বুধবার ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

২১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অভয়নগরের সিদ্ধিপাশা জমিদার বাড়ি নারায়ণ মন্দির

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৮:৩২, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬

অভয়নগরের সিদ্ধিপাশা জমিদার  বাড়ি নারায়ণ মন্দির

নড়াইলের জমিদার প্রাণহরি ভদ্র একসময় নড়াইলের জমিদারদের নিকট থেকে একটি অংশ গ্রহণ করে নিজস্ব জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। তারই উত্তরাধিকার সূত্রে গড়ে ওঠে সিদ্ধিপাশা জমিদার বাড়ি ও সংলগ্ন নারায়ণ মন্দির। মন্দিরটির কোথাও কোনো শিলালিপি না থাকায় সঠিক নির্মাণকাল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে স্থাপত্যশৈলী ও পারিবারিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করে গবেষকদের ধারণা, উনিশ শতকের প্রথম দিকেই জমিদার বাড়ি ও এই নারায়ণ মন্দির নির্মিত হয়েছিল। সম্ভাব্যভাবে প্রাণহরি ভদ্রের সময়কালেই মন্দিরটির নির্মাণ সম্পন্ন হয়।


প্রাণহরি ভদ্রের পুত্র যোগেন্দ্র নাথ ভদ্র, তার পুত্র জ্যোতিন্দ্র নাথ ভদ্র এবং পরবর্তীতে অচিন্ত্য কুমার ভদ্র ওরফে কানু ভদ্র- এই ধারাবাহিক উত্তরাধিকার আজও জমিদার পরিবারের ইতিহাসকে বহন করে চলেছে। জ্যোতিন্দ্র নাথ ভদ্র ১৯৭৫ সালে ৬৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাদের পারিবারিক স্মৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান নিদর্শন এই নারায়ণ মন্দির।


যশোর জেলা সদর থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে, অভয়নগর উপজেলা সদর থেকে ২২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে, সিদ্ধিপাশা ইউনিয়ন পরিষদের ৪ কিলোমিটার উত্তরে এবং সোনাতলা-নড়াইল সড়কের দক্ষিণে মাত্র ৩শ’ মিটার অগ্রসর হলেই চোখে পড়ে সিদ্ধিপাশা জমিদার বাড়ি নারায়ণ মন্দির। গ্রামবাংলার নিস্তব্ধ পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা এই মন্দিরটি যেন ইতিহাসের এক নীরব প্রহরী।
ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত প্রায় বর্গাকার ভূমি পরিকল্পনার একতলা চাদনী এই মন্দিরটি পার্শ্ববর্তী সমতল ভূমি থেকে প্রায় এক মিটার উঁচু একটি প্লাটফর্মের ওপর স্থাপিত। পশ্চিমমুখী মন্দিরটির নির্মাণে চুন-সুরকি ও বালুর ব্যবহার স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। দেয়ালের চুন-বালির প্রলেপে নিউক্ল্যাসিক্যাল শিল্পরীতির সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে।


মন্দিরের সম্মুখভাগে চারটি ডোরিক কলামের ব্যবহার স্থাপনাটিকে দিয়েছে গাম্ভীর্যপূর্ণ সৌন্দর্য। কলামের নিচের অংশে বেইজ রঙের নকশা এবং উপরের অংশে গ্রিক শিল্পরীতির আদলে পিউকলি অলংকরণ নজর কাড়ে। কার্নিশের নিচে একসারি ফুল-লতাপাতার স্ট্যাকো অলংকরণ মন্দিরটির নান্দনিকতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। কর্নারের দু’পাশের সম্মুখ ভাগেও একই ধরনের ফুল-লতাপাতার নকশা শোভা পেয়েছে।
ছাদ নির্মাণে লোহার বিম ও কাঠের কড়ি বর্গার ব্যবহার তৎকালীন নির্মাণ কৌশলের পরিচয় বহন করে। বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে কলামের সম্মুখ ভাগে লুভর স্টার নকশার ব্যবহার মন্দিরটিকে করেছে ব্যতিক্রমী। মন্দিরটির চারপাশে ঘূর্ণায়মান নকশা রয়েছে, যা স্থাপত্যশিল্পে গতিশীলতার অনুভূতি সৃষ্টি করে। পশ্চিম দিকে তিন ধাপের একটি সিঁড়ি দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়, যা এর আনুষ্ঠানিক প্রবেশপথকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে।
মন্দির নির্মাণে ব্যবহৃত ইটের পরিমাপও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। ২৯দ্ধ১৮দ্ধ৫ সেমি., ২২দ্ধ১৬দ্ধ৫ সেমি. এবং ২৩দ্ধ১৩দ্ধ৫ সেমি. মাপের ইটের ব্যবহার থেকে বোঝা যায়, নির্মাণকালে একাধিক ধরনের ইট প্রয়োগ করা হয়েছিল, যা তৎকালীন নির্মাণ প্রক্রিয়ার বৈচিত্র্য নির্দেশ করে।


আজ সময়ের আঘাতে অনেকটাই জীর্ণ হলেও সিদ্ধিপাশা জমিদার বাড়ি নারায়ণ মন্দির এখনও দাঁড়িয়ে আছে অতীতের গৌরব ও শিল্পরুচির স্মারক হয়ে। এই মন্দিরটি এ অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্য ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল। যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।


 

শেয়ার করুনঃ