ইতিহাস কখনো বড় কোনো শিলালিপিতে লেখা থাকে না, কখনো থাকে এক পরিত্যক্ত বাড়ির দেয়ালে। যশোরের অভয়নগরের সিদ্ধিপাশা ইউনিয়নের উত্তর সিদ্ধিপাশা গ্রামে দাঁড়িয়ে থাকা সিরাজুল ইসলামের বাড়ি- স্থানীয়ভাবে পরিচিত বিষ্ণুকরের বাড়ি- তেমনই এক নীরব সাক্ষ্য।
এই বাড়িটির নির্মাণ সাল অজানা। তবে স্থানীয় ভূমিমালিকদের স্মৃতিতে ভেসে আছে, জনৈক সুতা ব্যবসায়ী কালিকর এক সময় এটি নিজের বসবাসের জন্য নির্মাণ করেছিলেন। সময়ের দীর্ঘ যাত্রায় মালিক বদলেছে, ইতিহাসের পৃষ্ঠা উল্টেছে। সর্বশেষ করোনাকালীন মহামারির সময়ে ভবনটি ক্রয় করেন সিরাজুল ইসলাম। কিন্তু ভবনের ভাগ্য বদলায়নি- এখনো এটি পরিত্যক্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
ঔপনিবেশিক স্থাপত্য শৈলির ছাপ স্পষ্ট এই আবাসিক ভবনটি সমতল ভূমি থেকে প্রায় চার ফুট উঁচু আয়তাকার প্লাটফর্মের ওপর নির্মিত। দক্ষিণমুখী সম্মুখভাগে টানা বারান্দা, যেখানে ছয়টি বহু ভাজবিশিষ্ট জোড়া কলাম দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দ প্রহরীর মতো। দুটি আলাদা ভবনের সমন্বয়ে পুরো স্থাপনাটি গড়ে উঠেছে। সামনের ভবনটি একতলা হলেও পেছনের ভবনটি দোতলা। সামনের অংশ দিয়েই পেছনের ভবনের দোতলায় ওঠার ব্যবস্থা রয়েছে।
ঘরসংখ্যা মোট চারটি- সামনের ভবনে দুটি, পেছনের ভবনে দুটি। এক সময় এই কক্ষগুলোতে নিশ্চয়ই ছিল মানুষের কোলাহল, পারিবারিক গল্প, জীবনের ছোট ছোট আনন্দ-বেদনার আবাস। আজ সেখানে শুধু বাতাসের শব্দ, ভাঙা দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস।
স্থাপত্য উপকরণেও ফুটে ওঠে এক সময়ের নির্মাণ কুশলতা। ছাদে লোহার বিম, কাঠের বর্গার ওপর টালি ইট ও চুন-সুরকির মশলার ব্যবহার, দেয়ালে চুন-বালির প্লাস্টার- সব মিলিয়ে ভবনটি তার সময়ের নির্মাণ রীতির পরিচয় বহন করে। ব্যবহৃত ইটের পরিমাপ ৩১দ্ধ১২দ্ধ৮ সেন্টিমিটার ও ২৫দ্ধ১২দ্ধ৮ সেন্টিমিটার, যা স্থানীয় ঐতিহাসিক ভবনগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভৌগোলিক অবস্থানও এই বাড়িটিকে আলাদা করে চিহ্নিত করে। যশোর জেলা সদর থেকে প্রায় ৪৪ কিলোমিটার দক্ষিণে, অভয়নগর উপজেলা থেকে ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং সিদ্ধিপাশা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তিন কিলোমিটার দক্ষিণে, উত্তর সিদ্ধিপাশা গ্রামের পাকা রাস্তা থেকে প্রায় দুইশ মিটার দক্ষিণে এগোলেই চোখে পড়ে এই ভবনটি।
বিআরএস খতিয়ানে ভূমি মালিক হিসেবে সিরাজুল ইসলামের নাম রেকর্ডভুক্ত। মৌজা সিদ্ধিপাশা, জে.এল নং ৮৮, জমির পরিমাণ ১.৪৪ একর। কাগজে-কলমে মালিকানা সুস্পষ্ট হলেও বাস্তবে এই ঐতিহ্যবাহী ভবনটি আজ অবহেলার ভারে নুয়ে পড়েছে।
বিষ্ণু করের বাড়ি আমাদের অঞ্চলের সামাজিক ও স্থাপত্য ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। প্রতিটি ফাটল, প্রতিটি ক্ষয়ে যাওয়া দেয়াল যেন বলছে সময়ের গল্প। অথচ আমরা সেই গল্প শুনছি না, সংরক্ষণের উদ্যোগও নিচ্ছি না।
যদি এই ভবনটি হারিয়ে যায়, হারিয়ে যাবে একটি সময়, একটি জীবনধারা, একটি ইতিহাস। বিষ্ণু করের বাড়ি আমাদের স্মৃতির ঠিকানা, যা এখনো দাঁড়িয়ে আছে, আমাদের দৃষ্টি ও দায়বদ্ধতার অপেক্ষায়।


























