মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিলের বুকে কাজুলিয়া

রায় চৌধুরী বংশের দীর্ঘ ইতিহাস

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৩:৫২, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রায় চৌধুরী বংশের দীর্ঘ ইতিহাস

একসময় গোপালগঞ্জের কাজুলিয়া ছিল একটি গণ্ডগ্রাম। চারদিকে বিস্তীর্ণ বিল, যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম নৌকা। গোপালগঞ্জ থেকে বছরের প্রায় সব সময়ই নৌকায় আসতে হতো এই গ্রামে। খালের পাড় দিয়ে রাস্তা হয়েছে অনেক পরে। অথচ সেই প্রত্যন্ত কাজুলিয়াই একসময় হয়ে উঠেছিল প্রভাবশালী এক বৈদ্য বংশের আবাসস্থল। তাঁদের জমিদারি, তালুক, সামাজিক প্রতিপত্তি এবং পারিবারিক নানা ঘটনার সঙ্গে মিশে আছে এই গ্রামের ইতিহাস।

এই বংশের সূত্রপাত বৈদ্যকুলীন বিষ্ণুদাস বংশোদ্ভূত জানকীবল্লভ বিশ্বাসকে দিয়ে। তিনি মহারাজ প্রতাপাদিত্যের অধীনে উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন এবং খড়রিয়া পরগনার মালিকানা লাভ করেন। তাঁর দুই পুত্র রামভদ্র কবিকর্ণপুর ও বলভদ্র কবীন্দ্রচন্দ্র। পরবর্তী সময়ে কবীন্দ্রচন্দ্রের বংশধররা খড়রিয়া পরগনার দশ আনা এবং কবিকর্ণপুরের বংশধররা ছয় আনা অংশের মালিক ছিলেন।

কিন্তু রাজস্ব অনাদায়ের কারণে একসময় তাঁদের জমিদারি বিপন্ন হয়ে পড়ে। তৎকালীন আইন অনুযায়ী খড়রিয়া পরগনা রেভিনিউ বোর্ডের নিলামে ওঠে এবং কলকাতার হাটখোলা, নিমতলা নিবাসী কাশীনাথ দত্ত তা কিনে নেন। এর আগে তিনিই সরকারের পক্ষ থেকে ওই পরগনার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে ছিলেন। নবাবি আমলে এ ধরনের কর্মকর্তাকে ‘ওয়েদদার’ এবং কোম্পানি আমলে ‘সাজলদার’ বলা হতো। জমিদার রাজস্ব দিতে ব্যর্থ হলে সরকার তার কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য এমন কর্মকর্তা নিয়োগ করত; রাজস্ব আদায় সম্ভব না হলে শেষ পর্যন্ত সম্পত্তি নিলামে বিক্রি হতো।

জমিদারি হাতছাড়া হওয়ার পর রামদেব কর্ণাভরণের বংশধররা খড়রিয়ার মূলঘর গ্রাম ছেড়ে ফতেজঙ্গপুর পরগনার কাজুলিয়ায় এসে বসতি স্থাপন করেন। বৃহৎ বিলের মধ্যে অবস্থিত এই গ্রামে তাঁরা ফতেজঙ্গপুরের মালিক না হয়েও একটি বিস্তৃত তালুক গড়ে তুলেছিলেন। তালুকের রাজস্ব জমিদারের মাধ্যমে নয়, সরাসরি কালেক্টরিতে জমা দেওয়া হতো। পৈতৃক খড়রিয়া পরগনা উদ্ধারের জন্য তাঁরা আদালতের আশ্রয়ও নিয়েছিলেন, কিন্তু তাতে সফল হননি।
রামদেবের দুই পুত্র রঘুনাথ রায় কবিরত্ন ও কন্দর্প রায়। রঘুনাথের পুত্র রমাকান্ত রায়। কন্দর্পের পুত্র কৃষ্ণরাম রায় অল্প বয়সেই মারা গেলে তাঁর শিশুপুত্র রত্নেশ্বরের দেখাশোনা ও সম্পত্তির ভার পড়ে রমাকান্তের হাতে। কিন্তু সম্পত্তি গ্রহণ করলেও রমাকান্ত রত্নেশ্বরকে আপন করে নেননি। শিশুটিকে দূরে সরিয়ে রাখতেন। একসময় এক বিশ্বস্ত ভৃত্য তাকে নিয়ে জপসায় তার পিতার বিমাতার কাছে আশ্রয় নেয়। সেই নারী তাঁর ভাই লালা রামপ্রসাদকে বিষয়টি জানান। রামপ্রসাদ শিশুটির দায়িত্ব নেন এবং নিজের ভাগ্নের পুত্রের মতো তাকে লালন করতে থাকেন।

এদিকে রমাকান্তের ওপর রাজস্বের চাপ বাড়তে থাকে। তিনি ঢাকায় গিয়ে দেওয়ান রাজবল্লভের সহকারী দেওয়ান লালা রামপ্রসাদের শরণাপন্ন হন। রামপ্রসাদ তাঁর অতীতের অন্যায় ভুলে যাননি। তিনি রমাকান্তকে দেশে ফিরে যেতে বলেন এবং পরে সবকিছুর মীমাংসার আশ্বাস দেন।

কিছুদিন পর রামপ্রসাদের কন্যা সর্বেশ্বরীর বিয়ে উপলক্ষে বৈদ্যকুলীন সমাজের লোকজনের সমাগম হয়। নিমন্ত্রিত হয়ে রমাকান্তও সেখানে যান। অন্যরা চলে গেলেও তিনি থেকে যান— নিজের সম্পত্তি রক্ষার আশায়।
একদিন রামপ্রসাদ তাঁকে ডেকে পাশে থাকা একটি বালকের দিকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘চৌধুরী মহাশয়, আপনি কি একে আর কখনও দেখেছেন?’ রমাকান্ত বুঝতে পারলেন, সে রত্নেশ্বর। তখন রামপ্রসাদ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন— এই শিশুই তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র, অন্যায়ভাবে তাকে গৃহ থেকে বের করে তার সম্পত্তি আত্মসাৎ করা হয়েছে। রত্নেশ্বরকে গ্রহণ করে সম্পত্তির সমান ভাগ করে দিতে হবে; অন্যথায় তিনি নিজেই এর প্রতিকার করবেন।
রমাকান্ত আর কোনো প্রতিবাদ করেননি। রত্নেশ্বরকে কোলে তুলে নেন। রামপ্রসাদ তাঁর রাজস্বের দায়ও পরিশোধ করে দেন। পরে রমাকান্ত রত্নেশ্বরকে সঙ্গে নিয়ে কাজুলিয়ায় ফিরে এসে সম্পত্তির অর্ধেক তাকে দিয়ে দেন। পরবর্তীকালে রমাকান্তের কন্যার সঙ্গে মহারাজ রাজবল্লভের পুত্র রায় রতনকৃষ্ণের বিবাহও হয়।

দীর্ঘদিন কাজুলিয়ায় বিশেষ সম্মানের সঙ্গে বসবাস করেছে এই রায় চৌধুরী বংশ। তাঁদের মধ্যে উমাকান্ত রায়, কবিরাজ রেবতীকান্ত রায়, ঈশানচন্দ্র রায়, প্রতাপচন্দ্র রায়, সাব-রেজিস্ট্রার বনমালী রায়, আইনজীবী শশীকান্ত রায়, রাজকুমার রায়, লালবিহারী রায়, অনন্তকুমার রায় ও প্রমথনাথ রায়ের নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁদের সঙ্গে ধন্বন্তরি গোত্রীয় আরও কয়েক ঘর কুলীন বৈদ্য কাজুলিয়ায় বসতি গড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে পুলিশ ট্রেনিং স্কুলের শিক্ষক বিপিনবিহারী সেন এবং আইনজীবী দীনেশচন্দ্র সেন ও দুর্গাচরণ সেনের নাম পাওয়া যায়।

কাজুলিয়ায় কয়েক ঘর ব্রাহ্মণ ও শূদ্র পরিবারও বসবাস করত। গ্রামবাসীদের অনেকেই ছিলেন সম্পন্ন। কিন্তু শিক্ষার জন্য ভালো বিদ্যালয়ের অভাব ছিল। বিলবেষ্টিত সেই গ্রামে যোগাযোগের দুর্ভোগ ছিল দীর্ঘদিনের সঙ্গী। নৌকা ছিল যাতায়াতের প্রধান অবলম্বন; খালের পাড়ের রাস্তা হয়েছে অনেক পরে।

শেয়ার করুনঃ