রোববার ০৮ নভেম্বর ২০২৬

২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সীমান্তে পুশ-ইন ঘিরে মুক্তিপণ সিন্ডিকেট

রানার প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২:৩২, ৭ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ২২:৩৪, ৭ নভেম্বর ২০২৬

সীমান্তে পুশ-ইন ঘিরে মুক্তিপণ সিন্ডিকেট

বৃহস্পতিবার রাতে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশ-ইনের শিকার হন একই পরিবারের পাঁচ সদস্য। তাঁদের মধ্যে ছিল অসুস্থ শিশুকন্যাও। কিন্তু বাংলাদেশে প্রবেশের পরই পরিবারটি পড়ে একটি মুক্তিপণ চক্রের কবলে। আশ্রয় দেওয়ার কথা বলে তাদের জিম্মি করে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অপারগতা জানালে মা-বাবার কাছ থেকে অসুস্থ শিশুটিকে আলাদা করে অন্য কক্ষে নিয়ে যায় সিন্ডিকেট সদস্যরা। শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেতে পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে বিকাশ ও নগদে এক লাখ টাকা আনতে বাধ্য হন তারা ।

এভাবে সীমান্তজুড়ে একাধিক মুক্তিপণ সিন্ডিকেট ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে পুশ-ইন শিকার ভুক্তভোগীদের জিম্নি করে টাকা আদায় করছে। 

জানা যায়, বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে একই পরিবারের দুই পুরুষ, দুই নারী ও এক শিশুকে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার বাঘাডাঙ্গা-খোসালপুর সীমান্ত দিয়ে পুশইন করে। নিজ দেশের মাটিতে পা দিতেই সীমান্ত গ্রামে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কবলে পড়েন তারা। প্রথমে বাঘাডাঙ্গা গ্রামের জনৈক বাবু তাদেরকে আশ্রয় দেওয়ার নামে একটি বাড়িতে রাখেন এবং সীমান্ত গ্রাম পার করিয়ে যানবাহনে উঠিয়ে দিবেন জানিয়ে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। এরপর ওই রাতেই ওই চক্রের সদস্য সীমান্ত গ্রামের বাসিন্দা বাপ্পী, ইউসুফ, নাজমুল, টিটুসহ কয়েকজন মিলে দেশে ফেরা ওই পরিবারটিকে জিম্মি করে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। এমনকি টাকা নেই বা পারিবারিকভাবে এতো টাকা জোগান দেওয়ার সামর্থ নেই জানালে তারা ছোট অসুস্থ শিশু বাচ্চাকে তার মা-বাবার কাছ থেকে পৃথক করে অন্যরুমে আটকে রাখেন। এসময় শিশুটির বাবা রিপন হোসেনকে মারধর করে ভীতি সৃষ্টি করেন।

একপর্যায়ে রিপন হোসেনের কাছ থেকে তাঁর বাড়ির মোবাইল নম্বর নিয়ে মুক্তিপণ আদায়কারী দলের সদস্যদের ০১৮৬৬-৬২৬২৩৯ নম্বর থেকে ফোন করে ভয়ভীতি সৃষ্টি করা হয়। একপর্যায়ে শুক্রবার দুপুরে রিপন হোসেন পরিবারকে বর্নণা দিয়ে বলেন- শিশু মেয়ে অসুস্থ, তারপরও বাচ্চাটিকে তারা (মুক্তিপণ দাবিকারীরা) মা-বাবার কাছ থেকে সরিয়ে অন্যত্র রেখেছেন। এতে নিরুপায় হয়ে চক্রের সদস্যদের দেওয়া ০১৩৫১-৩৮৬৭১৭ নম্বর বিকাশে ৫০ হাজার এবং ০১৩২৮-৭৭০০৪৩ নম্বর নগদ একাউন্টে ৫০ হাজার টাকা পাঠাতে বাধ্য করা হয়। একইসাথে এই খবর বাইরে প্রচার করলে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চক্রের সবগুলো মোবাইল বন্ধ করে রাখা হয়। তবে সুত্রগুলো নিশ্চিত করেছে- শুক্রবার রাত ১টার দিকে আটক পরিবারটি খুলনার বাড়িতে পৌঁছেছে। 

সূত্রে জানা গেছে, কাজের সন্ধানে কয়েক বছর আগে স্বপরিবারে ভারতে পাড়ি দিয়েছিলেন খুলনার খালিশপুর এলাকার রিপন হোসেন। তবে গত ৪ নভেম্বর ভারতের নদীয়া জেলার হাঁসখালী থানা এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) রামনগর ক্যাম্প সদস্যদের হাতে ধরা পড়েন। এ সময় সাথে ছিলেন- তাঁর স্ত্রী নিশি খাতুন, তাদের শিশু মেয়ে মারিয়া এবং খালা শাশুড়ি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বেতমর গ্রামের মাকছুদা বেগম ও তার ছেলে রাজু। পরদিন ৫ নভেম্বর দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাংলাদেশের ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার সীমান্তে পুশইন করা হয়। 

এরআগে গত ২ সেপ্টেম্বর একই সীমান্তের বাঘাডাঙ্গা গ্রামের রবিউল ইসলামের ছেলে মেহেদী তার ০১৮৩৫-২৪১৩৭৯ নম্বর থেকে ফোন করে ঢাকার এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১০ হাজার ২০০ টাকা নেন।

এ বিষয়ে মহেশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান ‘দৈনিক রানারকে’ বলেন, ‘সীমান্তে পুশ-ইন বা এসংক্রান্ত বিষয়গুলো বিজিবি সদস্যরা দেখভাল করেন। তবে মুক্তিপণ আদায়ের মতো ঘটনা পুলিশের কাছে কেউ অভিযোগ করেননি বা নজরে আসেনি। যেহেতু আপনার (সাংবাদিক) কাছ থেকে জানলাম এ ব্যাপারে আমরা খোঁজ-খবর নিয়ে আইনের আওতায় আনব।’

এ বিষয়ে স্থানীয় বাঘাডাঙ্গা বিওপি’র কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার ওমর আলী বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বিএসএফের মাধ্যমে কোন পুশ-ইনের খবর পাইনি।’
পুশ-ইনের পরে মুক্তিপণ আদায় বিষয়ক এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, এমন কোন খবর তাদের কাছে সরাসরি কিংবা গোয়েন্দা তথ্যে আসেনি। তবে বিষয়গুলো নিয়ে তিনি খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। 

তিনি আরও বলেন, ‘এ অঞ্চলে একাধিক সীমান্ত, সীমান্তে ইতোপূর্বে মানব পাচার ও মাদক ঘিরে নানা ধরণের অভিযোগ ছিলো। তবে সকল অপতৎপরতা শূণ্যের কোটায় নামাতে বিজিবি সদস্যরা জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে।’

সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, চোরাইভাবে নদীপথে মালয়েশিয়া-ইতালী-লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যাওয়ার পথে দালালরা বাংলাদেশীদের এমনভাবেই আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের কথা শোনা যায়। তবে নিজ দেশেই দেশের মানুষকে জিম্মি করে মুক্তিপণের মতো ঘটনা খুবই উদ্বেগের। এমন ভয়াবহ অপকর্মের সাথে জড়িতেদের এখনই আইনের আওতায় আনা উচিত। যেহেতু চক্রের সদস্যদের মোবাইল নম্বর এবং যেসব বিকাশ-নগদ নম্বরে মুক্তিপণের টাকা নেওয়া হয়েছে সেই সূত্র ধরে দ্রুতই অভিযক্তদের আইনের আওয়তায় আনা সম্ভব। 
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: