মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অর্থ ব্যয়ের তদন্ত দাবি স্থানীয়দের

শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ তবুও বাড়েনি সেবার মান

ওয়াজেদ খান ডবলু

প্রকাশিত: ১৭:৪৪, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ তবুও বাড়েনি সেবার মান

কেশবপুর পৌরসভায় গত দেড় দশকে শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে। অবৈধভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে জনবল। যাদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা গুনতে হচ্ছে সরকারকে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না পৌরবাসী।

এছাড়া বিভিন্ন কেনাকাটা ও অনুষ্ঠান আয়োজনের নামেও বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আড়াই কোটি টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব নথির মধ্যে একই ধরনের কাজ, অতিরিক্ত বিল এবং ভুয়া ভাউচারের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়গুলো তদন্ত করে গত ১৭ বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন পৌরবাসী।

কেশবপুর পৌরসভা ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ পৌরসভায় প্রায় ২৫ হাজার মানুষের বাস। যার ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। ওয়ার্ড রয়েছে ৯টি। এর মধ্যে বর্ষা মৌসুমে ৭, ৮, ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ৩ শতাধিক পরিবার বছরে ৪/৫ মাস জলাবদ্ধ হয়ে থাকে।

স্থানীয়রা বলছেন, যশোরের কেশবপুর পৌরসভাটি ৮০ শতাংশ এলাকা জুড়ে খাল, বিল ও জলাশয় থাকলেও পৌরসভাটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, বিশেষ করে ২০১০ সালের পর থেকে পৌরসভার অবকাঠামো নির্মাণের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব টাকা অধিকাংশই আত্মসাৎ করা হয়েছে।

জানা যায়, আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পর কেশবপুর পৌরসভা নির্বাচনে পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি রফিক মোড়ল মেয়র নির্বাচিত হন। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর সময়ে বিভিন্ন বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করা হয়েছে। সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি দাতা সংস্থার অর্থায়নে সড়ক, ড্রেনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

পৌর শহরের উপজেলা সড়ক, মধু সড়ক ও পৌর সড়কসহ কয়েকটি সড়কের পাশে আরসিসি ড্রেন নির্মাণ করা হলেও ড্রেনের ভেতরের সেন্টারিংয়ের তক্তা, বাঁশ ও বালুর বস্তা না সরিয়ে ঢালাই দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এতে পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হচ্ছে। এসব অপসারণের দাবিতে মহল্লাবাসী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেছেন। একই প্রকল্পে সড়কের পাশে স্ট্রিট লাইট দেওয়ার কথা থাকলেও তা স্থাপন করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এসব সড়কে সৌরবিদ্যুতের স্ট্রিট লাইট স্থাপনের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও বর্তমানে সেগুলোর অস্তিত্ব নেই বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সরকার ও এডিবির অর্থায়নে চারটি প্যাকেজে প্রায় ৪০ কোটি টাকার অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার আবু সাঈদ পৌর কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে শিডিউল অনুযায়ী কাজ না করে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বরের দিকে সাবেক কাউন্সিলরদের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্প ও কাজের নামে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। পরে ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে দায়িত্ব নেওয়া প্রশাসকের সময়ে আরও প্রায় ১ কোটি ৩৬ লাখ ৭ হাজার ১৮৪ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। দুই পর্যায়ে মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

নথিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট, বিদ্যুৎ বিল, রাস্তা সোলিং, আরসিসি সড়ক ও ড্রেন, পৌর ভবনের পানি ও বৈদ্যুতিক লাইন মেরামতসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের তথ্য রয়েছে। এসব ব্যয়ের বাস্তবতা ও যৌক্তিকতা যাচাই করা প্রয়োজন বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত পিকনিক, বিজয় দিবস, গেট-প্যান্ডেল নির্মাণ, ফার্নিচার, প্রশাসকের চেয়ার, আপ্যায়ন, বৈদ্যুতিক মালামাল, মশক নিধন, কম্পিউটার ও প্রিন্টার কেনাকাটাসহ বিভিন্ন খাতে বিল করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সাতটি কম্পিউটার কেনার নামে ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৭৩২ টাকা এবং সাতটি প্রিন্টারের নামে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮০২ টাকা বিল করা হয়। পরে ১৮ ডিসেম্বর পাঁচটি কম্পিউটার কেনার নামে আরও ৪ লাখ ৭১ হাজার ৭৫০ টাকা বিল করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, একই চালানের কম্পিউটার দুই দফায় বিল করা হয়েছে। বিষয়টি যাচাইয়ে ক্রয়াদেশ, চালান, স্টক রেজিস্টার ও সরবরাহকারীর হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

পৌরসভায় টিকাদান কর্মসূচি না থাকলেও টিকাদান কর্মীসহ বিভিন্ন পদে প্রায় ১২ থেকে ১৫ জনকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব নিয়োগের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা বাণিজ্যের দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তবে নিয়োগগুলোর বৈধতা, অনুমোদিত পদ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া যাচাই ছাড়া এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

পৌরবাসীর অভিযোগ, প্রায় ৭০ ভাগ এলাকায় পাকা রাস্তা, ড্রেন ও রোড লাইট নেই। ৪০ ভাগ এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছায়নি। শিশুদের জন্য নেই বিনোদনের ব্যবস্থা বা পার্ক। পানি সরবরাহ না থাকলেও কিছু পরিবারের কাছ থেকে মাসিক পানি বিল নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অথচ পৌরবাসীদের প্রথম শ্রেণির পৌরকর দিতে হচ্ছে।

কেশবপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী নুরে আলম জানান, তিনি যোগদানের আগে যেসব অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেই। বর্তমানে নির্মাণকাজে অনিয়ম হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি সবেমাত্র কেশবপুরে যোগদান করেছি। আগের প্রশাসকের সময়ের কাজের বিষয়ে তিনি বলতে পারবেন। বর্তমানে চলমান কোনো কাজে দুর্নীতি হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পৌরবাসী ও সম্মিলিত নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা কেশবপুর পৌরসভার গত ১৭ বছরের আয়-ব্যয়, নিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প, রাজস্ব ও এডিবি খাতের ব্যয় এবং বিভিন্ন বিল-ভাউচার তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

শেয়ার করুনঃ