ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করতে ঝিনাইদহের ৬৭টি ইউনিয়ন পরিষদে সরকারি ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হলেও অধিকাংশ স্থানে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। কোথাও দীর্ঘদিন ধরে সংযোগ বিচ্ছিন্ন, কোথাও আবার ইন্টারনেটের ধীরগতিতে ব্যাহত হচ্ছে অনলাইন কার্যক্রম। জন্মনিবন্ধন, মৃত্যুসনদ ও ওয়ারিশ সনদসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে মানুষকে। একই কাজের জন্য একাধিকবার ইউনিয়ন পরিষদে আসতে হচ্ছে অনেককে।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ ঘুরে দেখা গেছে, সরকারি ইন্টারনেটের ধীরগতি ও সংযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে নিয়মিত নাগরিক সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সার্ভারে প্রবেশ করতে দীর্ঘ সময় লাগছে। কখনো সংযোগ পাওয়া গেলেও কাজের মাঝপথে তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। ফলে একটি কাজ শেষ করতে স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এসেও সেবা না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে অনেককে।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পদ্মাকর ইউনিয়ন পরিষদের পরিস্থিতি আরও জটিল। সেখানে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে সরকারি ইন্টারনেট সংযোগ। সম্প্রতি হাওর-বাওড় প্রকল্পের মাধ্যমে বিকল্প একটি সংযোগ দেওয়া হলেও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অনলাইনভিত্তিক সরকারি সেবা কার্যক্রম পরিচালনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনীয় সেবা দিতে বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। এতে সময় ও শ্রম বাড়ার পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সেবাপ্রত্যাশীরা।
শুধু পদ্মাকর ইউনিয়ন নয়, জেলার অন্যান্য ইউনিয়ন পরিষদেও সরকারি ইন্টারনেটের ধীরগতি ও সংযোগ বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের সরঞ্জাম থাকলেও তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও সংযোগ থাকলেও গতি এত কম যে অনলাইন সেবার সার্ভারে প্রবেশ করতেই দীর্ঘ সময় লাগছে। কাজের মাঝখানে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে নতুন করে প্রক্রিয়া শুরু করতে হচ্ছে। এতে উদ্যোক্তাদের কাজের চাপ বাড়ছে। সময়মতো সেবা দিতে না পেরে বিব্রত হচ্ছেন জনপ্রতিনিধিরাও।
জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ঝিনাইদহের ৬৭টি ইউনিয়ন পরিষদকে অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে সরকারি নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়। এর মধ্যে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) মাধ্যমে এবং জেলার অন্য পাঁচ উপজেলার ৫০টি ইউনিয়নে ইনফো-সরকার তৃতীয় পর্যায় প্রকল্পের আওতায় নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ডিজিটাল অবকাঠামোর সুফল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পুরোনো সংযোগ, যন্ত্রপাতির ত্রুটি, নেটওয়ার্কের দুর্বলতা ও রক্ষণাবেক্ষণের সীমাবদ্ধতায় ব্যাহত হচ্ছে নাগরিক সেবা। অথচ জন্মনিবন্ধন, বিভিন্ন সনদ প্রদান এবং সরকারি দপ্তরের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের বড় অংশই এখন অনলাইননির্ভর। নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট না থাকলে ইউনিয়ন পরিষদের দৈনন্দিন কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
জন্মনিবন্ধন সেবা নিতে আসা সেবাপ্রত্যাশী রুবেল হোসেন বলেন, ‘জন্মনিবন্ধনের একটি কাজ করতে এসে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হচ্ছে। ইন্টারনেট না থাকলে বা গতি না থাকলে আমাদেরই সময় নষ্ট হয়। দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা দরকার।’
ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা সোবহান মোল্লা বলেন, ‘অনলাইনে সরকারি বিভিন্ন সেবা দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের ওপর। কিন্তু ইন্টারনেটের ধীরগতির কারণে সময়মতো কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। অনেক সময় সার্ভারে ঢুকতেই দীর্ঘ সময় লাগে। একটি কাজ করতে যে সময় লাগার কথা, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে। এতে সেবাপ্রত্যাশীদের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।’
ইউপি সদস্য আকমল হোসেন বলেন, ‘মানুষ সেবা নিতে ইউনিয়ন পরিষদে আসেন। কিন্তু ইন্টারনেটের কারণে যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমাদেরও বিব্রত হতে হয়। দ্রুত সমস্যাটির সমাধান প্রয়োজন।’
এ বিষয়ে ঝিনাইদহের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) নোমান হোসেন বলেন, ‘ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ইন্টারনেটের গতি বাড়াতে ইতোমধ্যে নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে অনলাইনভিত্তিক নাগরিক সেবার মান ও গতি দুটোই বাড়বে।’


























