ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় যশোরের ছয়টি সংসদীয় এলাকায় বিএনপির কর্মী সমর্থকদের হামলায় জামায়াতের অর্ধশতাধিক কর্মী, সমর্থক আহত ও বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় প্রেসক্লাব যশোর মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন জেলা জামায়াতের আমির ও যশোর-৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রসুল।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন- জামায়াতের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য যশোর-১ আসনের মাওলানা আজীজুর রহমান, যশোর-২ আসনের ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ, যশোর-৫ আসনের গাজী এনামুল হক ও যশোর-৬ আসনের অধ্যাপক মোক্তার আলী। তারা নিজ নিজ এলাকার সহিংসতার চিত্র তুলে ধরেন সংবাদ সম্মেলনে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জেলা জামায়াতের আমির ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রসুল বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। যশোর জেলায় বিভিন্ন আসনে নির্বাচনের আগে মহিলা ভোট কর্মীদের নির্যাতন করা হয়েছে। তারপরও নির্বাচনে যশোরাঞ্চলে ব্যালট বিপ্লবে যশোরের ছয়টি আসনের পাঁচটিতে জামায়াত নেতৃত্ত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের পাঁচজন প্রার্থী বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছে। ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর দাঁড়িপাল্লা প্রতিকের ভোটার কর্মী ও নেতা কর্মীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়- বৃহস্পতিবার ঝিকরগাছার নাভারণ ইউনিয়নের বায়সা গ্রামের বিএনপির কর্মীরা জামায়াতের সমর্থক রেজাউল হোসেনের পেটে ছুরিকাঘাত করেছে। আহত রেজাউল শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। বায়সা বাজারের ব্যবসায়ীদের দোকান খুলতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। গ্রামের নারী ভোটার মনিকা মারধর করে রক্তাক্ত জখম করেছে। বিভিন্ন গ্রামে ভোটারদের হুমকি ধামকি দেয়া হচ্ছে। চৌগাছায় জগদীশপুর ইউনিয়নের আড়কান্দি গ্রামে মসজিদের ইমাম মোয়াজ্জেন ও কমিটি থেকে জামায়াতে ইসলামীর লোকদের বের করে দেয়ার সরাসরি হুমকি দেয়া হয়েছে।
চৌগাছা উপজেলা ফুলসারা ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের আবেদ আলীর বাড়িতে রামদা, লোহার রড, বাঁশের লাি সহ ধারালো অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করেছে। বাড়ির জানালার গ্লাস ভাঙচুর করেছে এলাকার মেহের আলী, রবিউল ইসলাম, ইমামুল, আল আমিন, হোসেন আলী, বাবু, রাজ্জাক, মুনতাজসহ অজ্ঞাত আরো অনেকে।
ফুলসারা ইউনিয়নের দুর্গাবরকাটি গ্রামের সাবেক মেম্বার তোফাজ্জেল এর বাড়ি-ঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। তার মেয়েকে বেধড়ক পিটিয়েছে। তাকে শ্লীলতাহানি করেছে। মেয়েটি ঘটনার পর আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।
শার্শা উপজেলার বেলতা গ্রামে নির্বাচনি কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার কারণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা কর্মীদের ওপর হামলা করছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। বৃহস্পতিবার বেলতা গ্রামে জামায়াতের নির্বাচনি কাজ চলাকালে বিএনপির স্থানীয় নেতা মৃত অমর বিশ্বাসের দুই ছেলে মিলন বিশ্বাস (৬৫) ও তরিকুল বিশ্বাস (৫৫)-এর নেতৃত্বে একটি দল অতর্কিত হামলা চালায়। হামলায় অংশ নেয় মনসুর (৫০) ও তার দুই ছেলে মারুফ (২৫) ও মামুন (২৪), লতা ডাক্তারের ছেলে জীম (২০), এক্সরের ছেলে টিপু (২৪), মসলেমের ছেলে ওদু বিশ্বাস (৪২) এবং মৃত কাওসারের ছেলে টুকু বিশ্বাস (৫৬)। হামলাকারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে জামায়াত কর্মীদের ওপর চড়াও হয়। এতে কয়েকজন আহত হন। এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শার্শা উপজেলার লক্ষ্মণপুর ইউনিয়নে বিএনপির নেতা আহসান হাবীব খোকন ও আরমানের নেতৃত্বে দফায় দফায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে এলাকায় ভয়ভীতি ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমনকি একজন প্রিজাইডিং অফিসারকে মারধর করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে বিজয়ী হলেও নির্বাচনের পরপরই বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রতিশোধমূলক সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েছে। এসব ঘটনার ফলে জামায়াতের শত শত নেতাকর্মী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
সদর উপজেলার সুজলপুরের জামতলার মোড়ে কে বা কারা বৃহস্পতিবার রাতে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এরপর শুক্রবার সকালে জামায়াত কর্মী সুমনের বাড়িতে ১০টি মোটরসাইকেলে ৩০ জন বিএনপি’র কর্মী গিয়ে তাকে খোঁজাখুঁজি করে। ওইসময় সুমন বাড়িতে ছিলেন না। তারা সুমনকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে।
হামলায় আহত জামায়াত কর্মীরা শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা ও প্রতিশোধমূলক হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দোষীদের আইনের আওতায় এনে এলাকায় শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে করার দাবি জানাচ্ছি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন হবে এক দল হারবে কেউ জিতবে তাই বলে প্রতিপক্ষের ওপর এই আচরণ সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক। আমরা ঘটনার প্রতিবাদ জানাচ্ছি। সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা করার আহ্বান জানাচ্ছি। শার্শা, মনিরামপুর, কেশবপুর, বাঘারপাড়া অভয়নগরেও অনুরূপ সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চলমান। আমরা এর প্রতিকার চায়।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক গোলাম রসুল বলেন, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ভালো ছিল। তবে নির্বাচন পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা সন্তোষজনক নয়। আমরা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাবো, জাতির এই ক্রান্তিকালে দেশের পরিবেশ শান্ত রাখার জন্য আরও শক্ত অবস্থান থাকতে হবে। যশোরের পরিস্থিতি শান্ত রাখার জন্য তাদেরকে আরও আন্তরিক হতে হবে।
এ যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু সাংবাদিকদের বলেন, হামলাসংক্রান্ত তথ্য আমাদের কাছে নেই। জামায়াতের পক্ষে থেকে আমাদের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার প্রমাণ দিলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


























