মঙ্গলবার ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

২৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন 

যশোর-৬ (কেশবপুর) 

বিএনপি-জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা 

ওয়াজেদ খান ডবলু, কেশবপুর (যশোর) 

প্রকাশিত: ১৮:৪৬, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ১৮:৪৭, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বিএনপি-জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা 

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৬ (কেশবপুর) সংসদীয় এলাকায় প্রার্থীদের জয়-পরাজয় নিয়ে এখন তুমুল আলোচনা। উপজেলা শহরের পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ের হাটবাজারের চায়ের দোকানগুলোতে প্রার্থীদের জয়-পরাজয় নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে, এসব বিশ্লেষণ শুধু বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আবুল হোসেন আজাদ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অধ্যাপক মোক্তার আলীকে ঘিরে। যদিও ওই দুই প্রার্থী ছাড়াও এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী গাজী সহিদুল ইসলাম, এবি পার্টি মনোনীত ঈগল প্রতীকের প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহমুদুল হাসান ও জাতীয় পার্টি মনোনীত লাঙল প্রতীকের প্রার্থী জিএম হাসান আলী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রত্যেক নেতার পক্ষে কর্মীরা ভোট চাচ্ছেন দ্বারে-দ্বারে। এছাড়া প্রচার মাইক ও ব্যানার-লিফলেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সব প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা লক্ষ্য করা গেছে। 
এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীরা জনসংযোগ-পথসভায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। ভোটারদের দিচ্ছেন নানান প্রতিশ্রুতি। উভয় দলের পুরুষ কর্মীদের পাশাপাশি নারী কর্মীরাও নারী ভোটারদের ভোট চাইতে পাড়া মহল্লায় গিয়ে উঠান বৈঠক করছেন। বিশেষ করে বিএনপির দলীয় নেতৃত্ব এবং মনোনয়ন প্রতিযোগিতার কারণে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছিলো। তবে সময়ের ব্যবধানে তা ছাপিয়ে এখন ধানের শীষের বিজয়ী ছিনিয়ে আনতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে দেখা গেছে। এই আসনে বিএনপি অন্য দুই নেতা কেন্দ্রীয় সহ ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রওনকুল ইসলাম শ্রাবণকেও ধানের শীষের পক্ষে সভা-সমাবেশে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। এতে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীকে উজ্জীবিত হতে দেখা গেছে। তবে জামায়াত ইসলামী আরও কয়েক বছর আগে থেকেই অধ্যাপক মোক্তার  আলীকে  সম্ভাব্য প্রার্থী ধরে নিয়েই ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে। তাদের পুরুষ কর্মীদের পাশাপাশি নারী কর্মীদের প্রত্যেক এলাকার পাড়া-মহল্লায় সাংগঠনিক তৎপরতা দৃশ্যমান হচ্ছে। 
যদিও নারী ভোটারদের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ও ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আবুল হোসেন আজাদ পত্নী রেহেনা আজাদ বিগত এক বছর ধরে উপজেলার প্রতিটা ইউনিয়নের পাড়া-মহল্লায় বউ শাশুড়ি এবং উঠান বৈঠক করে মহিলা ভোটারদের মাঝে সাঁড়া ফেলেছেন। 
উপজেলার একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, স্বাধীনতার আগে ১৯৭৩ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সময়কালের অধিকাংশ নির্বাচন-বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে কেশবপুর আসনটি ছিলো আওয়ামী লীগের দখলে। এর মাঝে ১৯৭৯ সালে প্রয়াত গাজী এরশাদ আলী বিএনপির মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন, আর ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির আব্দুল কাদের ও ১৯৯১ সালে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বিগত দিনের পরিসংখ্যান বলছে, এই আসনে বিরাট একটি অংশ রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট। এছাড়া জামায়াতের ভোটব্যাংক ছিল বিএনপির সাথে, যার ফলে জয়-পরাজয় ঘটতো আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। 
আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারায় আওয়ামী লীগের ভোট ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের সমর্থনের উপর অনেকটা ঘুরে যেতে পারে এই আসনের প্রার্থীর জয়-পরাজয়। নির্বাচনের কয়েকমাস আগেই বিষয়টি আঁচ করতে পেরেই জামায়াতে ইসলামী তাদের দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা ভোট ব্যাংকের পাশাপাশি উভয়দল থেকে ভোটার টেনে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তবে এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই বিএনপি প্রার্থী আবুল হোসেন আজাদও। 
উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে মোট ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ২৯ হাজার ১৬৩। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ১৫ হাজার ২৪৪ এবং মহিলা ভোটার এক লাখ ১৩ হাজার ৯১৭ জন। এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন দুইজন। এর বিপরীতে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৮১টি এবং ভোটকক্ষ ৪২৫টি। এ আসনে ৮১ জন প্রিজাইডিং অফিসার, ৪২৫ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং ৮৫০ জন পোলিং অফিসারসহ মোট এক হাজার ৩৫৬ জন ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতা পরবর্তী বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের ৯ জন প্রার্থী কেশবপুর আসনে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ মনোনীত সুবোধ মিত্র, ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য্য, ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত আব্দুল হালিম (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী), ১৯৯৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত এ এস এইচকে সাদেক, ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আব্দুল ওহাব, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০২০ পর্যন্ত ইসমাত আরা সাদেক, ইসমাত আরা সাদেকের মৃত্যুতে উপ-নির্বাচনে নিজেদের পাতানো নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০২০ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত শাহীন চাকলাদার ও ২০২৪ সালের ‘আমি-ডামি মার্কা’ একতরফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আজিজুল ইসলাম আজিজ নির্বাচিত হন। এছাড়া ১৯৭৯ সালে বিএনপি মনোনীত গাজী এরশাদ আলী এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির আব্দুল কাদের, ১৯৯১ সালে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলে সৃষ্টি হয় ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। আওয়ামী লীগ নেতাদের পলায়ন ও দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ভোটে অংশগ্রহণ করতে না পারায় বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতিতে ফিরে আসে সু-বাতাস। 
স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম মোড়ল এ প্রতিবেদককে বলেন, এবারের নির্বাচনে আবুল হোসেন আজাদ এবং জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক মোক্তার আলীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এরমধ্যে যে প্রার্থী আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছে টানতে পারবেন তিনিই পরবেন জয়ের মালা। 
এ প্রসঙ্গে বিএনপি প্রার্থীর ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতা ‘দৈনিক রানার’- পত্রিকাকে বলেন, ‘বিএনপির সব নেতা-কর্মী অভ্যন্তরীণ ভেদাভেদ ভুলে এখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন, এটা বিএনপির ভোট ব্যাংককে বহুগুণে শক্তিশালী করেছে। এছাড়া ব্যক্তি ইমেজ ও সততার কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বপক্ষের সচেতন নাগরিক, আওয়ামী লীগের সাধারণ সমর্থক এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটাররা আবুল হোসেন আজাদের উপর আস্থা রাখছেন। এমনকি, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এলাকার সার্বিক উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং কৌশলগত রাজনৈতিক কারণে আবুল হোসেন আজাদকে নিরাপদ বলে নিঃসন্দেহে বেছে নিছেন। তাদের অনেকেই স্ব-প্রণোদিত হয়ে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছেন। ফলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ধানের শীষের প্রার্থীর বিজয় ইতোমধ্যে সুনিশ্চিত হয়েছে।
যদিও বিএনপি নেতাদের এসব প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত নেতাদের দাবি সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের মতে, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে নানাভাবে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী-সমর্থক ও হিন্দু সম্প্রদায় আক্রান্ত হয়েছেন।  এসব কারণে বিএনপির নেতা-কর্মীদের ভয়ে অনেকেই মতামত প্রকাশ করতে সাহস পাচ্ছেন না। এজন্য অধিকাংশরা বিএনপির সাথে থাকলেও কেন্দ্রে গিয়ে জামায়াত প্রার্থীকেই ভোট দেবেন। এছাড়া ব্যক্তিজীবনে কেশবপুর কলেজের অধ্যাপক হওয়ায় দলের বাইরেও ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের কারণেও ভোটারদের মাঝে জনপ্রিয়তা আছে, ফলে জয়ের ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামের নেতাকর্মীরা যথেষ্ট আশাবাদী।
কেশবপুর উপজেলা জামায়াতের আমির ও দলটি মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মোক্তার আলী বলেন, ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।’ 
কেশবপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও দল মনোনীত প্রার্থী আবুল হোসেন আজাদ বলেন, সুদীর্ঘকাল এই আসনে রাজনীতি করছি। সবসময় মানুষের পাশে আছি। আসন্ন ভোট উপলক্ষ্যে দলীয় নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ ভোটারদের উদ্দীপনা প্রতীয়মান হচ্ছে। আশা করি, ১২ তারিখে ধানের শীষের বিজয় সুনিশ্চিত হবে।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: