এক সময় যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র চৌরাস্তা মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকত এক অমলিন নাম—‘”মধুসূইট্ এন্ড রেস্টুরেন্ট” শুধু একটি মিষ্টির দোকান এটি ছিল শহরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক উজ্জ্বল মিলনস্থল। আজ সেই দোকান আর নেই; সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে তার অস্তিত্ব। দোকানটির মালিক ছিলেন মধুসূদন সাহা—অমায়িক, অতিথিপরায়ণ এক মানুষ। তাঁর হাতে গড়া সন্দেশ আর কাঁচা গোল্লা ছিল শহরের গর্ব। এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি যশোর শহরে বসবাস করেছেন অথচ ‘মধু সুইটস’-এর মিষ্টি খাননি। প্রতিটি উৎসব, বিয়ে, পারিবারিক আয়োজন—সবখানেই ছিল এই দোকানের মিষ্টির কদর।
এটি ছিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষদের আড্ডারও প্রিয় স্থান। রাজনৈতিক নেতা বিমল রায় চৌধুরী, তরিকুল ইসলাম, খালেদুর রহমান টিটো এবং তাঁদের সহকর্মী ও বন্ধুরা এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতেন। চায়ের কাপে চুমুক আর মিষ্টির প্লেট সামনে রেখে চলত রাজনীতি, সাহিত্য, সমাজ—নানা প্রসঙ্গের আলোচনা। সেই আড্ডার প্রাণচাঞ্চল্য আজ আর নেই।
‘মধু সুইটস এন্ড রেস্টুরেন্ট’-এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল যশোরের সীমানা পেরিয়ে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্য, যিনি পড়াশোনা করেছিলেন যশোর সম্মিলনী ইন্সটিটিউশন–এ, তাঁর সঙ্গে মধুসূদন সাহার ছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক। সেই বন্ধুত্বের টানেই মেয়ের বিয়ের জন্য তিনি যশোর থেকে ‘মধু সুইটস এন্ড রেস্টুরেন্ট’-এর মিষ্টি নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই বিয়ের আসরে উপস্থিত ছিলেন সাহিত্যিক অন্নদা শঙ্কর রায়, শিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, অভিনেত্রী অপর্ণা সেন, অভিনেতা রবি ঘোষসহ আরও অনেকে। তাঁদের প্রশংসায় ভরে উঠেছিল ‘মধু সুইটস’-এর মিষ্টির সুনাম।
আজ দোকানটি নেই, নেই সেই ব্যস্ততা, নেই আড্ডার উচ্ছ্বাস। কিন্তু যশোরের প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনো ভেসে ওঠে সেই দোকানের কাচের শোকেস, সারি সারি সন্দেশ, আর টাটকা কাঁচা গোল্লার মিষ্টি গন্ধ। ‘মধু সুইটস এন্ড রেস্টুরেন্ট’ হয়তো হারিয়ে গেছে সময়ের অতলে, কিন্তু তার স্বাদ আর গল্পগুলো আজও বেঁচে আছে যশোরের হৃদয়ে—একটি শহরের মধুর অতীত হয়ে।


























