৪ এপ্রিল রোববার ১৯৭১। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যশোর শহরের ঐতিহাসিক শোকাবহ এক অবিস্মরণীয় দিন।
এদিন এলেই স্বজন হারানোর বেদনায় অনেকেই ডুকরে কেঁদে ওঠেন অনেকেই। অনেকেই নীরবে চোখের পানি ফেলেন। এ দিনেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যশোরের পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেয় মুক্তিপাগল মানুষদের কাছ থেকে। হানাদার বাহিনী চালায় ব্যাপক গণহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ আর ধ্বংসযজ্ঞ।
সেদিন ছিল রোববার। সকাল ৬টায় পাকিস্তানি বর্বর হানাদার বাহিনী যশোর সেনানিবাস থেকে, ধর্মতলা, খোলাডাঙ্গা, খড়কি পার হয়ে চাঁচড়া, মাইকেল মধুসূদন কলেজের সামনে রেল লাইনের উপর দিয়ে এবং আরবপুর মোড় ও পালবাড়ি এলাকা দিয়ে শহরে প্রবেশ করে। পাকিস্তানি সেনাদের সাঁড়াশি আক্রমণে এবং অত্যাধুনিক রকেট লাঞ্চার, কামান, এইচএমজি অস্ত্রের মুখে সাধারণ ৩০৩ রাইফেল আর এসএমজি অস্ত্রে সজ্জিত তৎকালীন ইপিআর, পুলিশ, আনসার ও মুক্তিযোদ্ধারা টিকতে না পেরে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সরে যায়।
৩ এপ্রিল সন্ধ্যার আগে আমরা যশোর শহরে ছাত্রলীগের সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএসসির ছাত্র এমএ জিন্নাহ যশোর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র, ছাত্রলীগ নেতা মো. মোছাদ্দেক, মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের কমার্সের অধ্যাপক সিরাজ উদ্দিন আহমদ, ইপিআরটিসির সুপার আব্দুল মান্নান-যশোর জেলা স্কুলের সামনে, তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের হেড কোয়ার্টারস থেকে একটি সাধারণ ভ্যান গাড়িতে করে কামানের গোলা, গ্রেনেড, কয়েক বাক্স গুলি এবং খাবার পানি ও রুটি নিয়ে যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজের সামনের রেল লাইনের উপর ইপিআর, পুলিশ, আনসার বাহিনীর সম্মিলিত মুক্তি বাহিনীর কয়েকটি বাংকারে পৌঁছে দিয়ে আসি। তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সামনাসামনি প্রচণ্ড গোলাগুলি চলছিল।
সন্ধ্যার পর আমরা ইপিআরের হেড কোয়ার্টারের পাশেই ষষ্টিতলা পাড়ার তৎকালীন শহর ছাত্রলীগের সভাপতি এমএ জিন্নাহর বাড়িতে বিশ্রামের জন্যে ফিরে আসি। সেখানে তখন জিন্নাহর বাবা অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি কালেক্টর মো. রহমতউল্লাহ সাহেব, তার পুত্রদ্বয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএসসির ছাত্র এমএ জিন্নাহ, যশোর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র মো. মোছাদ্দেক, মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের কমার্সের অধ্যাপক সিরাজ উদ্দিন আহমেদ ও তার স্ত্রী, শিশু পুত্র ও কন্যা ইস্ট পাকিস্তান রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনের সুপার আব্দুল মান্নান ও তার স্ত্রী, শিশু পুত্র ও কন্যা, রহমত উল্লাহ সাহেবের ব্যক্তিগত কর্মচারী পঞ্চাশোর্ধ্ব লালু মিয়া, গৃহপরিচারিকা আলেয়া বেগম, একজন নাম না জানা রিকশা চালক, চারজন ইপিআর, চারজন আনসার সদস্য (সশস্ত্র অবস্থায়) এবং আমি অবস্থান করছিলাম। রাত আনুমানিক তিনটার পর যশোর সেনানিবাস এলাকা থেকে শহরের বিভিন্ন জায়গায় এবং ইপিআর হেড কোয়ার্টারের উপর ও আশেপাশের আমাদের অবস্থানের উপর প্রচণ্ড রকমের রকেট লাঞ্চার ও গোলাবর্ষণ হতে থাকে। ভারি কামানের গোলা ও (এইচএমজি) মেশিন গানের গুলিতে শহর ভূমিকম্পের মত কেঁপে কেঁপে ওঠে। মনে হয় সারা রাতে চার/ পাঁচশত রকেট লাঞ্চার ও কামানের গোলা শহরের বিভিন্ন স্থানে ও এলাকায় আঘাত হানে। সাথে সাথে মেশিন গানের এবং অন্যান্য ভারি অস্ত্রের গোলা গুলি ও বর্ষণ হতে থাকে বৃষ্টির মত, ফলে ছোট ছোট বাজার ও বড় বাজার, রাস্তার আশে পাশের দোকান পাট এবং বিভিন্ন ভবনেও বস্তি এলাকায় আগুন ধরে যায়। সেদিন রাতে এক তরফা হামলা চলেছিল। শহর থেকে পালটা কোনো গুলির শব্দ শোনা যায়নি। প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে আমরা একবার শহর থেকে বাইরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলাম। কারণ, শহর ছিল অন্ধকারে ঢাকা। কিছুই দেখা যাচ্ছিল না, তারপর বোঝা যাচ্ছিল না শত্রু- মিত্রের অবস্থান। ভোর রাতে আমাদের অবস্থানের উপর পরপর দুটি শক্তিশালী কামানের গোলা এসে পড়ে। এবং বাড়ির আঙ্গিনার একটি অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। আগুন ধরে যায়। অতিকষ্টে আমরা সকলে মিলে আগুন নিভিয়ে ফেলি এবং আত্মরক্ষার্থে বাড়ির ভেতরের উঠোনের পাশে বড় পরিখার (ট্রেঞ্চ) মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করি।
৪ এপ্রিল ভোর ছয়টায় অকস্মাৎ গোলাগুলি বন্ধ হয়ে যায়। পূর্ব আকাশ পরিষ্কার হয়ে এসেছে। আমরা তখন বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। অধ্যাপক সিরাজ সাহেব আমাকে আর মোছাদ্দেককে বাইরের অবস্থা জানার জন্য বলেন। আমি আর মোছাদ্দেক বাড়ির সামনের বড় রাস্তায় (বর্তমান মুজিব সড়ক) আসার সাথে সাথে আমাদেরকে লক্ষ্য করে পাকিস্তানি সেনারা মেশিনগানের গুলিবর্ষণ করে, রাস্তার অপর পার থেকে তখন দুইজন ইপিআর ও দুইজন সাধারণ মানুষ রাস্তা পার হচ্ছিল, পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে একজন ইপিআর ও একজন মুক্তিযোদ্ধা ঝাঁজরা হয়ে রাস্তার উপর পড়ে যায়। অল্পের জন্যে আমরা রক্ষা পেয়ে যাই। সেখান থেকে দৌড়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করি। বাড়ির দোতলা ঘরের জানালা দিয়ে লক্ষ্য করলাম শত শত পাকি সেনারা চারিদিক ঘিরে ফেলেছে। আমরা তখন নিশ্চিত হয়ে গেলাম মৃত্যু আমাদের অনিবার্য। বাড়ির উপর তলায় নারী ও শিশুদেরকে থাকতে বলা হলো। নিচের ঘরগুলোয় আমরা সকলে একসাথে বসে মহান আল্লাহ তালাকে স্মরণ করতে লাগলাম। ডেপুটি কালেক্টর (অব.) রহমত উল্লাহ সাহেব, অধ্যাপক সিরাজ সাহেব এবং সুপার আব্দুল মান্নান সাহেব ওজু করে পাক পবিত্র হয়ে সকলকে তওবা পড়ালেন এবং পাক কোরান তেলাওয়াত করতে লাগলেন। মাঝে মধ্যেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় এইচএমজি মেশিন গান ও কামানের গোলাগুলির আওয়াজ ভেসে আসছিল। কিছুক্ষণ পর পর বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে ট্রাকে ভর্তি অবাঙালি বিহারী ও পাকিস্তানি সেনাদের ট্রাক মিছিল যাওয়া আসা করছিল। মিছিলকারীরা সমস্বরে নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবর, পাকিস্তান জিন্দাবাদ, কায়েদে আজম জিন্দাবাদ আওয়াজ তুলে স্লোগান দিচ্ছিল এবং রাইফেল ও মেশিন গানের দ্বারা রাস্তার পাশের ভবন লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালাচ্ছিল। আমাদের অবস্থানের আশেপাশের বেশ কয়েকটি ভবন থেকে মুক্তিযোদ্ধারা বীর বিক্রমে পাকিস্তানি সেনাদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করলে বেশ কিছু পাকি সেনা হতাহত হয়।
মুজিব সড়কের পাশে অ্যাডভোকেট সামছুর রহমানের বাড়ি থেকে চার/পাঁচ জন মুক্তিযোদ্ধা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে রাস্তার উপর পাকি সেনাদের লক্ষ্য করে রাইফেল ও মেশিন গানের ব্রাশ ফায়ার করতে করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিবর্ষণে বেশকিছু পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়, এক পর্যায়ে তাদের সাথে রাস্তার উপর হাতাহাতি যুদ্ধ হয়। হাতাহাতি যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সকলেই নিহত হয়। পাকিস্তানি সেনারা ও তাদের সহযোগী অবাঙালি বিহারিরা তলোয়ার ও মাংস কাটার দা, কুড়াল-চাপড় নিয়ে বিভিন্ন বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে নিরীহ সাধারণ বাঙালিদের হত্যা করতে থাকে। তারা বাড়ি ঘর এবং দোকান পাট লুটতরাজ করে এবং পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
আমাদের বাড়ির ভেতরে অবস্থানরত চারজন ইপিআর ও আনসার সদস্যরা একবার পাকি সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কথা ভেবে ছিলেন। কিন্তু একজন বয়স্ক সিনিয়র ইপিআর প্রতিরোধ করতে নিষেধ করলেন। কারণ, শত শত পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে এবং মর্টার, রকেট লাঞ্চার, কামান, ট্যাংক-এবং ভারী মেশিন গানের সামনে সাধারণ রাইফেল দিয়ে প্রতিরোধ করা আর আত্মহত্যা করা সমান কথা। তা ছাড়া বাড়ির মধ্যে সাধারণ মানুষ ও নারী এবং শিশুরা রয়েছে। তাদের সকলের নিরাপত্তার কথা ভেবেই তিনি আত্মসমর্পণ করার কথা বলেছেন এবং এক পর্যায়ে বাড়ির পেছন দিক থেকে বাইরে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা দিলেন চারজন ইপিআর ও চারজন আনসার সদস্য, তারা আমাদেরকে বলে গিয়েছিলেন, আপনারা সাধারণ মানুষ, পাকি সেনারা হয়ত আপনাদেরকে কিছু বলবেনা, আমরা বাঙালি সেনা আমাদের সাথে সশস্ত্র অবস্থায় আপনাদেরকে পেলে সকলকেই হত্যা করবে। তাই আমরা বাড়ির পেছন দিক দিয়ে চলে যাই।
ওই চারজন ইপিআর ও চারজন আনসার সদস্য আত্মসমর্পণের সাথে সাথে পাকিস্তানি সেনারা তাদের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে মুজিব সড়কের উপর লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে ভারি মেশিন গান দিয়ে পাকি সেনারা তাদেরকে মুহূর্তের মধ্যে গুলি করে হত্যা করে।
সেদিন ভোর রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যশোর সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে খোলাডাঙ্গা ও খড়কির মধ্য দিয়ে মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের সামনের রেল লাইনের পাশ দিয়ে এবং আরবপুর ধর্মতলা হয়ে বিমান বন্দর সড়ক দিয়ে ও পালবাড়ি এলাকা থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়ে যশোর শহরে অনুপ্রবেশ করে। তারা শহর ঘিরে ফেলে নির্বিচারে নারী, পুরুষ ও শিশুদেরকে হত্যা করতে থাকে। পাকি সেনাদের সাঁড়াশি আক্রমণে ও তাদের অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের সামনে সাধারণ অস্ত্রে সজ্জিত ইপিআর, পুলিশ, আনসার ও মুক্তিবাহিনীর সম্মিলিত শক্তি টিকতে না পেরে পিছু হটে নিরাপদ আশ্রয়ে, বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে নড়াইল, কেশবপুর এবং ভারতের সীমান্তে বেনাপোল এলাকায় অবস্থান গ্রহণ করে। সকাল নয়টায় পাকিস্তানি হানাদাররা অবরুদ্ধ যশোর শহরে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। আমরা প্রায় তিন শত জনের একটি মুক্তিযোদ্ধা টিম যশোর জিলা স্কুলের সামনে ইপিআর সাব হেড কোয়ার্টারের আশেপাশের বিভিন্ন বাড়িতে অবস্থান করছিলাম। ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) পুলিশ, আনসার এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত ছিল সেই টিম।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বর্তমান মুজিব সড়ক, রেল স্টেশনসহ চাঁচড়া এলাকা, সার্কিট হাউজ, মাইকেল মধুসূদন কলেজ, ষষ্টিতলা পাড়া, খড়কি এলাকা, প্রধান ডাকঘর, পোস্ট অফিস পাড়া, টাউন হল, জেলা পরিষদ, কালেক্টরেট ভবন, দড়াটানা, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও চৌরাস্তা, সদর হাসপাতাল, জেলখানা, কোতয়ালী থানা এলাকা ঘিরে ফেলে।
প্রথমেই তারা ভোলা ট্যাংক রোডের ইপিআর হেড কোয়ার্টার ও উইং কমান্ডারের কোয়ার্টার আক্রমণ করে, মর্টার ও রকেট সেল নিক্ষেপ করে ধ্বংস করে দেয়। তার পর পরই আক্রমণ করে ডেপুটি কালেক্টরের (অব.) রহমত উল্লাহ সাহেবের বাড়িতে আমাদের অবস্থানের উপর। বাড়ির মধ্য থেকে রহমত উল্লাহ সাহেব ও তার পুত্রদ্বয় যশোর শহর ছাত্র লীগের সভাপতি এম, এ জিন্নাহ ও মো. মোছাদ্দেক, মাইকেল মধুসূদন কলেজের অধ্যাপক সিরাজ উদ্দিন আহমেদ, ইপিআরটিসির সুপার আব্দুল মান্নান সাহেবকে বাড়ির দরজা ভেঙে বাইরে নিয়ে গিয়ে বাড়ির সামনের রাস্তার পাশে খোলা মাঠে লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে মেশিন গানের ব্রাশ ফায়ারে নিমিষের মধ্যে হত্যা করে। শহর ছাত্র লীগের সভাপতি এমএ জিন্নাহকে প্রথমে বেয়নেট চার্জ করে তার পর ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে। ওই সময়ে আমি, মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞের শিকার জিন্নাহর বাড়িতে অধ্যাপক সিরাজ উদ্দিনের স্ত্রী, শিশু- পুত্র-কন্যা এবং সুপার আব্দুল মান্নানের স্ত্রী, শিশু-পুত্র-কন্যাদের সাথে দোতলায় অবস্থান করছিলাম। সকলেই ভয়ে ভীতি, নীরব, নিথর, নির্বাক, নিশ্চুপ। কান্না-কাটি করে শোক ব্যক্ত করার সাহস ও যেন কারো নেই। নীরবে অশ্রু ঝরে পড়ছে স্বজন হারানোর কষ্টে এবং ভয়ে। দুইজন পাকি সেনা ভয়ংকর রূপে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে দোতলায় উঠে আসে। আমার দিকে অস্ত্র তাক করে আমাকে নিচে নামতে নির্দেশ দেয়। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না কী করবো। ‘নিশ্চিত মরতে হচ্ছে’ একথা জেনে নিজের অজান্তেই আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। দুবার আমাকে নিচে নামতে বলার পর, একজন খান সেনা আমাকে প্রচণ্ড বুটের লাথি মারে। আমি ছিটকে সিঁড়ির ঘরের নিচে পড়ে যাই। আমার হাত-পা জখম হয় এবং মাথা ফেটে যায়, রাইফেলের বাটের আঘাতে আমার মুখের সামনের একটি দাঁত ভেঙে যায়। কোথায় কতটা ব্যথা পেয়েছিলাম, মৃত্যু ভয়ে তার অনুভূতি শক্তি আমার তখন ছিল না।
এরপর পাকিস্তানি সেনারা নিচে নেমে আসে এবং জেরিকেন থেকে পেট্রোল ঢেলে দিয়ে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। এবং বাড়ির ভিতরের দিকে আনাচে-কানাচে তল্লাশি করতে থাকে। আমাকে পুনরায় অস্ত্রের মুখে বাইরে নিয়ে আসে। বাড়ির উঠোনের পাশে রান্না ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কর্মচারী লালু মিয়াকে রান্না ঘরের মধ্যেই গুলি করে হত্যা করে। বাথরুমে লুকিয়ে থাকা রিকশা চালককেও একইভাবে এলএমজির ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে। এরপর আমাকে বাড়ির বাইরে নিয়ে এসে উর্দুতে জিজ্ঞাসা করে জানতে চায়। বাড়িতে আর কেউ আছেন কিনা? আমি ভাঙা ভাঙা উর্দুতে জবাব দিলাম আমি জানি না। বাড়ির বাইরে পনেরো/বিশ জন অবাঙালি বিহারী তলোয়ার, রামদা, বঁটি ও মাংস কাটার চাপড় হাতে লুটপাটে ব্যস্ত ছিল। বিহারিরা নিহত বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের হাত থেকে দামি ঘড়ি, গলার সোনার চেইন, সোনার আংটি খুলে খুলে আত্মসাৎ করছিল। এমন সময় দুইজন বিহারী তলোয়ার হাতে আমাকে হত্যা করার জন্য মারমুখী হয়ে ছুটে আসে, সেখানে যশোর শহরের নামকরা গুন্ডা হানিফ ও টেনিয়ার ছোট ভাই অবাঙালি হাবিব ও সাঈদ অন্যান্য বিহারির কবল থেকে আমাকে রক্ষা করে। বিহারী সাঈদ ইপিআরের ওয়্যারলেস ইনচার্জ ছিলেন এবং শহর ছাত্রলীগের সভাপতি জিন্নাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। অনেক আগে থেকেই বিহারী টেনিয়া, হাবিব ও সাঈদের সাথে আমার পরিচয় ছিল, মুক্তিযুদ্ধের আগে যশোর ঈদগাহে আমি- জিন্নাহ, মোছাদ্দেক, সাঈদ একসাথে ক্রিকেট খেলতাম। সেই সূত্রে সাঈদ বিহারিদের কবল থেকে আমাকে রক্ষা করে।
সে সময় যশোরের প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী শাহ মোহাম্মদ মোর্শেদের বাড়িতে ভারি কামানের গোলাবর্ষণ করে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। পাক সেনারা জিন্নাহ- মোছাদ্দেকদের বাড়ির সামনে ষষ্টিতলা পাড়ার ডা. নাসির সাহেবের বাড়িতে হামলা চালায়। ডা. নাসিরের বাড়িতে অবস্থানরত চারজন ইপিআর সেনা বীর বিক্রমে পাকিস্তানি সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি চালালে কয়েকজন পাকি সেনা নিহত হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাকি সেনারা ডাক্তার নাসিরের বাড়িতে প্রবলভাবে ভারী কামানের গোলাবর্ষণ করে। কামানের গোলায় নাসিরের স্ত্রী মারাত্মক আহত হন। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রাণ ত্যাগ করেন। ডাক্তার নাসিরের সমগ্র বাড়িতে আগুন ধরে যায় মুহূর্তের মধ্যে। পাকি সেনা বাড়িটিকে ঘিরে ফেলে এবং দখল করে নেয়। তারা ডা. নাসির এবং ওই বাড়িতে অবস্থানরত দুইজন ইপিআর সেনাকে ব্রাশ ফায়ার করে তাদের সকলের লাশ বাড়ির জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করে, লাশ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেদিন সেখান থেকে ডা. নাসিরের স্কুলে পড়ুয়া কন্যা শাহিদা বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে পালাতে সক্ষম হন। ওইদিন পাকি সেনাদের বিভিন্ন দল বিচ্ছিন্ন ভাবে শহরের নানা অঞ্চলে হামলা অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন এবং গণহত্যা চালায়, সেদিন শহরের আশি ভাগ বাড়িতে পাকি সেনারা আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
যশোর সিটি ছাত্রলীগ সভাপতি জিন্নাহ, মোছাদ্দেকদের বাড়ি থেকে আমাকে হানাদার সেনারা ধরে পর হত্যা করার জন্য মুজিব সড়কের উপর দাঁড় করায়। আমি বুঝতে পারলাম আমার অন্তিম সময় এসেছে। সেই মুহূর্তের অনুভূতি প্রকাশ মত ভাষা আমার জানা নেই।
আমি আমার সামনের অস্ত্রধারী পাকি সেনাদের দিকে অপলক তাকিয়েছিলাম এবং মনে মনে মহান আল্লাহকে স্মরণ করছিলাম, এসময় পলকের মধ্যে একটি জিপগাড়ি এসে আমার পাশে গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। গাড়ি থেকে নেমে এল পাক সেনাদের অপারেশন কমান্ডার তোফায়েল বাট। সাথে হ্যান্ড ওয়্যারলেস এবং হাতে হালকা মেশিনগান। কর্নেল তোফায়েল বাট উপস্থিত হতেই পাক সেনাদের সকলে স্যালুট দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, এবং আমার বুকের দিক থেকে অস্ত্রের ব্যারেল তাক করতে নিষেধ করলো।
সেখানে একটি ভ্যানে ট্রাকে পাঁচ/সাতজন আহত মুক্তিযোদ্ধাদেরকে বন্দী অবস্থায় নিয়ে আসে। আমাকে সেই ভ্যান-ট্রাকে তুলে নিয়ে কয়েকজন পাকি সেনা ভ্যান ট্রাকটি সামরিক জান্তাদের হেড কোয়ার্টার সার্কিট হাউজে নিয়ে যায়।
সার্কিট হাউজের মেইন গেইট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার সময় দেখলাম রাস্তার অপর পারে চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী সুচন্দা/ ববিতাদের পৈতৃক বাড়ির সামনে ৮/১০টি মানুষের মৃতদেহ বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে। বাড়িটির পাশের গলির মধ্যে দুটি কুকুর ভীষণভাবে তাদের স্বরে চিৎকার করছিল। সেখানে তখন পাঁচ/ছয়জন পাকি সেনা ও পাঁচ/ছয়জন অবাঙালি বিহারিরা বিভিন্ন বাড়িতে লুটতরাজ করছিল এবং বাঙালিদের অধিকাংশ বাড়ি ঘরে ও রাস্তার ধারের দোকান পাটে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। ববিতার চাচা অ্যাডভোকেট নুরুদ্দিন সাহেবের বাড়ির গলির মধ্যের দুটি কুকুরের চিৎকারে অতিষ্ঠ হয়ে একজন পাকি সেনা হালকা গানের ব্রাশ ফায়ারে কুকুর দুটিকে হত্যা করে।
সেদিন পাকি হানাদার বাহিনী যশোর শহরের কয়েক শত নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এমনকি কিশোর-কিশোরী ও শিশুদেরকে হত্যা করে তাদের মরদেহ পুলের হাট মুক্তেশ্বরী নদীর ব্রিজের নিচে ফেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
পাকি হানাদার বাহিনীর একটি গ্রুপ আমাকে সার্কিট হাউজের একটি ছোট্ট ঘরে আটক করে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে। ৩ এপ্রিল এবং ৪ এপ্রিল ভোর রাতে ইপিআর সাব হেড কোয়ার্টার ও তার আশেপাশের অঞ্চলে যে সমস্ত ইপিআর সেনা, পুলিশ ও আনসার এবং মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করতে করতে নিরাপদে সরে গেছে, তারা কোনদিকে গেছে, কোথায় গেছে তার সন্ধান জানতে চায়। আমি জানি না বলাতে একজন পাকি সেনা বুটের প্রচণ্ড লাথি মেরে এবং রাইফেলের বাটের প্রচণ্ড আঘাতে আঘাতে আমার হাতের তালু ও কব্জি ভেঙে গুড়িয়ে দেয়। অন্য একজন পাকিসেনা আমার ঊরুতে বেয়নেট চার্জ করে এবং রাইফেলের বাট দিয়ে পায়ের তলায় ও হাঁটুর নিচে মারতে মারতে আমার হাত পা থ্যাঁতলে দেয়। বারবার চড়-থাপ্পড় ও রাইফেলের বাটের আঘাতে আঘাতে আমার হাত পা দুমড়ে মুচড়ে দেয় এবং উর্দুতে জঘন্য গালি-গালাজ করে। বুটের লাথি ও রাইফেলের বাটের আঘাতে আঘাতে আমি এক পর্যায়ে জ্ঞান হারাই।
পাকিস্তানি বর্বর জল্লাদ সেনারা যশোর সার্কিট হাউজের সামনের ঘরে দশ/পনেরোজন সম্মুখ যুদ্ধে বন্দি মারাত্মক আহত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যশোর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র সৈয়দ নুরুল ইসলাম বকুল, সৈয়দ আজিজুল হক মুকুল, সৈয়দ শফিকুর রহমান জাহাঙ্গীর, রেলস্টেশনের পাশের তুলোতলার ছাত্রলীগ নেতা নাসিরুল আজিজ অপু, পোস্ট অফিস পাড়ার ছবেদ আলী সহ আরো অনেক বন্দি মুক্তিযোদ্ধাদের কে রাইফেলের বাট দিয়ে মারতে মারতে অমানুষিক নির্যাতনের এক পর্যায়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। যখন আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতন করছিল তখন বিভিন্ন ঘর ও বারান্দা থেকে মেয়েদের আর্ত চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। মাঝে মধ্যে খোলা দরজা ও জানালা দিয়ে দেখেছিলাম পনেরো/বিশ জন মহিলা ও কিশোরীদেরকে উলঙ্গ অবস্থায় সার্কিট হাউজের বিভিন্ন ঘরে, বারান্দায় ও ফুলবাগানে বর্বর পাকিস্তানি হায়েনারা গণহারে ধর্ষণ করছে। ওই সব মেয়েদের মধ্যে দশ/বারো বছরের কিশোরীও ছিল, যশোর শহর ও শহরতলি থেকে বন্দি করে নিয়ে এসেছিল মেয়েদেরকে। তার মধ্যে অল্প বয়সের অনেক মেয়ে পাকিস্তানি হায়েনাদের গণধর্ষণে মৃত্যুবরণ করে।
মনে হয় দুপুর একটা/ দুটো বাজে। হঠাৎ আমার হাতে পায়ে জ্বলন্ত আগুনের আঁচে আমার জ্ঞান ফিরে আসে। যশোর সার্কিট হাউজ ভবনের দক্ষিণ পাশের ফুলবাগানে তিন/চারটা বড় বড় ট্রেঞ্চ খোঁচা ছিল। সেই বাংকারের গর্তের মধ্যে কমপক্ষে তিরিশ/চল্লিশটা নারী পুরুষ কিশোর কিশোরীর মৃতদেহের মধ্যে আমি নিজেকে আবিষ্কার করি। অসভ্য জল্লাদ পাকিস্তানি সেনারা সম্মুখ যুদ্ধে মারাত্মক আহত বন্দি মুক্তিকামী বাঙালি ও মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অমানুষিক নির্যাতন করে হত্যার পর ট্রেঞ্চের মধ্যে মৃত লাশগুলো ফেলে দিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলো, তার মধ্যে মৃত দশ/বারো বছরের উলঙ্গ কিশোরী মেয়েরাও ছিল, যাদেরকে বর্বর পশুরা গণধর্ষণ করে মেরে ফেলেছে। আমাকেও মৃত মনে করে বর্বর জল্লাদরা বাংকারের গর্তের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলো, মহান সৃস্টি কর্তার অশেষ রহমতে সেই মৃত্যুপুরির থেকে নিজেকে টেনে হিঁচড়ে ক্রলিং করে করে সার্কিট হাউজের দক্ষিণ দিকের কাঁটা তারের বেড়া ভেদ করে পাশের ড্রেনের মধ্যে গিয়ে পড়ি, কাঁটা তারের আঘাতে মাথা বুক পিঠ ছিঁড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় ড্রেনের ময়লা কাদা পানির মধ্যে কিছুক্ষণ পড়ে ছিলাম। মাথার ওপরে সূর্য, প্রচণ্ড গরম। চারিপাশের বাড়িঘর দোকানপাটে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে এবং প্রচণ্ড ভাবে গোলাগুলি চলছে। মনে মনে ভাবলাম ড্রেনের উপরে উঠা যাবেনা। উপরে উঠলেই পাকিস্তানি হায়েনাদের গুলিতে নির্ঘাত মৃত্যু হবে। ড্রেনের মধ্যের ময়লা কাদা পানি পোকা মাকড় সাপ জোঁক তারমধ্যে দিয়ে ভাঙা হাত পা কোনোরকমে অনেক কষ্টে চালিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে যশোর শহরের দক্ষিণ দিকের হন্যের বিলে গিয়ে পড়ি। হন্যের বিলের উত্তর পাশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হন্যের বিলের অপর পারে দক্ষিণে মুক্তিকামী মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ করে মর্টারের গোলা ও মেশিনগানের গুলি বর্ষণ করছে, তখন বিলের অপর পারে দক্ষিণে কুয়াদা বাজারের সংলগ্ন আশেপাশের এলাকায় মুক্তিকামী ইপিআর পুলিশ ও মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান করছিল। যশোর শহরের সব কিছুই আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে।
এপ্রিল মাস হন্যের বিলে তেমন পানি নেই, বিলের এপার থেকে ওপার দেখা যায় না, কাঁদা পানির মধ্যে দিয়ে সাঁতার কেটে কেটে নিজেকে অনেক কষ্টে কয়েক মাইল টেনে নিয়ে কুয়াদা বাজারের কাছে গ্রামের নিরিবিলি এলাকায় উলঙ্গ অবস্থায় অপর পারে গিয়ে উঠলাম, পরনের প্যান্ট হন্যের বিলের কাদা পানির মধ্যে কোথাও পড়ে গিয়েছে। শরীরে তখন প্রচণ্ড জ্বর নাক মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে। মনে হচ্ছিলো আমি মারা যাচ্ছি। ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে আবারও জ্ঞান হারালাম। এমন সময় উক্ত এলাকার দুইজন মহিলা, পুরুষ ও একজন কিশোরী আমাকে দেখতে পেয়ে ছুটে আসে। তারা কলসিতে করে পানি নিয়ে এসে আমার চোখে মুখে দেয় এবং পানি পান করায়, আমার কোনোরকমে জ্ঞান ফিরে আসে, তখন আমি তাদেরকে বলি যে, সুতিঘাটা বলেনপুরে সাখাওয়াত চেয়ারম্যান আমার ফুপার বাড়িতে আমাকে নিয়ে চলেন। ওরা তখন যুদ্ধের লেলিহান আগুন থেকে জীবন বাঁচাতে গরু গাড়িতে করে ওই গ্রাম থেকে সরে যাচ্ছিলো। তখন উক্ত মহিলা, পুরুষ ও কিশোরী আমাকে ধরাধরি করে গরু গাড়িতে তুলে নিয়ে আমার ফুপুর বাড়িতে পৌঁছে দেয়। সেখানে আমার ফুপুতো ভাই ডাক্তার আনোয়ার আলী এমবিবিএস আমার ভাঙা হাত পায়ে ব্যান্ডেজ করে দেন এবং ওষুধপত্র দিয়ে চিকিৎসা করে সুস্থ করে তোলেন।
মারাত্মক আহত অবস্থায় অলৌকিক ভাবে জীবনে রক্ষা পেয়ে সুতিঘাটা বলেনপুর গ্রামে আমার ফুফুর বাড়িতে ডাক্তার আনোয়ার আলী এমবিবিএস নিকট চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রায় এক মাসের উপরে বিছানায় পড়েছিলাম। হাঁটতে পারতাম না, দাঁড়াতে পারতাম না। আমার ফুপু ও ফুপা এবং ফুপুতো ভাই নুরুল হক গোঁড়ো ভাই, ভাবি সেলিনা হক, নুরুজ্জামান পুন্টে ভাই, দিব্যি ভাই, সঙ্গিতজ্ঞ শাহ মোহাম্মাদ মোর্শেদ ভাই, খড়কীর পীর একরাম ভাই ও শান্তি ভাইদের সেবা যত্নে একটু সুস্থ হয়ে মে মাসের ১০/১৫ তারিখে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে যশোর জেলা ছাত্রলীগ নেতা হাসান শিবলীর সাথে একটি জামা প্যান্ট, জুতাবিহীন খালি পায়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে খাল বিল পার হয়ে ৩৪ মাইল পায়ে হেঁটে ভারতের বনগাঁও পৌঁছাই। ভারতের বনগাঁওতে যশোরের এমপি অ্যাডভোকেট রওশন আলীর বাসভবনে এক সপ্তাহ বিশ্রামে থাকি। আমার কাজিন আবু সেলিম রানার সাহায্যে বনগাঁও হাসপাতালে গিয়ে হাত পায়ের ব্যান্ডেজ পরিষ্কার করে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ নিয়ে বনগাঁও হাই স্কুলে মুক্তিযুদ্ধের প্রাইমারি ট্রেনিং নেয়ার জন্য সেখানকার ইন্সট্রাকটর লে. মতিউর রহমান নড়াইলের এমএনএ ( আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি) সাথে যোগাযোগ করি। শরণার্থী ক্যাম্পের ইনচার্জ কালিয়ার এমএনএ এখলাসউদ্দিন ভাইয়ের আন্তরিক সহায়তায় তার সাথে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং ক্যাম্পে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা হয়। বনগাঁ-তে একমাস প্রাইমারি ট্রেনিং এর পর যশোর জেলা ছাত্রলীগ নেতা হাসান শিবলীর সাথে ৮ নং সেক্টরের সাব সেক্টর বয়রা ট্রেনিং সেন্টারে (ভারতের সীমান্ত) গমন করি এবং সেখানে বয়রা সাব সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার (আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি) অধীনে একমাস গোরিলা ট্রেনিং নিয়ে জুলাই মাসের শেষের দিকে তৎকালীন যশোর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি খান টিপু সুলতানের (৮ নং সেক্টরের লিয়াজোঁ অফিসার) সাথে যশোর শহরে ফিরে আসি। সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন যশোর জেলা ছাত্রলীগের সংগ্রামী সাধারণ সম্পাদক মুজিব বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার রবিউল আলমের (গাজী) অধীনে তিরিশজন দুর্র্ধষ গোরিলা হাসান শিবলী, ছালাম চাকলাদার, মশিয়ার রহমান, মোহাম্মাদ আলী স্বপন, ভীম সেন, সাহজাহান কবির, আব্দুল মালেক ঝন্টু, মমিনুর রহমার মমিন, আলাউদ্দিন, কল্লোল, তরিকুল্লাহ এবং সাহায্যকারী পোস্টাল সুপার অফিসের আমিনুর রশিদ, হারুনর রশিদ, মিনা আপা, রুবী, সুলতান মাহমুদ লাভলু, মমতাজ আফরোজ রোজি, পোস্ট অফিস পাড়ার ফজলে এলাহি মনি, মঞ্জুর হোসেন, সিভিল ডিফেন্সের হাবিবুর রহমান ছটকু, টেইলর মাস্টার মহাসিন, পুরাতন কসবার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কাশেম খান, জাফর খান, চিত্রা সিনেমা হলের সামনের পেট্রোল পাম্পের মালিক মহাসিন সাহেব, পৌরপার্ক পাড়ার আফসারউদ্দিন বাবলু প্রমুখের সাহায্য সহযোগিতাায় অবরুদ্ধ যশোর শহরের টিএন্ডটি, বর্বর পাকিস্তানি সেনাদের হেড কোয়ার্টার সার্কিট হাউজ, কোতোয়ালি থানা, বড়বাজার, রাজাকার শিরোমণি অ্যাডভোকেট শামসুর রহমানের বাসভবন (পাবলিক হেলথ অফিস) জলকল, যশোর ক্লাব, রাজাকারদের হেড কোয়ার্টার টাউন হল, রেলস্টেশন, খুলনা বাসস্ট্যান্ডসহ পাকিস্তানি সেনাদের বিভিন্ন বাংকারে গ্রেনেড ও এক্সপ্লোসিভ বোমা হামলা চালিয়ে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করি।
একাত্তরের ৪ এপ্রিল ভোরে পাকিস্তানি সৈন্যরা যশোর রেলস্টেশন মাদ্রাসায় নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটায়। মাদ্রাসার শিক্ষক ছাত্রসহ ২৩ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শহীদদের মধ্যে মাদ্রাসার শিক্ষক ‘কাঠি হুজুর’ খ্যাত মওলানা হাবিবুর রহমান, তাহেরউদ্দিন, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল হামিদ, বরিশাল মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র কামরুজ্জামান, কাজী আব্দুল গণি, ছেলে কাজী কামরুজ্জামান, ভাই দীন মোহাম্মাদ, ভাই শিক্ষক আয়ুব হোসেন, যশোর জিলা স্কুলের শিক্ষক সাহিত্যিক আব্দুর রউফ, মাদ্রাসাছাত্র আতিয়ার রহমান, নওয়াব আলী, লিয়াকত আলী, আক্তার হোসেন, আমজেদ আলী পরিচয় শনাক্ত হয়। বাকিদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি।
একই দিন যশোর শহরের ষষ্ঠীতলা পাড়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুক, সাবেক ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট রহমত উল্লাহ এবং তার দুই ছেলে মোহাম্মদ আলী ও মোসাদ্দেক রহমত উল্লাহ, ক্যাথলিক গির্জার ফাদার মারিও ভেরনেসি, স্বপন পল বিশ্বাস, প্রকাশ বিশ্বাস, অনিল সরদার, পবিত্র বিশ্বাস, ফুল কুমারী তরফদার, মাগদালিনা তরফদার ও আঞ্জেলা বিশ্বাসকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে পাক বাহিনীর সদস্যরা।
একাত্তরের ৪ এপ্রিল ৪-ঠা এপ্রিল বিকেলে পাক সেনারা যশোর কোতয়ালী থানা আক্রমণ করে থানার মধ্যে অবস্থানরত কনস্টেবল ৯৯৬ আকরাম হোসেন, ১৪৩৯ আব্দুস সালাম খন্দকার, ১১৫০ নরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, নায়েক ১১১০ আব্দুস সামাদ এবং নায়েক ৩৫০ আব্দুল হালিমকে হত্যা করে। মৃত্যুঞ্জয়ী এই পাঁচ বীর পুলিশ যোদ্ধাকে পাকি সেনারা হত্যা করে কোতয়ালী থানার চত্বরেই মাটি চাপা দিয়েছিল। সেদিন কোতয়ালী থানার কর্মকর্তা আনোয়ার সাহেব অল্পের জন্য জীবনে রক্ষা পেয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
সেদিনের বর্বর হামলা থেকে রেহাই পায়নি তৎকালীন যশোর জেনারেল হাসপাতাল। সেখানে ঢুকে হাসপাতালে কর্মরত চারজন সেবিকাসহ ১১ জনকে হত্যা করে পাক বাহিনী। তারা হলেন- সিরাজুল ইসলাম, সাকাওয়াত হোসেন, শাহ আলম ও চাঁন মিয়া। বাকিদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। এ শহীদদের হাসপাতালের নার্সিং ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ পাশে গণকবর দেওয়া হয়। এছাড়াও যশোর শহরের বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় ঢুকে অসংখ্য মানুষকে গুলি করে হত্যা করে পাক হানাদার বাহিনী। এদিন সকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে যশোর শহর ও শহরতলি এবং আশেপাশের গ্রাম অঞ্চলে হামলা চালিয়ে পাকি হায়েনারা মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র জনতা, কৃষক শ্রমিক, নারী-পুরুষ, শিশু ও ইপিআর, পুলিশ, আনসার এবং বেঙ্গলী সেনা মিলিয়ে কয়েক হাজার স্বাধীনতাকামী মানুষকে নির্মম ভাবে গুলি করে, বেয়নেট দিয়ে, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এবং পুড়িয়ে হত্যা করে।
জয়বাংলা
লেখক : ৮নং সেক্টর, বীর মুক্তিযোদ্ধা, নিউইয়র্ক, আমেরিকা




















