বৃহস্পতিবার ০৮ অক্টোবর ২০২৬

২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জমিদারদের হাতে প্রশাসন

রাজস্বই ছিল সরকারের প্রধান লক্ষ্য

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৩:১৩, ৭ অক্টোবর ২০২৬

রাজস্বই ছিল সরকারের প্রধান লক্ষ্য

যশোর জেলার ঔপনিবেশিক প্রশাসনের ইতিহাস বুঝতে হলে ১৭৮১ সালের আগের সময়ের দিকে ফিরে তাকাতে হয়। সেই সময় যশোরে ব্রিটিশদের সরাসরি প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জেলা পরিচালনার বড় অংশই ছিল জমিদারদের হাতে। রাজস্ব আদায় ছিল সরকারের প্রধান লক্ষ্য; প্রশাসন, পুলিশ, বিচারসহ জনজীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও কার্যত জমিদারদের ওপর ন্যস্ত ছিল। যশোরের তৎকালীন কালেক্টর জেমস ওয়েস্টল্যান্ড তাঁর অ জবঢ়ড়ৎঃ ড়হ ঃযব উরংঃৎরপঃ ড়ভ ঔবংংড়ৎব গ্রন্থে এই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছেন।

ওয়েস্টল্যান্ডের বিবরণ অনুযায়ী, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় যশোর জেলায় জমিদারির সংখ্যা ছিল ১০০-এর কিছু বেশি। বড় বড় জমিদারির বিস্তার ছিল জেলার প্রায় সমগ্র এলাকা জুড়ে। এর পাশাপাশি ছোট ছোট অসংখ্য জমিদারি ছড়িয়ে ছিল বিভিন্ন স্থানে। তাঁর ধারণা ছিল, এসব ছোট জমিদারি মূলত কোনো প্রাচীন ও স্বতন্ত্র ভূসম্পত্তি ছিল না; বরং বড় জমিদারিরই কোনো অংশ ক্রয়, দান বা অন্য কোনো উপায়ে আলাদা হয়ে গিয়ে ছোট জমিদারিতে পরিণত হয়েছিল।

বড় জমিদারদের অবস্থানও ছিল আলাদা। দেশের প্রশাসনে তাঁদের এক ধরনের ভূমিকা ছিল, যা ছোট জমিদারদের ছিল না। কাশীনাথ দত্তের স্বত্বের উৎপত্তি এবং চাঁচড়া পরিবারের ইতিহাসের একটি ঘটনার উল্লেখ করে ওয়েস্টল্যান্ড দেখিয়েছেন, জমিদারদের ভূমিকা শুধু রাজস্ব প্রদানকারী ভূসম্পত্তির মালিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁরা অনেকটা রাজস্ব আদায়ের ঠিকাদারের মতো কাজ করতেন।

চাঁচড়া বংশের মনোহর রায়ের ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি শুধু নিজের ভূসম্পত্তির রাজস্ব পরিশোধের জন্য নবাবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হননি; পার্শ্ববর্তী ছোট ছোট ভূসম্পত্তি থেকেও রাজস্ব আদায় করে তা সরকারের কাছে জমা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। অর্থাৎ জমিদারের ক্ষমতার পরিধি তাঁর নিজস্ব জমিদারির সীমানা ছাড়িয়েও বিস্তৃত হতে পারত।

জমিদারদের দায়িত্ব অবশ্য শুধু ভূমিরাজস্ব আদায়েই শেষ হতো না। তাঁরা অন্যান্য রাজস্বেরও ঠিকাদার ছিলেন এবং অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় সাধারণ প্রশাসনের দায়িত্বও পালন করতেন। আবগারি রাজস্বের নির্দিষ্ট অর্থ সরকারকে দিয়ে নিজেদের এলাকায় আবগারি ব্যবস্থা পরিচালনার সুযোগ পেতেন। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ওপর শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রেও তাঁদের একই ধরনের ক্ষমতা ছিল। পুলিশের দায়িত্বও ছিল তাঁদের হাতে। তাঁদের এলাকায় ডাকাতি হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দায়ও জমিদারের ওপর বর্তাত।

জমিদারদের অধস্তন কর্মচারীরা ছোটোখাটো দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধের নিষ্পত্তিতেও জড়িয়ে পড়তেন। সরকারি ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ছিল খুবই সীমিত। ‘দারোগা’ নামে পরিচিত সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন জেলার বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত অন্যতম প্রধান কর্মকর্তা। জমিদারদের হাতে ধরা ডাকাত, দস্যু ও খুনিদের গ্রহণ করে বিচারপ্রক্রিয়ায় নেওয়া ছিল তাঁর দায়িত্ব। কিন্তু তাঁর ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত সীমিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলার বিবরণ সরকার বা নায়েব নবাবের কাছে পাঠিয়ে সেখান থেকে নির্দেশ নিতে হতো। জমিদারদের ওপর তাঁর কার্যকর তদারকি ক্ষমতা ছিল না।

এই ব্যবস্থায় সরকারের মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল রাজস্ব আদায়। প্রশাসনের প্রায় সব দায়িত্ব জমিদারদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে, তাঁরা সময়মতো রাজস্ব দিতে পারলেই সরকার সন্তুষ্ট থাকত। ফলে জমিদাররা নিজেদের এলাকায় অনেকটা স্বাধীনভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারতেন। ওয়েস্টল্যান্ডের ভাষ্যে, তদারকি ব্যবস্থা থাকলেও তা ছিল প্রায় নামমাত্র।

এর ফলও ছিল ভয়াবহ। জমিদারের খাজনা আদায়ের জন্য প্রজাদের ওপর নিপীড়ন চালানো হতো। জমিদারের কর্মচারীরা নিজেদের সম্পদ বাড়ানোর জন্য জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করত। পুলিশের দায়িত্ব জমিদারদের হাতে থাকায় ডাকাতি ও দস্যুতার বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। অনেক সময় ডাকাতদের সঙ্গে জমিদারের কর্মচারী, এমনকি জমিদার বা তাঁর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও আঁতাত থাকার অভিযোগ ছিল।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও সহজে প্রতিকার মিলত না। অভিযোগ গ্রহণ করবেন কিনা, সেটিও নির্ভর করত জমিদার বা তাঁর কর্মকর্তার ইচ্ছার ওপর। অত্যাচারী যদি জমিদারের কর্মচারী হন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা আরও কমে যেত।

ওয়েস্টল্যান্ডের মতে, ১৭৭২ থেকে ১৭৭৪ সাল পর্যন্ত যশোরে একজন কালেক্টর নিয়োগের মাধ্যমে সরাসরি রাজস্ব আদায়ের একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এটি ছিল ওয়ারেন হেস্টিংসের বৃহত্তর নীতির অংশ। কিন্তু ব্যয়বহুল হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর মতে, ১৭৭২ সালকে সরাসরি ব্রিটিশ প্রশাসনের সূচনা বলা হলেও ১৭৮১ সালের আগে যশোরে প্রকৃত অর্থে অভ্যন্তরীণ প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

১৭৮১ সালে প্রথম ইংরেজ প্রশাসন প্রতিষ্ঠার আগে যশোরের এই পরিস্থিতিই ছিল দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। মুসলিম শাসনামলে রাজস্ব আদায়ের জন্য ফৌজদারদের নিয়োগ করা হতো। ব্রিটিশরা রাজস্ব ব্যবস্থার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফৌজদারদের ভূমিকা বদলে যায়; তাঁরা পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। তাঁদের অধীনে থানাদাররা ছোট ছোট এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতেন।

ওয়েস্টল্যান্ডের বিবরণে তাই ১৭৮১ সালের আগের যশোর যেন একটি পরিবর্তনশীল প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। একদিকে নবাবি আমলের জমিদারনির্ভর রাজস্ব ও প্রশাসন, অন্যদিকে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকা ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ। এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই যশোরে আধুনিক জেলা প্রশাসনের ভিত্তি তৈরি হতে শুরু করে।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: