আইয়ুব হোসেন মনা
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ, ব্যবস্থাপত্র ও ওষুধ—সবই বিনা মূল্যে। অর্থাভাবে যাদের চিকিৎসক দেখানো ও ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই, তাদের ভরসা যশোরের ফ্রি ফ্রাইডে ক্লিনিক। কৈশোরের স্কুলজীবনের বন্ধুদের নিয়ে গঠিত সংগঠন ‘বন্ধু ফোরাম ৭১’-এর সদস্যরা নিজেদের অর্থে ক্লিনিকটি পরিচালনা করছেন। তবে গত কয়েক বছরে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় সদস্যদের চাঁদার টাকায় ওষুধের চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রতি মাসে দুই শুক্রবার ক্লিনিকটিতে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ দেওয়া হয়। যশোর শহরের রেলরোডে রেলস্টেশন বাজারসংলগ্ন একটি দ্বিতল ভবনের নিচতলায় ক্লিনিকটির অবস্থান। পৌরসভা দাতব্য চিকিৎসাসেবা পরিচালনার জন্য ভবনটি বরাদ্দ দিয়েছে। সংগঠনটির সদস্যদের নিয়মিত চাঁদা ও চিকিৎসক সদস্যদের আর্থিক সহযোগিতায় ক্লিনিকের খরচ মেটানো হয়।
ক্লিনিক সূত্র জানায়, বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ বিতরণের পাশাপাশি দরিদ্র রোগীদের বিভিন্ন রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিনা মূল্যে করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য রোগ নির্ণয়ের কাজে ব্যবহৃত কিছু যন্ত্রপাতি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশে-বিদেশে অবস্থানরত বন্ধুদের কেউ কেউ এ কাজে আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা ও প্যাথলজি ল্যাব প্রতিষ্ঠায় বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সমাজের সামর্থ্যবান ও দানশীল ব্যক্তিদের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ক্লিনিক-সংশ্লিষ্ট সূত্র।
গত শুক্রবার ভোর ছয়টা থেকেই ক্লিনিকটিতে রোগীদের আসা-যাওয়া শুরু হয়। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ভিড়। তাদের অধিকাংশই বয়স্ক। পাশাপাশি ছোট শিশুরাও আসে চিকিৎসা ও ওষুধ নিতে। রোগীদের শারীরিক সমস্যার কথা শুনে ব্যবস্থাপত্র দেন চিকিৎসকেরা। এরপর ক্লিনিকের স্টোর থেকে ওষুধ এনে ফার্মেসি কর্নার থেকে ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী বিনা মূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা হয়।
২৬ বছর ধরে চলছে এই উদ্যোগ। শুরুতে শহরের চৌরাস্তা এলাকার জেস টাওয়ারের বারান্দায় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হতো। পরে লালদিঘিপাড়ে পৌরসভার পুরোনো ভবনে কার্যক্রম চলে। ভবনটি ভেঙে ফেলার পর রেলরোডের বর্তমান ঠিকানায় কার্যক্রম শুরু হয়।
বন্ধু ফোরাম ৭১-এর সাধারণ সম্পাদক আবু জাহিদ জানান, দৈনিক রানারের সম্পাদক সাইফুল আলম মুকুল সন্ত্রাসীদের হাতে শহীদ হওয়ার পর ‘মুকুল বন্ধু ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়। সেই সংগঠন থেকেই বন্ধু ফোরাম ৭১-এর যাত্রা শুরু। তিনি জানান, ২০০০ সালের দিকে ভারত থেকে আসা পানিতে যশোরের সীমান্তবর্তী এলাকায় বন্যা দেখা দেয়। সেই সময় ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি ১৯৭১ সালের এসএসসি ব্যাচের বন্ধুরা মিলে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেন। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়েই বন্ধু ফোরাম ৭১ সাংগঠনিক রূপ পায়। পরে সবাই মিলে ফ্রি ফ্রাইডে ক্লিনিক পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন।
আবু জাহিদ বলেন, বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি কেনা এবং প্যাথলজি পরীক্ষার জন্য একটি ল্যাব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশে-বিদেশে থাকা বন্ধুদের কেউ কেউ এ কাজে আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি আরও জানান, রোগীর চাপ বাড়ায় ওষুধের চাহিদা মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়ানো সম্ভব হবে।
ক্লিনিকে আসা রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের অধিকাংশই আর্থিকভাবে অসচ্ছল। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখানো, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো এবং ওষুধ কেনার খরচ বহন করা তাদের জন্য কঠিন। তাদের কেউ শ্বাসকষ্ট, কেউ গোড়ালির ব্যথা, আবার কেউ গ্যাস্ট্রিক ও ডায়াবেটিসজনিত সমস্যায় ভুগছেন। নারীদের কেউ কেউ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা নিতে আসেন। শিশুদের মধ্যে জ্বর, পেটব্যথা ও কাশির রোগীও রয়েছে।
বন্ধু ফোরাম ৭১-এর সভাপতি আব্দুল আজিজ বলেন, মূলত বন্ধুদের কাছ থেকে প্রাপ্ত আর্থিক সহায়তা দিয়ে ওষুধ কেনাসহ ক্লিনিকের যাবতীয় ব্যয় বহন করা হয়। দেশে-বিদেশে অবস্থানরত বন্ধুরা যাকাতের টাকাসহ বিভিন্ন সামাজিক সেবামূলক কাজে ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা অর্থ ক্লিনিকের তহবিলে দেন। সেই অর্থ দিয়ে ২০০০ সালের পর থেকে ক্লিনিকটির কার্যক্রম চলছে।
ফ্রি ফ্রাইডে ক্লিনিকের সাধারণ সম্পাদক ডা. শেখ আবুল কাসেম বলেন, জ্বর, সর্দি, কাশি, আমাশয়সহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে রোগীরা এখানে আসেন। তাদের বিনা মূল্যে ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার পাশাপাশি ওষুধও সরবরাহ করা হয়।
ক্লিনিকে দেখা যায়, চিকিৎসকেরা রোগীদের শারীরিক সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। ব্যবস্থাপত্র লেখার পাশাপাশি ওষুধ সেবনের নিয়ম ও পরিমাণ বুঝিয়ে দিচ্ছেন। পরে অন্য একটি ডেস্ক থেকে রোগীদের বিনা মূল্যে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকদের কয়েকজন মেডিসিন, গাইনি ও গ্যাস্ট্রোলিভার বিশেষজ্ঞ। তারা সবাই বন্ধু ফোরাম ৭১-এর সদস্য। বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি ওষুধ কেনার জন্যও তারা অর্থ দেন। কোনো কোনো অসচ্ছল রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচও ব্যক্তিগতভাবে বহন করেন তারা।
শহরের শংকরপুর এলাকার ফাতেমা বেগম (৬৫) জানান, বেশ কিছুদিন ধরে তিনি শ্বাসকষ্ট ও শরীরের বিভিন্ন জোড়ায় ব্যথায় ভুগছিলেন। গত তিন মাস ধরে এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিনা মূল্যে চিকিৎসক দেখাতে ও ওষুধ পেতে তার সুবিধা হচ্ছে।
আবুল কালাম (৭৫) বলেন, কিছুদিন ধরে তিনি শারীরিক দুর্বলতা ও শরীরব্যথায় ভুগছিলেন। এখানে চিকিৎসা নেওয়ার পর এখন ভালো আছেন।
ফ্রি ফ্রাইডে ক্লিনিকের সভাপতি ডা. শাহিদুর রহমান বলেন, অনেক সময় রোগীদের প্যাথলজি পরীক্ষার খরচও তারা ব্যক্তিগতভাবে বহন করেন। প্রতি শুক্রবার ১২০ থেকে ১৫০ জন রোগীকে বিনা মূল্যে ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হয়। প্রত্যেক রোগীকে গড়ে প্রায় ৩০০ টাকার ওষুধ সরবরাহ করা হয়।


























