শনিবার ০৭ নভেম্বর ২০২৬

২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যশোরে গাঁতি প্রজাস্বত্ব, খাজনা বৃদ্ধি ও  লাখোরাজ জমি পুনর্দখলের উদ্যোগ

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৪:০৫, ৭ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৪:০৫, ৭ নভেম্বর ২০২৬

যশোরে গাঁতি প্রজাস্বত্ব, খাজনা বৃদ্ধি ও  লাখোরাজ জমি পুনর্দখলের উদ্যোগ

যশোর জেলার ব্রিটিশ শাসনের প্রথম দিকের ভূমিব্যবস্থা, জমিদার-প্রজা সম্পর্ক এবং রাজস্ব আদায়ের নানা অসংগতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় জেমস ওয়েস্টল্যান্ডের ‘এ রিপোর্ট অন দ্যা ডিস্ট্রিক্ট অফ যশোর’ গ্রন্থে। প্রতিবেদনে তিনি তৎকালীন কালেক্টর মি. হেঙ্কেলের পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তাবের ভিত্তিতে গাঁতি প্রজাস্বত্ব, জমির খাজনা বৃদ্ধি এবং লাখোরাজ বা খাজনামুক্ত জমি পুনরুদ্ধারের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।

ওয়েস্টল্যান্ডের বর্ণনা অনুযায়ী, গাঁতি প্রজাস্বত্বের উৎপত্তি সম্পর্কে মি. হেঙ্কেলের একটি ধারণা ছিল। তাঁর মতে, কোনো ব্যক্তিকে স্বল্প খাজনায় নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি দেওয়া হতো। বিনিময়ে ওই ব্যক্তি সংলগ্ন অন্যান্য জমির কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব বা খাজনা সংগ্রহ করে জমিদারের কাছে জমা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতেন। এই ব্যবস্থায় গাঁতিদারের সঙ্গে কৃষিকাজ ও রাজস্ব সংগ্রহের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। ওয়েস্টল্যান্ড মনে করেন, সব গাঁতি প্রজাস্বত্বের উৎপত্তি এভাবে না হলেও অনেক জায়গায় গাঁতিদার ও কৃষকের মধ্যে এমন সম্পর্ক তখনো বিদ্যমান ছিল। মি. হেঙ্কেলের উত্তরসূরির একটি চিঠিতেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছিল, প্রায় সব চাষি রায়ত কোনো না কোনো কৃষক অথবা গাঁতিদারকে খাজনা প্রদান করেন।

তবে বর্তমানে প্রচলিত সব গাঁতি প্রজাস্বত্ব এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়নি। অনেক গাঁতির উৎপত্তি পরবর্তী সময়ে, যার সঙ্গে ভূমি ব্যবস্থাপনার চেয়ে জমিদারের অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা বেশি জড়িত ছিল। উদাহরণ হিসেবে ওয়েস্টল্যান্ড উল্লেখ করেন, ১৭৯৬ সালে আর্থিক সংকটে পড়ে চাঁচড়ার রাজা ইসাফপুর জমিদারিতে বিপুলসংখ্যক গাঁতি প্রজাস্বত্ব সৃষ্টি করেন। এসব স্বত্ব প্রদানের বিনিময়ে তিনি প্রজাদের কাছ থেকে এককালীন অর্থ বা নজরানা গ্রহণ করেছিলেন।

মি. হেঙ্কেল মনে করতেন, যশোরে জমির রাজস্ব বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে তার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক স্থানীয় অনুসন্ধান। কারণ, তখন প্রতিবছর যে রাজস্ব বন্দোবস্ত করা হতো, তা ছিল অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি জমিদার ও তাঁদের কর্মচারীরাও নিজেদের জমিদারির প্রকৃত আয়তন ও সম্পদ সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিলেন না। অনেক রায়ত নামমাত্র কয়েক বিঘা জমির জন্য উচ্চহারে খাজনা দিলেও প্রকৃতপক্ষে তার দ্বিগুণ বা তিনগুণ জমি চাষ করতেন। অতিরিক্ত জমির উৎপাদন থেকেই তাঁরা বেশি খাজনার বোঝা বহন করতে পারতেন।

এ পরিস্থিতিতে জমিদার ও রায়তদের মধ্যে প্রায়ই বিরোধ সৃষ্টি হতো। রায়তরা প্রকৃত দখলীয় জমির পরিমাণ গোপন করার চেষ্টা করতেন। অন্যদিকে জমিদাররা খাজনা বাড়ানোর পাশাপাশি নানা ধরনের অতিরিক্ত কর বা সেস আদায় করতেন। এসব করের ভিত্তি ছিল একটি ভুল ধারণা- সব রায়তের ওপর মূল খাজনা বা জমার বোঝা সমান। ফলে সাধারণ কৃষকদের ওপর নিপীড়ন ও আর্থিক চাপ বাড়ত। মি. হেঙ্কেলের প্রস্তাব ছিল, রায়তদের সমগ্র দখলীয় জমির নিশ্চয়তা দিয়ে পাট্টা দেওয়া হলে তাঁরা বর্ধিত খাজনাতেও তা গ্রহণ করতে রাজি হবেন। শর্ত থাকবে, জমিদাররা আর কোনো অতিরিক্ত কর দাবি করতে পারবেন না।

সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় ছিল লাখোরাজ বা খাজনামুক্ত জমি। ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের আগে থেকে প্রচলিত অনুদান এবং পরবর্তী সময়ে দেওয়া খাজনামুক্ত স্বত্বের বৈধতা নির্ধারণ করা ছিল জটিল বিষয়। সরকার প্রস্তাব করেছিল, দেওয়ানি হস্তান্তরের আগে অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়নি, এমন কিছু স্বত্ব পুনরায় অধিগ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে যে-সব অনুদান স্পষ্টভাবে বংশানুক্রমিক হিসেবে দেওয়া হয়নি, সেগুলোকে বংশানুক্রমিক বলে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না।

১৭৭২ সালে ব্রিটিশরা সরাসরি রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব গ্রহণের সময় খাজনামুক্ত অনুদান প্রদান নিষিদ্ধ করা হয়। এর আগে দেওয়া অকার্যকর অনুদানের ক্ষেত্রে অনুদান গ্রহীতাদের জীবদ্দশায় অর্ধেক জমি ভোগের সুযোগ রাখার প্রস্তাব ছিল। অকার্যকর অনুদান শনাক্ত করতে দেশীয় কর্মকর্তা নিয়োগ এবং তাঁদের প্রথম বছরের আদায়কৃত রাজস্বের মাধ্যমে পুরস্কৃত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়। অনুদান গোপন করলে আদায়যোগ্য রাজস্বের তিনগুণ জরিমানার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল।

মি. হেঙ্কেল অবশ্য এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর অনুমান ছিল, যশোর জেলায় খাজনামুক্ত জমির পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার বিঘা। এটি জেলার মোট আবাদি ও অনাবাদি জমির প্রায় এক-বিশ ভাগ বা তারও বেশি। তাঁর ধারণা ছিল, সরকারের প্রস্তাব কার্যকর হলে এসব জমির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পুনরায় বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব হবে।

কিন্তু এ কাজে বড় সমস্যা ছিল বৈধ অনুদান শনাক্ত করা। ব্রিটিশ শাসনের আগে দেওয়া অনুদান স্বীকৃতি দেওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দলিলপত্র সংরক্ষিত ছিল না। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য সংগ্রহ করাও কঠিন ছিল। ১৭৬৬ সাল পর্যন্ত বৈধ অনুদান গ্রহীতাদের নিজেদের স্বত্ব ও দখল প্রমাণ করতে গিয়ে নানা বাধার মুখে পড়তে হতো। ১৭৬৬ থেকে ১৭৭২ সালের মধ্যবর্তী অনুদান নিয়েও প্রশ্ন ছিল। মি. হেঙ্কেলের মতে, জমিদাররা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রীতিতে লাখোরাজ জমি দান করে আসছিলেন। তাই পূর্ববর্তী কোনো বিধানের অজুহাতে এসব অনুদান অবৈধ ঘোষণা করা অন্যায় হতো। সাধারণ অনুদানের ক্ষেত্রে বংশানুক্রমিক অধিকারের বিষয়টিও সব সময় দলিলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হতো না।
 

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ: