যশোর সদর উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের বীর নারায়নপুর গ্রামে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন স্মৃতিচিহ্ন স্থানীয়ভাবে পরিচিত “তেরো আউলিয়ার মাজার ও ঢিবি” নামে। যশোর জেলা সদর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে, লেবুতলা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং যশোর-মাগুরা সড়কের কোদালিয়া বাজার থেকে আড়াই কিলোমিটার পশ্চিমে এই প্রত্নস্থলের অবস্থান। গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে এটি কেবল একটি মাজার নয়; বরং লোকবিশ্বাস, কিংবদন্তি ও বিস্মৃত ইতিহাসের মিলনস্থল।
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, তেরোজন পীর ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে আগমন করেছিলেন। তাঁদের স্মরণেই এই স্থানটির নাম হয়েছে ‘তেরো আউলিয়ার মাজার’। তবে কথিত সেই তেরোজন আউলিয়া কে ছিলেন, তাঁদের পরিচয় বা আগমনের সময়কাল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায় না। অনেকের ধারণা, তাঁরা হয়তো হযরত খানজাহান (রহ.)-এর অনুসারী ছিলেন। যদিও এটি লোকবিশ্বাসের পরিসরেই সীমাবদ্ধ, তবু স্থানটি ঘিরে যে আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি হয়েছে, তা আজও টিকে আছে।
ঢিবিটি পার্শ্ববর্তী সমতল ভূমি থেকে প্রায় ১৫২.৪ সেন্টিমিটার উঁচু। উপরিভাগে ছড়িয়ে আছে ভাঙা পটারী, ইটের কণা ও চুন-সুরকির ভগ্নাংশ। মাঝারি আকৃতির একটি বটগাছের নিচে দেখা যায় পাতলা বর্গাকার টালি ইটের নির্মিত দেয়ালের ভগ্নাংশ। ইটের মাপ দেখে এটা প্রাচীন স্থাপত্যরীতির ইঙ্গিত বহন করে। আশপাশে ছড়িয়ে থাকা মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ থেকে ধারণা করা যায়, এখানে একসময় কোনো প্রাচীন জনবসতি ছিল।
বটতলার নিচে পাতলা টালি ইট দিয়ে নির্মিত কয়েকটি প্রাচীন কবরের চিহ্ন পাওয়া যায়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এগুলোই কথিত তেরোজন আউলিয়ার সমাধি। যদিও মূল মাজারটি ২০১০ সালের দিকে ভেঙে সিমেন্ট-বালু দিয়ে সংস্কার করা হয়েছে, তবুও প্রাচীন কাঠামোর কিছু আলামত এখনও চোখে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে এখানে শিরনি দান, মানত ও অন্যান্য লোকজ প্রথা প্রচলিত রয়েছে। এই ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান স্থানটিকে জীবন্ত রেখেছে।
বর্তমানে তেরো আউলিয়ার মাজার ও ঢিবি প্রায় বিলুপ্তপ্রায় প্রত্নস্থল হিসেবে চিহ্নিত। কালের বিবর্তনে ঢিবিটি অনেকাংশে সমতল হয়ে গেছে। তবে প্রত্নস্থলের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে যে প্রাচীন ইট, পটারীর ভগ্নাংশ ও স্থাপত্য কাঠামোর চিহ্ন পাওয়া যায়, তা ইঙ্গিত দেয়- মাটির নিচে লুকিয়ে আছে আরও বিস্মৃত কোনো স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ।
সংগত কারণেই ধারণা করা যায়, পরীক্ষামূলক প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা পরিচালিত হলে এখানে বিলুপ্ত স্থাপনার প্রকৃতি ও সময়কাল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তেরো আউলিয়ার মাজার ও ঢিবি একটি সম্ভাবনাময় প্রত্নসম্পদ, যা সঠিক অনুসন্ধান ও সংরক্ষণ পেলে যশোরের ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায় উন্মোচিত করতে পারে।
লোককথা, আধ্যাত্মিকতা ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্ভাবনার এই সম্মিলনই তেরো আউলিয়ার মাজার ও ঢিবিকে আলাদা গুরুত্ব দেয়। গ্রামীণ স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকা এই প্রত্নস্থল আজও যেন অপেক্ষা করছে তার মাটির নিচে লুকানো ইতিহাস একদিন নতুন করে আবিষ্কৃত হবে বলে।


























