যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার ফুলসরা ইউনিয়নের রায়নগর গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে সময়ের ভারে নুয়ে পড়া এক ঐতিহাসিক স্থাপনা- লতা চেয়ারম্যানের বাড়ি। গ্রামবাংলার এই বাড়িটি তৎকালীন সমাজ, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যরীতির এক জীবন্ত সাক্ষ্য। চৌগাছা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পূর্বে এবং ফুলসরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এই বাড়িটির অবস্থান। সলুয়া–রায়নগর সড়কের উত্তর দিকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে এবং রায়নগর বাজার থেকে ৫০০ মিটার উত্তরে অবস্থিত হওয়ায়, যোগাযোগের দিক থেকেও এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে গড়ে উঠেছিল।
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, তৎকালীন জমিদারদের রাজস্ব আদায়কারী তসিম বিশ্বাস ও বশির বিশ্বাস নামের দুই ভাই ১৮৮৫ সালে এই বাড়িটি নির্মাণ করেন। বাড়ির মূল ফটকে উৎকীর্ণ একটি শিলালিপিতে নির্মাণকাল হিসেবে ১৩১৪ বঙ্গাব্দ উল্লেখ রয়েছে, যা এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও সুস্পষ্ট করে।
ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত বাড়িটি এল-আকৃতির ভূমি পরিকল্পনায় গড়া একটি একতলা আবাসিক ভবন। সমতল ভূমি থেকে প্রায় এক মিটার উঁচু প্লাটফর্মের ওপর নির্মিত এই স্থাপনার দুই পাশে দুটি উইং রয়েছে, যার মাধ্যমে ভবনের বিভিন্ন অংশে চলাচল করা যায়। দরজা ও জানালাগুলো বহু ভাজ খিলান নকশায় নির্মিত, যা তৎকালীন ইউরোপীয় প্রভাবিত স্থাপত্য ধারার পরিচায়ক।
ভবনের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য দুই পাশে দুটি করে মোট চারটি ইট নির্মিত আয়তাকার স্তম্ভ ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু দরজায় অশ্ব ক্ষুর আকৃতির খিলান নকশা ভবনটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র নান্দনিকতা। সমতল ছাদ নির্মাণে লোহার বিম ও কাঠের কড়িবর্গা ব্যবহার করা হয়েছে, আর নির্মাণ উপকরণ হিসেবে চুন, সুরকি ও বালির প্রয়োগ সেই সময়ের নির্মাণ প্রযুক্তির পরিচয় বহন করে।
বাড়িটির চারপাশে উন্মুক্ত মেঝে ও প্লাটফর্ম রয়েছে, যা চলাচল ও বসার জন্য ব্যবহৃত হতো। ভবনের কিছু অংশ পরবর্তীকালে দোতলা করা হয়েছে এবং প্লাটফর্মের বিভিন্ন অংশ ভল্টেড টানেলের মাধ্যমে সংযুক্ত। দুটি ভবনে চারটি করে মোট আটটি কক্ষ রয়েছে, যা একসময় বসবাস ও প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। চারপাশে বেষ্টনী প্রাচীর থাকায় বাড়িটি ছিল নিরাপদ ও সুরক্ষিত।
সময়ের প্রয়োজনে ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাড়িটিতে কিছু পরিবর্তন এসেছে। পূর্বদিকে পলেস্তারা ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছে, ভবনের সামনে বর্ধিত অংশে ছাদ ও টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। উত্তর দিকেও আধুনিক নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করে ছাদ ও দেয়াল যুক্ত হয়েছে। তবে পুরোনো ছাদে ফাটল ও ভেজিটেশন ইন্টারগ্রোথ স্পষ্টভাবে দেখা যায়, যা স্থাপনাটির বর্তমান ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। বর্তমানে বাড়িটি ও আশপাশের জমির পরিমাণ প্রায় ৩২ শতাংশ, যা রায়নগর মৌজায় অবস্থিত। এই জমির বর্তমান মালিক মামুন ও মারুফ গং।
লতা চেয়ারম্যানের বাড়ি একসময় এই অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বলে স্থানীয়রা জানান। আজও এই বাড়ি রায়নগরের ইতিহাস, জমিদারি শাসনব্যবস্থা এবং ঔপনিবেশিক প্রভাবিত স্থাপত্যরীতির এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে রক্ষা করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এটি হয়ে উঠতে পারে এক মূল্যবান ঐতিহ্য ভাণ্ডার।


























