যশোরের চৌগাছা উপজেলার সুকপুকুরিয়া ইউনিয়নের পুড়াপাড়া মৌজার অন্তর্গত চুটারহুদা গ্রামে আজও দাঁড়িয়ে আছে একটি ধ্বংসোন্মুখ পঞ্চরত্ন মন্দির। সময়ের ক্ষয়, অবহেলা আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মন্দিরটি ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে, অথচ এর স্থাপত্যিক ও আলংকারিক সৌন্দর্য এখনো পথচারী ও ইতিহাস প্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
গ্রামের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে একটি বৃহদাকার পুকুরের পাশে এবং পুড়াপাড়া–মাকাপুর পাকা সড়কের দক্ষিণ দিকে মন্দিরটির অবস্থান। চৌগাছা সদর থেকে আনুমানিক নয় কিলোমিটার পশ্চিমে, বিখ্যাত কাঠগড়া নীলকুঠি ও পুড়াপাড়া বাজারের প্রায় এক কিলোমিটার দক্ষিণে চুটারহুদা গ্রামের এই মন্দির। অবস্থানগত কারণে এটি চুটারহুদার মন্দির নামে পরিচিত হলেও স্থানীয়দের কাছে এর আরেকটি নাম পাঁচু ঘোষের মন্দির।
গ্রামের ধনী জোতদার পাঁচু ঘোষ এই মন্দিরটি নির্মাণ করে এখানে রাধা–বল্লভের যুগল মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সে কারণে গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এটি ‘রাধা–বল্লভ মন্দির’ নামেও পরিচিত। কালের প্রবাহে দেবমূর্তি হারিয়ে গেলেও মন্দিরটি এখনো গ্রাম ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী।
স্থাপত্যের দিক থেকে মন্দিরটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি বর্গাকার ভূমি নকশায় নির্মিত, যার প্রতি বাহুর দৈর্ঘ্য ২০ ফুট। পাকা ইট, চুন-শুরকি ও পলেস্তারা দিয়ে তৈরি মন্দিরটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত- গর্ভগৃহ ও বারান্দা। পূর্ব-পশ্চিমে দীর্ঘ গর্ভগৃহের অভ্যন্তরীণ পরিমাপ ১৩ বাই ৮ ফুট এবং বাহ্যিক পরিমাপ ২০ বাই ১১ ফুট ৪ ইঞ্চি। গর্ভগৃহের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত সরু বারান্দার আয়তন ২০ ফুট বাই ৩ ফুট ৫ ইঞ্চি।
গর্ভগৃহে প্রবেশের জন্য দক্ষিণ দেয়ালের মধ্যভাগে একটি অর্ধবৃত্তাকার খিলান দরজা রয়েছে। এই ক্ষুদ্রাকার দরজার উচ্চতা পাঁচ ফুট এবং প্রস্থ দুই ফুট ১০ ইঞ্চি। পূর্ব দিকে আরেকটি দরজা ছিল বলে জানা যায়, যা বহু আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মন্দিরের অভ্যন্তরভাগ অত্যন্ত সাদামাটা- একটি কুঠরির মতো।
বারান্দাটি স্থাপত্যিক দিক থেকে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পাঁচটি ত্রি-খাঁজযুক্ত খিলানপথ দ্বারা এটি উন্মুক্ত- তিনটি দক্ষিণ দিকে এবং পূর্ব ও পশ্চিম বাহুতে একটি করে। এই ত্রি-খাঁজ খিলান বাংলাদেশের মুসলিম স্থাপত্যে বহুল ব্যবহৃত একটি বৈশিষ্ট্য, যা আঠারো-উনিশ শতকে হিন্দু মন্দির স্থাপত্যে অনুকৃত হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। খিলানগুলো আবার বৃহদাকার কৌণিক খিলানাকৃতির ফ্রেমে আবদ্ধ, যা মন্দিরের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মন্দিরের কোণগুলোতে যুগল পাড় দ্বারা বিভক্ত সরু কৌণিক দণ্ড সংযুক্ত, যা বাংলার চালাঘরের কোণের বাঁশের খুঁটির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই বৈশিষ্ট্যই মন্দিরটিকে বাংলার চারচালা কুঁড়েঘর রীতির এক অনন্য প্রতিফলন হিসেবে চিহ্নিত করে।
সমগ্র মন্দিরটি একই ছাদের নিচে আবৃত। ভেতরের দিকে ছাদটি নৌকার ছইয়ের মতো, আর উপরের দিকে ক্রমাবনত সমতল ছাদ। চারদিকে কার্নিশ ধনুকের মতো বাঁকানো। ঐতিহাসিকদের মতে, এই ক্রমাবনত ছাদ, বাঁকানো কার্নিশ ও কৌণিক দণ্ড বাংলার চারচালা রীতির স্পষ্ট ছাপ বহন করে। মন্দির স্থাপত্যে চারচালা রীতির অনুপ্রবেশ ঘটেছিল মুঘল যুগে, কারণ প্রাক-মুসলিম হিন্দু স্থাপত্যে এর নজির পাওয়া যায় না।
এই চারচালা মন্দিরের উপর নির্মিত পাঁচটি রত্নের কারণেই এটি পঞ্চরত্ন মন্দির হিসেবে পরিচিত। চারটি রত্ন ইমারতের চার কোণে এবং একটি কেন্দ্রস্থলে স্থাপিত। কেন্দ্রীয় রত্নটি আকারে বড় এবং এর খিলান ত্রি-খাঁজযুক্ত, অন্য চারটি অপেক্ষাকৃত ছোট এবং অর্ধবৃত্তাকার খিলানে নির্মিত। রত্নগুলোর উর্ধ্বাংশ পিরামিড আকৃতির, যার শীর্ষে প্রস্ফুটিত পদ্মফুল ও কলস-দণ্ডের অলংকরণ ছিল। পিতলের তৈরি এই কলস-দণ্ডগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একে একে চুরি হয়ে গেছে, যা মন্দিরটির বর্তমান দুরবস্থার করুণ চিত্র তুলে ধরে।
গুপ্তযুগে বাংলায় রত্ন মন্দির নির্মাণের সূচনা হলেও পনেরো শতকের পর এই রীতির সরলীকরণ ও আঞ্চলিক বিকাশ ঘটে। চুটারহুদার পঞ্চরত্ন মন্দিরটি উনিশ শতকে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। বৃহত্তর যশোর অঞ্চলে চারচালা পঞ্চরত্ন মন্দিরের উদাহরণ খুবই সীমিত। ঝিনাইদহ জেলার নলডাঙ্গা ও মাগুরার কানাইনগরের পঞ্চরত্ন মন্দিরকে এর পূর্বসূরি হিসেবে ধরা হয়।
আজ চুটারহুদার এই পঞ্চরত্ন মন্দিরটি বাংলার লোকজ স্থাপত্য ও ইতিহাসের এক অমূল্য নিদর্শন। যথাযথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে যদি এটি হারিয়ে যায়, তবে হারাবে যশোর অঞ্চলের স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইতিহাসের এই সাক্ষীকে বাঁচিয়ে রাখাই এখন সময়ের দাবি।


























