যশোর জেলা সদর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পূর্বে, অভয়নগর উপজেলা থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার উত্তরে, শুভরাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চার কিলোমিটার দক্ষিণে এবং ফুলতলা-নড়াইল সড়কের পশ্চিমে মাত্র পাঁচশ’ মিটার এগোলেই চোখে পড়ে এক ঐতিহাসিক নিদর্শন, খানজাহান (রহ.) এর সময়ের একটি প্রাচীন মাজার। চারপাশের সাধারণ গ্রামীণ পরিবেশের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাটি যেন অতীতের সঙ্গে বর্তমানের এক সংযোগসূত্র।
ঐতিহাসিক সূত্র মতে, খ্রিষ্টীয় পনেরো শতকে হযরত খান-উল-আজম উলুঘ খান-ই-জাহান বাংলায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ শহর প্রতিষ্ঠা করেন, যা আইন-ই-আকবরীতে বাংলার ১৯টি সরকারের অংশ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে সরকার মাহমুদাবাদ ও সরকার খলিফাতাবাদের উল্লেখ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সরকার মাহমুদাবাদ গঠিত ছিল উত্তর নদীয়া, উত্তর যশোর ও পশ্চিম ফরিদপুর নিয়ে। অন্যদিকে সরকার খলিফাতাবাদে অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা এবং পশ্চিমে বাকেরগঞ্জ অঞ্চল।
খলিফাতাবাদে নির্মিত ষাটগম্বুজ মসজিদ ছিল খানজাহান (রহ.)-এর দরবার হল। জনশ্রুতি অনুযায়ী, তিনি প্রায় ৩৬০ জন আউলিয়া বা ধর্মপ্রাণ মুরিদসহ এ অঞ্চলে আগমন করেন। সংখ্যাটি নিয়ে মতভেদ থাকলেও, তাঁর শিষ্য ও সহচরের সংখ্যা যে শতাধিক ছিল, তা ইতিহাসবিদদের কাছে সন্দেহাতীত। কথিত আছে, প্রত্যেক সঙ্গীর জন্য তিনি একটি করে মসজিদ ও একটি করে দিঘি খননের ব্যবস্থা করেছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে শুভরাড়া ইউনিয়নের বাবুরহাট বাজার সংলগ্ন মাজারটিকে ঘিরে একটি যুক্তিসংগত ধারণা গড়ে ওঠে, এটি হয়ত খানজাহান (রহ.)-এর কোনো প্রিয় শিষ্য বা সহচরের সমাধিস্থল। সরাসরি কোনো লিখিত শিলালিপি না থাকলেও, স্থাপত্যরীতি ও নির্মাণ উপকরণ স্পষ্টভাবে খানজাহান যুগের দিকেই ইঙ্গিত করে।
মাজারটি নির্মিত হয়েছে সাদামাটা কিন্তু দৃঢ় স্থাপত্যশৈলীতে। পার্শ্ববর্তী সমতল ভূমি থেকে শূন্য দশমিক ৪০ মিটার উঁচু একটি প্ল্যাটফর্মের ওপর এর অবস্থান। চুন-সুরকির সংমিশ্রণে তৈরি ইট দিয়ে নির্মিত এই মাজারের বেসের দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৮০ মিটার এবং প্রস্থ ৪ দশমিক ৮০ মিটার। পশ্চিম দিকে এর উচ্চতা ২ দশমিক ৮০ মিটার। ধাপে ধাপে উপরের দিকে উঠে যাওয়া নির্মাণ রীতিতে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্তর যথাক্রমে ছোট হয়ে এসেছে, যা তৎকালীন সমাধি স্থাপত্যের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য।
মূল মাজার অংশের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৬ মিটার এবং প্রস্থ ১ দশমিক ৯০ মিটার। ব্যবহৃত ইটের পরিমাপেও বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়, ২২ বাই ১১ বাই ৫, ২০ বাই ১২ বাই ৫, ২১ বাই ১০ বাই ৫ এবং ২৯ বাই ২৩ বাই ৫ সেন্টিমিটার আকারের ইটগুলো খানজাহান আমলের নির্মাণ রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বর্তমানে মাজারটির দক্ষিণ পাশে লোহার চিকন পিলারের ওপর টিনের ছাউনি দেওয়া হয়েছে, যা আধুনিক সংযোজন হলেও মূল স্থাপনার ঐতিহাসিক সৌন্দর্য এখনো অক্ষুণ্ন রয়েছে। শুভরাড়া মৌজায় অবস্থিত এই মাজারটি আজও ইতিহাসপ্রেমী ও গবেষকদের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
যত্নের অভাব, সংরক্ষণের ঘাটতি আর পর্যাপ্ত প্রচারের অভাবে এই মাজারটি আজ অনেকটাই লোকচক্ষুর আড়ালে। অথচ এটি খানজাহান (রহ.) যুগের ধর্মীয়, সামাজিক ও স্থাপত্যিক ঐতিহ্যের সাক্ষী। সঠিক গবেষণা ও সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে, শুভরাড়ার এই মাজার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হয়ে উঠতে পারে যশোর অঞ্চলের ইতিহাস জানার এক মূল্যবান দরজা।


























