ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে যশোরের কেশবপুর উপজেলার মধ্যকূল গ্রাম ছিল বাংলার তাঁতশিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। যশোর থেকে কেশবপুরগামী সড়কের ঠিক পাশেই, প্রধান রাস্তার পূর্বদিকে প্রতি শুক্রবার বসত একটি বিশেষ হাট- শুধু কাপড়ের হাট। অন্য কোনো পণ্যের জায়গা সেখানে ছিল না। সেদিনের পুরো হাট জুড়ে শুধু তাঁতের কাপড়, রঙিন বয়ন আর ব্যবসার ব্যস্ততা।
তৎকালীন সময়ে একেকটি হাটবারে শুধু কাপড় বিক্রিই হতো প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকার। আজকের মূল্যে যা কল্পনারও বাইরে। সেই হিসাবই বলে দেয়, কতটা সমৃদ্ধ ছিল মধ্যকূলের এই কাপড়ের হাট।
নরুনিয়া, পাতড়া, রস্তমপুর, বরাতিয়া, নূরপুর, বায়সা, সাতবাড়িয়া, জাহানপুর, দুর্বাডাঙ্গা, বাঙালিপুর, কোমরপুর, বেগমপুর, কড়িয়াখালি, ঝাঁপা, মস্মিমনগর, চিংড়া, ধানদিয়া- এমন বহু গ্রামের তাঁতিরা তাঁদের বোনা কাপড় কাঁধে কিংবা গরুর গাড়িতে করে এনে হাজির হতেন এই হাটে। এমনকি খ্রিষ্টান কারিগররাও এই হাটের নিয়মিত অংশ ছিলেন। ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন ভিন্ন গ্রাম- কিন্তু সবার পরিচয় ছিল একটাই, তাঁতশিল্পের মানুষ।
মধ্যকূলের হাটে কাপড় বিক্রি হতো মূলত পাইকারিতে। খুচরা বিক্রি ছিল খুবই সীমিত। দূরদূরান্ত থেকে বড় বড় পাইকারি ব্যাপারীরা আসতেন এই হাটে। তাঁরা এখানকার কাপড় কিনে নিয়ে যেতেন কলকাতার ওপারে হাওড়ার হাট কিংবা চেতলার হাটে। প্রতি মঙ্গলবার সেই কাপড় বিক্রি হতো কলকাতার বাজারে, আর সেখান থেকেই সুতা কিনে সময়মতো আবার মধ্যকূলে ফিরে আসতেন তাঁরা।
এই লেনদেনের পদ্ধতিও ছিল অভিনব। কাপড়ের দাম পুরোপুরি নগদে নয়- কিছু টাকা, কিছু সুতা দিয়ে পরিশোধ করা হতো। ফলে তাঁতিরা একদিকে নগদ অর্থ পেতেন, অন্যদিকে পরবর্তী বুননের কাঁচামালও নিশ্চিত হতো। অনেক তাঁতি আবার স্থানীয় প্রভাবশালী ও অবস্থাশালী লোকদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে তাঁত চালাতেন। দাদনের সুতা আর টাকার ওপর ভর করেই ঘুরত তাঁদের সংসার ও তাঁতঘর।
এই হাটকে ঘিরে তখন কিছু নাম হয়ে উঠেছিল কিংবদন্তি। জয়নাল কারিগর, ওমেদ আলী কারিগর, বেণীদাস, রসিকলাল দালাল- এই নামগুলো শুধু ব্যক্তি নয়, ছিল একেকটি চলমান প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে জয়নাল কারিগর একাই প্রতি হাটে পনেরো-ষোলো হাজার টাকার কাপড় কিনে হাওড়া নিয়ে যেতেন। তাঁর নাম শুনলেই মধ্যকূলের হাটে ব্যবসায়ীরা নতুন করে সাহস পেতেন।
মধ্যকূলের এই কাপড়ের হাট শুধু কেনাবেচার জায়গা ছিল না। এটি ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি, তাঁতশিল্পের প্রাণকেন্দ্র এবং বাংলার বস্ত্র ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। এখানে গড়ে উঠেছিল পারস্পরিক বিশ্বাস, নির্ভরতা আর দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক।
কালের প্রবাহে সেই হাট আজ হারিয়ে গেছে। নেই শুক্রবারের সেই ব্যস্ততা, নেই তাঁতের কাপড়ের গন্ধ, নেই পাইকারদের হাঁকডাক। শুধু ইতিহাসের পাতায় আর মানুষের স্মৃতিতে রয়ে গেছে মধ্যকূলের কাপড়ের হাট- যে হাট একদিন যশোরের মাটিকে বাংলার বস্ত্র বাণিজ্যের মানচিত্রে উজ্জ্বল করে তুলেছিল।


























