বুধবার ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

২১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অভয়নগরের ধূলগ্রামের রঘুনাথ মন্দির

পোড়ামাটির ভাষায় লেখা এক ইতিহাস

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৬:১৯, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬

পোড়ামাটির ভাষায় লেখা এক ইতিহাস

ভৈরব নদের পশ্চিম তীর ঘেঁষে, অভয়নগর নওয়াপাড়া-সোনাতলা সড়কের পাশে ধূলগ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে এক সৌন্দর্য- রঘুনাথ মন্দির কমপ্লেক্স। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, সময় এখানে থমকে আছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইট, চুন আর পোড়ামাটির অলংকরণে লেখা এক ইতিহাস আজও বাতাসে ভাসে, শুধু পাঠ করার মতো পাঠক কমে গেছে।

ইংরেজি ইউ আকৃতির আয়তাকার ভূমি পরিকল্পনায় নির্মিত এই কমপ্লেক্সে একসময় পর্যায়ক্রমে গড়ে উঠেছিল ১২টি মন্দির। একটি আয়তাকার উন্মুক্ত ক্ষেত্রকে ঘিরে তাদের অবস্থান- যেন আকাশের নিচে সাজানো এক ধর্মীয় শিল্প ভুবন। উত্তর-দক্ষিণে ২৭.৪৩ মিটার আর পূর্ব-পশ্চিমে ৩৬.৫৭ মিটার বিস্তৃত এই পরিসর জুড়ে স্থাপত্যের নীরব সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে।

মূল রঘুনাথ মন্দিরটি ইন্দো-মুসলিম স্থাপত্যশৈলীতে বর্গাকার পরিকল্পনায় নির্মিত। ভূমি থেকে প্রায় এক মিটার উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকা পশ্চিমমুখী এই মন্দিরটি আটচালা রীতির- বাংলা কুঁড়েঘরের আদলে গড়া। চারচালার উপর আরেকটি চারচালার শিখরা বসিয়ে নির্মিত হয়েছে শীর্ষাংশ, যা পুরো কাঠামোকে দিয়েছে এক অনন্য নান্দনিক ভারসাম্য। বক্র ছাদের প্রান্ত কার্নিশে আলো-ছায়ার খেলা এখনও দর্শকের চোখে পড়ে।

চুন-সুরকির মিশ্রণে গাঁথা ইটের স্তম্ভ অতিক্রম করে ভোল্টেড সিলিংযুক্ত বারান্দায় প্রবেশ করলে মনে হয়, কেউ যেন অতীতের দ্বার খুলে দিল। তিনটি বহু ভাজ খিলান পেরিয়ে মূল মন্দিরে পৌঁছাতে হয়, যেখানে অর্ধ গোলাকার বহু ভাজ খিলান এক নিখুঁত শৈল্পিক ছন্দ তৈরি করেছে। স্তম্ভগুলোর গায়ে পোড়ামাটির ফলকচিত্র, ফুল-লতাপাতা আর সূক্ষ্ম নকশা- সব মিলিয়ে যেন এক চলমান শিল্পকথা।

এই মন্দিরের গায়ে খোদাই করা মহাভারতের দৃশ্যাবলি যেন ইটের শরীরে প্রাণ সঞ্চার করেছে। আয়তাকার প্যানেলে দেখা যায় ঘোড়া, হনুমান, রাম-লক্ষ্মণ, যুদ্ধে লিপ্ত সৈন্যদের দৃশ্য। নিচের বেইজ ফ্রেমে রাজহাস, অশ্বারোহী, মৃগয়া শিকারী, পালকীবাহক বেহারা, রথটানার দৃশ্য- সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পৌরাণিক চিত্র ভাষ্য। পোড়ামাটির ধূসর ফলকচিত্র আর ফ্লোরাল রোজেট মন্দিরের গায়ে এনে দিয়েছে এক মোলায়েম সৌন্দর্য।

মন্দিরের ইটের মাপও ইতিহাসের সাক্ষী- ২৩দ্ধ১৩দ্ধ৪, ২৪দ্ধ১৪দ্ধ৫ এবং ২৮দ্ধ১৪দ্ধ৪.৫ সেন্টিমিটার। এই মাপই বলে দেয়, এটি কোনো আধুনিক নির্মাণ নয়; এটি সময়ের গভীর স্তর থেকে উঠে আসা এক স্থাপত্য কাব্য।

রঘুনাথ মন্দির থেকে মাত্র ১২০ ফুট পশ্চিমে রয়েছে জগন্নাথ মন্দির। স্থাপত্যরীতি ও সময় বিবেচনায় দুটিই সমসাময়িক। যশোরের চাঁচড়া শিব মন্দিরের সঙ্গেও এর শৈল্পিক মিল লক্ষ্য করা যায়। ফলে ধারণা করা হয়, এই অঞ্চল একসময় ছিল শক্তিশালী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

মন্দিরে আজও পূজা হয়। তবে সময় তার দাগ রেখে গেছে। মন্দিরের উপর জন্মেছে গাছ, লতাপাতা। নিচের বেইজ ফ্রেমে সিমেন্ট-বালুর নতুন পলেস্তারা পুরোনো কারুকার্যকে ঢেকে দিয়েছে আংশিকভাবে। লবণাক্ততার প্রভাবে পোড়ামাটির নকশায় লোনা আস্তরণ ও ফাঙ্গাসের আক্রমণ স্পষ্ট। প্রত্নস্থলটি এখন মোটামুটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে- যেন ধীরে ধীরে নিজের শরীরেই ক্ষয় লিখে চলেছে।

ভূমিগতভাবে মন্দিরটি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে খাস খতিয়ানভুক্ত। অথচ এই সরকারি স্বীকৃতি তার রক্ষণাবেক্ষণে তেমন আশ্বাস দিতে পারেনি।

মন্দিরে কোথাও কোনো শিলালিপি নেই। তবু জনশ্রুতি আছে- নড়াইলের বিখ্যাত জমিদারদের দেওয়ান হরিরাম মিত্র এই মন্দির কমপ্লেক্স নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর বাড়িও ছিল ধূলগ্রামে। ইতিহাসের নির্ভুল কণ্ঠ পাওয়া না গেলেও অনুমান করা হয়, মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগ থেকে অষ্টাদশ শতকের প্রথম প্রান্তিকে।

আজ ধূলগ্রামের রঘুনাথ মন্দির যশোর-নড়াইল অঞ্চলের শিল্প, বিশ্বাস আর ইতিহাসের মিলিত দলিল। প্রতিটি পোড়ামাটির ফলকে লুকিয়ে আছে মানুষের বিশ্বাস, প্রতিটি খিলানে জমে আছে শতাব্দীর নিশ্বাস।

এই মন্দির দাঁড়িয়ে আছে আমাদের স্মৃতির প্রান্তে- চুপচাপ, অথচ গভীর গম্ভীরতায় বলে যায়, “আমাকে দেখো, আমাকে বাঁচাও, আমাকে ভুলে যেও না।”

 

শেয়ার করুনঃ