একসময় ‘ছোট্ট গ্রুপ’ বলে তাচ্ছিল্য করা ব্রিকস দুই দশকের ব্যবধানে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রভাবশালী জোটে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক জিডিপির ৪১ শতাংশ ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর দখলে থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বিপরীতে জি-৭-এর অংশ নেমে আসতে পারে ২৮ শতাংশে। অর্থনৈতিক শক্তির এই পরিবর্তনের মধ্যেই আজ শনিবার ভারতের নয়াদিল্লিতে বসছে দুইদিনের অষ্টাদশ ব্রিকস সম্মেলন।
২০০৬ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে ‘ব্রিক’ নামে জোটটির যাত্রা শুরু হয়। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেওয়ার পর এর নাম হয় ‘ব্রিকস’। পরে আরও কয়েকটি দেশ যুক্ত হয়ে বর্তমানে জোটটির সদস্য ১১টি—ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া।
অন্যদিকে, জি-৭ হলো যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও জাপান—এই সাত উন্নত অর্থনীতির জোট। ইউরোপীয় ইউনিয়নও জোটটির বৈঠকে অংশ নেয়। একসময় রাশিয়াও জি-৭-এর অংশ ছিল। ১৯৯৭ সালে রাশিয়া যুক্ত হওয়ার পর জোটটি জি-৮ নামে পরিচিত হয়। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া সংকটের পর রাশিয়ার অংশগ্রহণ স্থগিত হলে জোটটি আবার জি-৭-এ ফিরে যায়।
জি-৭কে ছাড়িয়ে ব্রিকস
২০০৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্রিকসের অংশ ছিল ২০ দশমিক ৪ শতাংশ, যা জি-৭-এর অর্ধেকেরও কম। কিন্তু উদীয়মান অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণ এবং নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার ফলে জোটটির অর্থনৈতিক পরিসর দ্রুত বেড়েছে।
আইএমএফের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’-এর এপ্রিল ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২০ সালেই বৈশ্বিক জিডিপির অংশের হিসাবে ব্রিকস জি-৭কে ছাড়িয়ে যায়। চলতি বছর বিশ্ব জিডিপির ৪১ শতাংশ ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর হতে পারে। বিপরীতে জি-৭-এর অংশ নেমে আসতে পারে ২৮ শতাংশে। তবে ব্রিকসের অর্থনৈতিক শক্তি মূলত চীন ও ভারতনির্ভর। জোটটির মোট জিডিপির প্রায় ৭০ শতাংশ আসে এই দুই দেশ থেকে।
ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন যারা
এবারের ব্রিকসের সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ও ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবিই আহমেদ অংশ নিচ্ছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিত্ব করছেন ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং সৌদি আরবের প্রতিনিধিত্ব করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান।
মোদি-শি বৈঠকে নজর
ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে সাত বছর পর ভারতে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর বৈঠক হতে পারে। সেখানে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য ঘাটতি এবং দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।
২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাদের সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপড়েন তৈরি হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
চীনে ভারতের রাষ্ট্রদূত বিক্রম দোরাইস্বামী এক নিবন্ধে লিখেছেন, বিশ্বের দুই বৃহৎ উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে ভারত ও চীনের মধ্যে স্থিতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক শুধু দুই দেশের মানুষের স্বার্থেই নয়, এশিয়া ও বৃহত্তর বিশ্বের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে বলেছে, দুই নেতা দুই দেশকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার’ এবং পরস্পরের উন্নয়নের জন্য ‘হুমকি নয়, সুযোগ’ হিসেবে দেখেন।
সম্পর্কে বরফ গলার ইঙ্গিত
ভারত-চীন সম্পর্কে বরফ গলার কিছু দৃশ্যমান লক্ষণ এরই মধ্যে দেখা গেছে। গত বছর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে। চীনা ব্যবসায়ীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়াও সহজ করেছে নয়াদিল্লি।
দীর্ঘ ছয় বছর বন্ধ থাকার পর চলতি বছর ভারত-চীন সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় শুরু হয়েছে। ঐতিহাসিক বাণিজ্যপথ সিকিমের নাথুলা পাস দিয়েও আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য চালু হয়েছে।
তবে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়লেও সম্পর্কটি দীর্ঘস্থায়ী স্বাভাবিকীকরণের দিকে কতটা এগোবে, তার বড় পরীক্ষা এখনো সীমান্ত পরিস্থিতি।
ব্রিকসের শক্তি, আবার সীমাবদ্ধতাও
বৈশ্বিক জিডিপিতে ব্রিকসের অংশ বাড়লেও জোটটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতিতে পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে চীন ও ভারতের সীমান্ত বিরোধ এবং বাণিজ্য বৈষম্য জোটের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের জন্য বড় পরীক্ষা।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থায়নে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোও ব্রিকসের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য এবং বিকল্প আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ ভবিষ্যতে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিষ্ঠার দুই দশক পর ব্রিকস এখন আর কেবল উদীয়মান অর্থনীতির একটি জোট নয়; বৈশ্বিক উৎপাদন, বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বলয়ে পরিণত হয়েছে। তবে এই অর্থনৈতিক শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবে রূপ দিতে হলে সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক বিরোধ ও স্বার্থের সংঘাত কতটা সামলে অভিন্ন কাঠামো গড়ে তোলা যায়, সেটিই হবে ব্রিকসের বড় পরীক্ষা।


























