জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহন ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে। বিদ্যমান চুক্তির দর পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়েছেন বার্থ অপারেটররা।
বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমান জ্বালানি মূল্যে বিদ্যমান চুক্তির দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। জ্বালানি ব্যয়ের সঙ্গে চুক্তির দর সমন্বয় করে নতুন রেট নির্ধারণে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বার্থ অপারেটরদের হিসাবে, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে বর্তমান চুক্তির জন্য দরপত্র আহ্বানের সময় ডিজেলের দাম ছিল লিটারপ্রতি ৮০ টাকা। সর্বশেষ ২০ টাকা বৃদ্ধির পর তা দাঁড়িয়েছে ১৩৫ টাকা। অর্থাৎ দরপত্র আহ্বানের সময়ের তুলনায় ডিজেলের দাম বেড়েছে ৫৫ টাকা বা প্রায় ৬৯ শতাংশ। এর মধ্যে ২০২২ সালের আগস্টে এক দফায় ৩৪ টাকা এবং পরবর্তী সময়ে আরও ১৫ টাকা দাম বাড়ানো হয়েছিল। অপারেটরদের দাবি, আগের দফাগুলোতেও চুক্তির দর সমন্বয়ের আবেদন করা হলেও তা কার্যকর হয়নি। ফলে এবার নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বিদ্যমান চুক্তির দরে বন্দর কার্যক্রম পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় প্রতিটি ধাপই জ্বালানি ও পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত। জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানো, ইয়ার্ডে নেওয়া, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরানো এবং নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন যান ও যন্ত্রপাতির বড় অংশ ডিজেলনির্ভর। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দর পরিচালনার ব্যয়ও বাড়ছে বলে দাবি অপারেটরদের। একইভাবে বেসরকারি আইসিডিগুলোতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সড়ক পরিবহন খাতেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। পরিবহন মালিকরা জানান, আগের দফায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর চট্টগ্রাম–ঢাকা রুটে একেক ট্রিপে ট্রাকের ভাড়া ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছিল। এবার নতুন করে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায় আবারও ভাড়া সমন্বয় করা হচ্ছে।
একজন শীর্ষস্থানীয় পরিবহন মালিক বলেন, আমদানি-রপ্তানির পণ্য পরিবহনের কাজ বর্তমানে প্রায় ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে গত কিছুদিন ধরে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কমে গাড়ি চালাতে হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর গতকাল থেকে ট্রিপপ্রতি ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। তবে এই ভাড়াও যথেষ্ট নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ভাড়া আরও বাড়তে পারে।
অপর একজন পরিবহন মালিক বলেন, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাতায়াতে একটি ট্রাকের জ্বালানি খরচই কমপক্ষে ৩ হাজার টাকা বেড়েছে। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘ দূরত্বের ট্রিপে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের পাশাপাশি সড়কের টোল, চালক-শ্রমিকের খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পণ্য পৌঁছে দেওয়ার পর খালি গাড়ি ফেরানোর ব্যয়ও ভাড়ার ওপর চাপ তৈরি করছে।
এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম নগরের গণপরিবহনেও। সরকারি সিদ্ধান্তে নতুন বাসভাড়া নির্ধারণের আগেই বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। যাত্রীদের অভিযোগ, ২ নম্বর গেট থেকে আগ্রাবাদ রুটে ১৫ টাকার পরিবর্তে কোনো কোনো বাসে ২০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। ২ নম্বর গেট থেকে অক্সিজেন পর্যন্ত ১০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। মুরাদপুর–আন্দরকিল্লা রুটেও ১৫ টাকার পরিবর্তে ১৮ থেকে ২০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নগরের বিভিন্ন রুটে একইভাবে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে যাত্রীরা জানিয়েছেন। সিএনজি গ্যাসচালিত বাস ও হিউম্যান হলারেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম গতকাল থেকে লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন দরে ডিজেল ১৩৫, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা। এর আগে ডিজেল ১১৫, কেরোসিন ১৩৫, পেট্রোল ১৪০ এবং অকটেন ১৪৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও শিপিং ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত মূল্য সমন্বয় না করায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে বলেও জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন খাতের বাইরে আমদানি-রপ্তানি ও পণ্যবাজারেও পড়তে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে আমদানি করা কাঁচামাল, শিল্পপণ্য, খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাতে পরিবহন ব্যয় বাড়বে। একইভাবে রপ্তানি পণ্য বন্দরে নেওয়ার খরচও বাড়বে। ফলে ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে। শেষ পর্যন্ত পরিবহন, বন্দর ও লজিস্টিক ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হলে বাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


























