দেশে মূল্যস্ফীতি কমানোর পথে নতুন করে ঝুঁকি দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে আগামী দিনগুলোতে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটি (এমপিসি)। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতির গতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর সাম্প্রতিক দেশীয় ও বৈশ্বিক অভিঘাতের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছে কমিটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম এমপিসি সভায় নীতিসুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী হলেও তা এখনো সরকারের নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। ফলে এখনই নীতিসুদে পরিবর্তন না এনে সাম্প্রতিক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এমপিসি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, আগস্টে দেশে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। জুলাইয়ে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমেছে। আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে দাঁড়ালেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।
তবে মূল্যস্ফীতির বার্ষিক হার কিছুটা কমলেও মানুষের ব্যয়ের চাপ যে কমেনি, তা মাসভিত্তিক মূল্যসূচকেও প্রতিফলিত হয়েছে। আগস্টে মাসিক ভিত্তিতে সাধারণ মূল্যসূচক ২ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেড়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ বাজারে পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং আগের বছরের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে।
এর মধ্যেই ২১ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন দরে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে।
জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিবহন খরচে। এরই মধ্যে বেনাপোল স্থলবন্দরে বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া বাড়ার খবর পাওয়া গেছে। জ্বালানি খরচ বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব পণ্য পরিবহন, কৃষিপণ্য, শিল্প উৎপাদন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এমপিসিও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাকে মূল্যস্ফীতির অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে আমদানি ব্যয় ও উৎপাদন খরচে তার প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অন্যদিকে সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেলও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে এমপিসি। ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছে। এর আওতায় সরকারি চাকরির সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হয়ে ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যকে সামনে রেখে মুদ্রানীতি পরিচালনা করছে। জুলাইয়ে প্রায় দুই বছর পর নীতিসুদহার ১০ শতাংশ থেকে ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছিল। ২ আগস্ট থেকে নতুন হার কার্যকর হয়। তবে সেপ্টেম্বরের এমপিসি সভায় নতুন করে কোনো পরিবর্তন না এনে বর্তমান হারই বহাল রাখা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের মুদ্রানীতি বিবৃতিতেও মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে জ্বালানি সরবরাহ, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, আমদানি ব্যয় ও সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতাকে ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সরবরাহব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যা ও ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতি শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করার মাধ্যমে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সচল রাখার ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নীতিসুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহে চাপ তৈরি হতে পারে; আবার জ্বালানি ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে শুধু সুদের হার দিয়ে সেই ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। তাই সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তনের বদলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পথ নিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টিতে এখন মূল প্রশ্ন হলো—জ্বালানি তেলের বাড়তি খরচ কতটা দ্রুত পরিবহন ও উৎপাদন খাতে ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন বেতন কাঠামোর বাড়তি চাহিদা বাজারে কী ধরনের প্রভাব ফেলে। আগামী কয়েক মাসের মূল্যসূচকে এসব পদক্ষেপের প্রভাব স্পষ্ট হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পরবর্তী নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।


























