১৮১৭ সাল। যশোর জেলায় হঠাৎ দেখা দিল এক নতুন ব্যাধি। আক্রান্ত মানুষ ঘন ঘন ভেদবমি ও মলত্যাগে অতি দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ছেন, তারপর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। বঙ্গদেশে পেটের অসুখ নতুন কিছু ছিল না। কিন্তু এমন ভয়াবহ, দ্রুতগামী ও প্রাণঘাতী রোগের অভিজ্ঞতা মানুষের আগে ছিল না। তাই রোগটিরও হলো নতুন নাম- ‘এশিয়াটিক কলেরা’।
সেই কলেরা পরে যশোরের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ল কলকাতায়, ভারতের নানা অঞ্চলে, একসময় এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় এবং শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর বহু দেশে। উনিশ শতকের গোড়ায় যে রোগটি পৃথিবীজুড়ে আতঙ্কের প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছিল, তার প্রথম মহামারি নিয়ে যশোরের নাম তাই ইতিহাসের পাতায় বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়।
তবে একটি প্রশ্ন আজও ইতিহাসবিদদের আলোচনায় ফিরে আসে— কলেরা কি সত্যিই যশোর থেকেই প্রথম মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল?
১৮১৭ সালের যশোর ছিল ব্রিটিশ শাসনের গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলা। নীল চাষের বিস্তার ঘটছিল দ্রুত। বৃহত্তর যশোরের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছিল অসংখ্য নীলকুঠি। নীল ব্যবসার আকর্ষণে দেশের নানা অঞ্চল থেকে মানুষও এখানে আসছিলেন।
যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার প্রয়োজনও দেখা দিয়েছিল। ব্রিটিশ সরকার নতুন সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এসব সড়ক তৈরির কাজে বিভিন্ন জেলা থেকে আনা কয়েদিদেরও শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হতো। আর সেই সড়ক নির্মাণে নিয়োজিত শ্রমিকদের মধ্যেই ভয়াবহ রোগটির প্রথম তাণ্ডব প্রত্যক্ষ করা যায় বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
কলেরা— শব্দটি আজ খুব পরিচিত। কিন্তু দুই শতাব্দী আগে এই তিন অক্ষরের রোগের নামই ছিল মৃত্যুর আতঙ্ক। তখন রোগের কারণ সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিল অস্পষ্ট। জীবাণু সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞানও ছিল না। ফলে রোগের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নানা কুসংস্কার, অলৌকিক ব্যাখ্যা ও ভয়াবহ সব গুজব। যশোরের তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. টেইলরের বিবরণীতে পাওয়া যায় সেই সময়ের এক আশ্চর্য চিত্র।
১৮১৭ সালের আগস্ট। যশোর জুড়ে কলেরার প্রকোপ বাড়ছে। রোগীর সংখ্যা এত দ্রুত বাড়তে থাকে যে যশোর শহর প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কও ছড়িয়ে পড়েছিল মাসের শুরু থেকেই। কিন্তু রোগের ভয়কে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল কিছু গুজব।
ডা. টেইলর জানতে পারেন, সেই আগস্ট মাসে পাঁচটি শনিবার পড়েছিল। এ ঘটনাকে ঘিরেই মানুষের মধ্যে জন্ম নেয় এক অদ্ভুত বিশ্বাস। পাঁচ শনিবারের মাস নিশ্চয়ই কোনো অশুভ সংকেত বহন করছে। সাধু ও জ্যোতিষীরাও নাকি সেই ভয়কে আরও উসকে দিয়েছিলেন। তাঁদের ব্যাখ্যায়, অতিরিক্ত শনিবার ‘শনির দশা’র লক্ষণ, আর পাঁচ সংখ্যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিবের অভিশাপ ও ধ্বংসের প্রতীকী অর্থ। ফলে কলেরার আবির্ভাবকেও অনেকে সেই অশুভ সংকেতের বাস্তব প্রকাশ বলে মনে করতে শুরু করেন। কিন্তু গুজবের ভয়াবহতা তখনো শেষ হয়নি।
২৯ আগস্ট রাত। মাসের শেষ শনিবারের আগের দিন। হঠাৎ যশোরের গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল আরেক ভয়ংকর গুজব। বলা হলো, একদল কালো জাদুকর মুরলী এলাকা থেকে একটি মানুষের কাটা মুণ্ডু নিয়ে পালিয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য নাকি সারা ভারত ঘুরে বেড়ানো। তারা যত দূর যাবে, তত দূর ছড়িয়ে পড়বে শিবের অভিশাপ— আর সেই অভিশাপেরই নাম কলেরা।
গুজবের সঙ্গে যুক্ত হলো আরও একটি বিশ্বাস। ওই কালো জাদুকরদের ধরে কাটা মুণ্ডুটি যদি মাটিতে ফেলে দিতে বাধ্য করা যায়, তাহলে যে জায়গায় মুণ্ডুটি পড়বে, সেখানেই কলেরা ‘অক্কা পাবে’—অর্থাৎ রোগের অবসান ঘটবে।
ফলে মধ্যরাতেই গ্রামে গ্রামে শুরু হয়ে গেল তল্লাশি। আতঙ্কিত মানুষ কথিত কালো জাদুকরদের ধরতে বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু তাদের আর পাওয়া গেল না। গুজবও থামল না। বরং রোগের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভয় আরও বাড়তে থাকল।
দুই মাসে যশোর জেলায় প্রায় ১০ হাজার মানুষ কলেরায় মারা গিয়েছিলেন— সরকারি নথিপত্রে এমন তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই মৃত্যুর সংখ্যা থেকেই বোঝা যায়, রোগটি কী ভয়ংকর মাত্রায় আঘাত হেনেছিল।
তবে যশোর থেকেই কলেরার প্রথম মহামারি শুরু হয়েছিল— এমন ধারণার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ দ্বিমত পোষণ করেছেন।
১৮৭২ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত অহহধষং ড়ভ ঈযড়ষবৎধ গ্রন্থে ডা. জন ম্যাকফারসন উল্লেখ করেন, যশোরে কলেরা ব্যাপক আকারে দেখা দেওয়ার আগেই ১৮১৭ সালের মার্চ মাসে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম এলাকায় প্রাণঘাতী এই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। এরপর মে-জুনে কৃষ্ণনগর ও ময়মনসিংহ এবং জুলাইয়ে ঢাকা জেলাতেও রোগটির উপস্থিতি দেখা যায়। যশোরে এর ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ঘটে আগস্টে।
এ কারণে কোনো কোনো ঐতিহাসিকের ধারণা, নদীয়া জেলার উলা অঞ্চলেই হয়ত কলেরার প্রথম প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। বাংলায় কলেরার প্রচলিত নাম ‘ওলাওঠা’ বা ‘উলাউঠা’ হওয়ার পেছনেও কেউ কেউ উলা এলাকার নামের সম্পর্ক খুঁজেছেন।
তবে এই ব্যাখ্যাও সর্বসম্মত নয়। নগেন্দ্রনাথ বসু তাঁর বিশ্বকোষ-এ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, রোগের প্রকৃতি থেকেই ‘ওলাউঠা’ নামটির উৎপত্তি— পেট ‘নামা’ এবং বমি ‘উঠা’র সঙ্গে শব্দটির সম্পর্ক রয়েছে।
কলেরা প্রথম কোথায় দেখা দিয়েছিল— এই বিতর্কের নিষ্পত্তি হয়ত সহজ নয়। কিন্তু একটি বিষয়ে যশোরের গুরুত্ব অস্বীকার করা কঠিন। পূর্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে রোগটির উপস্থিতি দেখা গেলেও যশোরেই এর ভয়াবহ মহামারি রূপটি বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এখানকার বিপুল মৃত্যু ও দ্রুত বিস্তার মানুষের মনে কলেরাকে এক ভয়ংকর মহামারির প্রতীকে পরিণত করে।
আর রোগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছড়িয়েছিল অন্ধবিশ্বাস।
মহামারির প্রকোপ কিছুটা কমে যাওয়ার পরও মানুষের ভয় কাটেনি। ডা. টেইলর গ্রামাঞ্চলে ঘুরে এমন ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেছিলেন, যেখানে একটি নয় বছরের বালিকাকে নেশাদ্রব্য খাইয়ে অচেতন করে শীতলা দেবীরূপে পূজা দেওয়া হচ্ছিল। উদ্দেশ্য— কলেরার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া।
হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে অনেকে আবার ওলাবিবির কাছে রোগমুক্তির জন্য প্রার্থনা করতে শুরু করেন। মহামারি যখন বিজ্ঞানের অজানা, চিকিৎসা যখন সীমিত, তখন মানুষের আশ্রয় হয়ে ওঠে দেবতা, অলৌকিক শক্তি, তাবিজ-কবচ কিংবা নানা ধরনের টোটকা।
এরই একটি ভয়াবহ উদাহরণ পাওয়া যায় ১৮১৮ সালের ২১ নভেম্বর প্রকাশিত সমাচার দর্পণ-এর একটি প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়, যশোরে কলেরায় আক্রান্ত অনেকে ‘হরিতাল ভস্ম’ সেবন করে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এমনকি যাঁদের শরীরে মৃত্যুর লক্ষণ দেখা দিয়েছিল, তাঁরাও নাকি এই ভস্ম সেবনে বেঁচে গেছেন। অথচ হরিতাল ছিল বিষাক্ত খনিজ পদার্থ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এমন পদার্থকে রোগমুক্তির উপায় হিসেবে গ্রহণ করা ছিল ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ।
শুধু যশোর নয়, কলকাতার মানুষও এমন গুজব থেকে মুক্ত ছিলেন না।
১৮১৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সমাচার দর্পণ এমন এক চিঠির কথা প্রকাশ করে, যেখানে কলকাতার লালবাজারের নতুন গির্জার চূড়ায় লাগানো ‘হাওয়া মোরগ’-কে কলেরার জন্য দায়ী করা হয়েছিল। চিঠির লেখকের বিশ্বাস ছিল, হাওয়া মোরগটি যেদিকে মুখ ফেরায়, সেদিকের মানুষ মারা যায়। তাঁর তিন আত্মীয়ের মধ্যে দুজনের মৃত্যু নাকি সেই দিকেই মুখ ফেরানো অবস্থায় ঘটেছিল; তৃতীয়জন যুবক হওয়ায় পালিয়ে বেঁচে যান। পত্রলেখকের যুক্তি ছিল, ওই হাওয়া মোরগটিকে বন্দি করা গেলে হয়ত কলেরার বিস্তার বন্ধ করা সম্ভব।
আজকের বিজ্ঞানের যুগে এসব বিশ্বাস অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু দুই শতাব্দী আগে, যখন মানুষ জানত না রোগ কীভাবে ছড়ায়, জীবাণু কী এবং দূষিত পানি কীভাবে মৃত্যুর কারণ হতে পারে, তখন এমন গুজবই ছিল আতঙ্কিত মানুষের ব্যাখ্যার একমাত্র অবলম্বন।
























