রোববার ০৪ অক্টোবর ২০২৬

১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বন্ধ ছয় চিনিকল চালুর উদ্যোগসহ একগুচ্ছ পরিকল্পনা

লোকসানের বৃত্ত ভাঙার লড়াইয়ে চিনিশিল্প করপোরেশন

মাঈনুল ইসলাম, ঢাকা

প্রকাশিত: ২২:২১, ৩ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ২২:৩৩, ৩ অক্টোবর ২০২৬

লোকসানের বৃত্ত ভাঙার লড়াইয়ে চিনিশিল্প করপোরেশন

বছরের পর বছর লোকসানের বোঝা, পুরোনো যন্ত্রপাতি, কাঁচামালের সংকট ও ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে চলা রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিশিল্পকে ঘুরে দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ থাকা ছয়টি চিনিকল পর্যায়ক্রমে চালু, উৎপাদনব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং আখচাষিদের প্রণোদনা বাড়িয়ে শিল্পটিকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি)।

নতুন চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শামছুজ্জামান সুরুজ দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব পরিকল্পনা সামনে এসেছে। তাঁর লক্ষ্য শুধু বন্ধ কারখানা চালু করা নয়; উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে, ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে চিনিকলগুলোকে টেকসই করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে পরামর্শ করে তিনি এগুচ্ছ পরিকল্পনা তৈরি করেছেন। ইতোমধ্যে সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়েছে। 

তিনি জানান, দেশে বছরে প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ টন চিনির চাহিদা রয়েছে। এরমধ্যে ১৮ থেকে ২০ লাখ টন খাদ্যপণ্য তৈরিতে শিল্প কলকারখানায় ব্যবহৃত হয়। বাকি দেড় থেকে দুই লাখ টন মানুষের খাবার জন্য ব্যবহার হয়। আমাদের টার্গেট মানুষের ভোগ্যপণ্য হিসেবে ভালোমানের চিনি পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু এই মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় চিনিকলগুলো মৌসুম ভেদে আখ থেকে চিনি উৎপাদন করে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ হাজার টন চিনি। সেই হিসেবে উৎপাদন হচ্ছে চাহিদার মাত্র ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ। ভবিষ্যতে এটাকে শতভাগ করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন। এজন্য ২০২০ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া শ্যামপুর, সেতাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, পাবনা, পঞ্চগড় ও রংপুর চিনিকল পর্যায়ক্রমে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন লোকসানি খাত নয় উল্লেখ করে তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ‘আমাদের এই খাত লোকসানি খাত নয়। বছরে আমরা প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি ব্যাংক ইন্টারেস্ট দিচ্ছি। প্রায় ২১৩ কোটি কর দিচ্ছি সরকারকে। সামাজিকভাবে স্কুল-কলেজ, ক্লিনিক পরিচালনা করি। সেখানে আমাদের প্রচুর টাকা খরচ হয়। স্কুল কলেজের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দিই। পরিবহনের স্বার্থে সড়ক নির্মাণ করি। সেখানেও টাকা খরচ হয়। এসব খরচ যদি সরকার করে তাহলে তো অনেক খরচ হতো। এসব হিসাব করলে চিনিশিল্প লোকসানি খাত নয়।’


নতুন পরিকল্পনায় শুধু বন্ধ মিল চালু নয়, উৎপাদনব্যবস্থার সংস্কারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত যন্ত্রপাতি সংযোজন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলছে বিএসএফআইসি।

চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শামছুজ্জামান সুরুজ বলেন, ‘কেবল বন্ধ কারখানা খুলে দিলেই চিনিশিল্পের সংকটের সমাধান হবে না। কারখানায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদনব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত যন্ত্রপাতি যুক্ত করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘চিনিকলকে শুধু চিনি উৎপাদনের কারখানা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে আখচাষি, শ্রমিক-কর্মচারী, ব্যবসায়ীসহ একটি বিস্তৃত স্থানীয় অর্থনীতি জড়িত। তাই শিল্পটিকে টেকসইভাবে দাঁড় করাতে হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হবে।’

বন্ধ চিনিকলগুলো পর্যায়ক্রমে চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় চিনিশিল্পকে আমরা উৎপাদনমুখী করতে চাই। ধাপে ধাপে বন্ধ চিনিকলগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এর সঙ্গে আধুনিকায়ন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।’


আখচাষিদের বিষয়ে চেয়ারম্যান বলেন, ‘কৃষককে আস্থায় না নিয়ে চিনিশিল্পকে টেকসই করা সম্ভব নয়। আখের ন্যায্য মূল্য, প্রণোদনা এবং দ্রুত পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।’
আখ চাষে বাড়ছে প্রণোদনা, চিনিশিল্পকে টেকসই করতে আখ চাষিদের উৎপাদনে ফেরানো ও উৎসাহিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান।


তিনি বলেন, ‘চাষিদের উৎসাহিত করতে আখের মূল্য প্রতি কুইন্টাল ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২৫ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আখচাষিদের প্রণোদনার পরিমাণ দ্বিগুণ করে ৬ কোটি টাকা থেকে ১২ কোটি টাকা করা হয়েছে।’
চাষিদের পাওনা পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ করতে ডিজিটাল ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য, আখের ওজন সম্পন্ন হওয়ার পরপরই চাষির মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের তথ্য জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে অর্থ পাওয়ার জন্য আগের মতো বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে না।

চিনিশিল্পে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে চীনা বিনিয়োগকারীদের কয়েকটি দল বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
চেয়ারম্যান শামছুজ্জামান সুরুজ বলেন, ‘ভবিষ্যতে সরকারি চিনিকলগুলোকে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও স্বনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্য রয়েছে। এজন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সংগ্রহের পাশাপাশি বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগও বিবেচনা করা হচ্ছে।’
 

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ: