে তুলতে সাহায্য করে। তবে বাংলায় আলুর প্রথম আগমন বা প্রথম চাষের নির্দিষ্ট সাল নিয়ে ঐতিহাসিক তথ্য পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
আলু বাংলায় আসার পরই যে রাতারাতি বাঙালির প্রিয় সবজি হয়ে উঠেছিল, তা নয়। একটি নতুন ফসলকে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে জায়গা করে নিতে সময় লাগে। প্রথমে আলুর চাষ, পরে বাজারে সরবরাহ এবং ধীরে ধীরে গৃহস্থের রান্নাঘরে তার প্রবেশÑএই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় আলু নিজের জায়গা তৈরি করে নেয়। উনিশ শতকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে আলুর চাষ ও বাজারজাতকরণ বাড়তে থাকে। সহজলভ্যতা এবং নানা রকম রান্নায় ব্যবহারের সুবিধা এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে ভ‚মিকা রাখে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বাংলার খাদ্যসংস্কৃতিতে আলুর গ্রহণযোগ্যতা ক্রমেই বাড়ছিল।
বাঙালির রান্নায় আলুর সাফল্যের অন্যতম কারণ এর বহুমুখী ব্যবহার। মাছের ঝোল, মাংসের তরকারি, ডালনা, শুক্তো, ঘণ্ট, চচ্চড়িÑপ্রায় সব ধরনের রান্নায় আলু সহজেই মানিয়ে যায়। অন্য সবজির সঙ্গে মিশে এটি তরকারির পরিমাণ বাড়ায়, আবার স্বাদ ও গঠনেও আলাদা মাত্রা যোগ করে। আলু দিয়ে তৈরি করা যায় অসংখ্য নিরামিষ পদ। সামান্য লবণ-মরিচ দিয়ে সেদ্ধ আলু মেখে নিলেও তৈরি হয় পরিচিত আলুভর্তা। সরষের তেলে কুচি করে কাটা আলু ভেজে নিলেই আলুভাজা। পোস্তবাটা দিয়ে রান্না করলে সেই আলুই হয়ে ওঠে বাঙালির প্রিয় আলু পোস্ত। রান্নার এই বৈচিত্র্য আলুকে ঘরের খাবারে স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছে।
বিরিয়ানিতে আলু দেওয়া কোনো প্রাচীন ভারতীয় রীতি নয়। কলকাতার বিরিয়ানির সঙ্গে আলুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে উনিশ শতকে, নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের কলকাতায় আগমনের পরবর্তী সময়ে বলে খাদ্য-ইতিহাসে বহুল প্রচলিত ব্যাখ্যা রয়েছে। ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশরা তাঁকে লক্ষ্ণৌ থেকে নির্বাসিত করে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে নিয়ে আসে। তাঁর সঙ্গে আসা রাঁধুনিদের হাত ধরে লক্ষ্ণৌয়ের রান্নার ঐতিহ্য কলকাতায় নতুনভাবে বিকশিত হয়। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা মেটাতে মাংসের পরিমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আলু ব্যবহারের যে কাহিনি প্রচলিত, তা কলকাতার বিরিয়ানির পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে আলু ঠিক কী কারণে প্রথম বিরিয়ানিতে দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত সমসাময়িক প্রমাণ সীমিত।
আলুর এই যাত্রায় আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। যে ফসল একসময় বিদেশি বলে পরিচিত ছিল, বাঙালি তাকে নিজের মতো করে গ্রহণ করেছে। শুধু অন্য দেশের রান্নার অনুকরণ করেনি; স্থানীয় মশলা, সরষের তেল, পোস্ত, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ এবং মাছ-মাংসের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করেছে নিজস্ব স্বাদের অসংখ্য পদ। এভাবেই বিদেশ থেকে আসা আলু বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।


























