গ্রামের নাম যাত্রাপুর। চৈত্রের রুক্ষ সময়েও এখানে প্রকৃতি যেন দু’হাতে উজাড় করে দিয়েছে তার অবারিত দান। চোখ মেললেই শ্যামল- সবুজের বিস্তার, মাথার ওপরে নীল আকাশ, নৈশব্দের কাছে সমর্পিত এক ক্লান্ত দুপুর- আর তার ভেতরেই গাছে গাছে পাখির কলকাকলি, জনজীবনের নীরব কল্লোল। এসব দৃশ্যের আলাদা করে উদাহরণ টানার দরকার পড়ে না। বাংলাদেশের গ্রাম নিজেই তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। আর আমাদের যশোরের গ্রামগুলো যেন প্রত্যেকটি আলাদা স্বভাবে, আলাদা সৌন্দর্যে ভরপুর। কবি কোনো এক গ্রামের প্রেমে পড়েই হয়তো আত্মগর্বে লিখেছিলেন-
‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,
সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।’
চৌগাছা উপজেলার যাত্রাপুর গ্রামে গিয়েছিলাম ২০২১ সালের মার্চ মাসের শেষ দিকে। হাকিমপুর বাজার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পূর্বে, বারবাজার- হাকিমপুর সড়কের দক্ষিণে ও মরজাত বাওড়ের উত্তরে অবস্থিত এই গ্রামটি প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ করে। গ্রামে ঢোকার আগের সরু পিচঢালা রাস্তার দু’পাশে পানসে মান্দার (পারিজাত), জিউলীসহ নানা অচেনা-চেনা গাছের সারি। কেউ কোনো দিন যত্ন নেয়নি, তবু তারা নিজের নিয়মেই বেড়ে উঠেছে- নির্ভার, নির্লিপ্ত সৌন্দর্যে। গাছপালার এই স্বাভাবিক সমারোহের দিকে তাকিয়ে চোখ ফেরানো দায়।
এই যাত্রাপুরই চৌগাছার বিখ্যাত জমিদার বিশ্বেশ্বর সরকারের জন্মভূমি- যিনি এলাকায় বি. সরকার নামেই বেশি পরিচিত। গ্রামে ঢুকতেই তার জমিদার বাড়ির অবস্থান জানান দেয় অতীতের ঐশ্বর্য আর কর্তৃত্বের ইতিহাস। বাড়ির একটি অংশে দাঁড়িয়ে ছিল একরত্ন মন্দির। বাড়ির দক্ষিণ পাশে একটি ছোট বাঁওড়— আকারে ছোট হলেও দৃশ্যে অপূর্ব। তখনও বাওড়পাড়ে শিমুল গাছ আগুন রাঙা ফুলে ভরে আছে, যেন প্রকৃতি নিজেই জ্বলছে। নানা পাখির দখলে থাকা জলাশয়ের জলে আকাশ আর গাছের ছায়া মিলেমিশে এক শান্ত দৃশ্যপট তৈরি করেছে। বাওড়ের উত্তরে কয়েকটি কাঁঠাল গাছ, গাছে আগেভাগেই এসেছে ‘এঁচড়’- সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি না করে থাকা যায় না।
বি. সরকারের বাড়িতে বর্তমানে বিনিময় সূত্রে আসা ভারত থেকে আগত কয়েকটি পরিবার বসবাস করছে। বাড়ির পাশেই রয়েছে সরকারের বাড়ির মন্দির- যাত্রাপুরের একরত্ন মন্দির। একসময় ছিল অরক্ষিত, অবহেলিত। মন্দিরের আগের আদল আজ আর পুরোপুরি নেই। সম্প্রতি জেলা পরিষদ এর কিছু অংশ সংরক্ষণ করেছে, যদিও তাতে স্থাপত্যের মৌলিক সৌন্দর্য পুরোপুরি ফিরে আসেনি। তবু চৌগাছা উপজেলায় মন্দির স্থাপত্যের যে ক’টি নিদর্শন আজও টিকে আছে, যাত্রাপুর গ্রামের সরকার বাড়ির এই মন্দির তাদের অন্যতম।
প্রায় চার দশক আগেও মন্দিরটি ছিল ভগ্নদশাগ্রস্ত ও পরিত্যক্ত। তবু পোড়ান ইট আর চুন- সুড়কির গাঁথুনিতে নির্মিত হয়েছিল এই স্থাপনাটি। সে সময় মন্দিরটি ছিল প্রাকার ঘেরা, ব্যবহৃত ইটগুলো আকারে মোটা ও শক্ত। বাড়ি সংলগ্ন পুকুরের পূর্ব পাড়ে অবস্থিত আলোচ্য মন্দিরটির সঠিক নির্মাণকাল জানা না গেলেও, শান বাঁধানো পুকুরঘাটে উৎকীর্ণ লিপি কিছু ইঙ্গিত দেয়। সেখানে বাংলা ১৩৩৮ সাল (১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দ) এবং ‘বি. সরকার এ্যান্ড সন্স’ নামটি খোদাই করা রয়েছে। অট্টালিকার উপরতলার ইটের সঙ্গে মন্দিরের ইটের সাদৃশ্য এবং নিচতলার ইটের সঙ্গে বৈসাদৃশ্য দেখে ধারণা করা হয়, ওই সময়েই বিশ্বেশ্বর সরকারের পুত্রদের উদ্যোগে মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল।
মন্দিরটি ইতিহাস আর মানুষের জীবনের এক অনুপম মেলবন্ধন। এখানে সবুজের ভেতর লুকিয়ে আছে জমিদারি অতীতের স্মৃতি, আছে অবহেলায় ক্ষয়ে যাওয়া স্থাপত্য, আবার আছে বর্তমানের নীরব গ্রামীণ জীবন। সময় বদলায়, মানুষের হাত বদলায়, তবু যাত্রাপুরের মতো গ্রামগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়- বাংলাদেশের গ্রামই আসলে এই ভূখণ্ডের সবচেয়ে বড় ঐতিহ্য।


























