সোমবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

৯ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রমজানে আত্মার পরিশুদ্ধি কেন জরুরি ?

আলেমা হাবিবা আক্তার

প্রকাশিত: ২২:১৯, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ২২:২০, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

রমজানে আত্মার পরিশুদ্ধি কেন জরুরি ?

রহমতের ফল্গুধারা নিয়ে আগমন করেছে মাহে রমজান। এ মাসে মুমিন আত্মিক পরিশুদ্ধি ও আল্লাহভীতি পাথেয় অর্জন করে। যা মুমিনকে বছরের অন্য সময়গুলোতে পথ চলতে সাহায্য করে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, তোমাদের ওপর রোজাকে ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যেন তোমরা আল্লাহভীরু হতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩)

আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহভীতির অন্যতম মাধ্যম আত্ম পর্যালোচনা। আত্ম পর্যালোচনার মাধ্যমে মুমিন নিজের ভালো-মন্দ যাচাই করতে পারে। ফলে সে নিজেকে সংশোধন এবং ভালো কাজে অগ্রগামী করার সুযোগ পায়। পবিত্র রমজান মুমিনের আত্ম পর্যালোচনার মহোত্তম সময়।

আত্ম পর্যালোচনা কি ও কেন : 

আত্ম পর্যালোচনা হলো নিজের ভালো-মন্দ কাজের জন্য নিজের কাছে জবাবদিহি করা। মন্দ কাজের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তওবা করা, ভবিষ্যতে তা না করার অঙ্গীকার করা। ভালো কাজের জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করা, তাঁর কাছে আরো বেশি তাওফিক চাওয়া। আত্ম পর্যালোচনার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে সংশোধন ও পরিশুদ্ধ করার সুযোগ পায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ আত্ম পর্যালোচনার প্রতি উৎসাহিত করে বলেছেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা আল্লাহকে ভয় কোরো। প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক আগামীকালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কোরো; তোমরা যা কোরো আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।’ (সুরা হাশর, আয়াত : ১৮)
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের আমলগুলো ওজন কোরো তোমাদের বিরুদ্ধে তা ওজন করার আগে। কেননা আজ তোমাদের নিজেদের হিসাব গ্রহণ আগামীকাল অন্যকে হিসাব দেওয়ার চেয়ে সহজতর।’ (ইহয়াউ উলুমিদ্দিন : ৪/৪০২)

রমজানে আত্ম পর্যালোচনা কেন : 

আল্লাহর রহমত ও করুণায় ভরপুর মাহে রমজানে যে কোনো নেক কাজের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। তাই রমজানে আত্ম পর্যালোচনা করা উচিত। এ ছাড়া বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত রমজানে আল্লাহ মুমিনের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন, তাঁকে ক্ষমা করেন, এ মাসে শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়, জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সুতরাং মুমিনের জন্য রমজান আত্ম পর্যালোচনা ও আত্মশুদ্ধির সর্বোত্তম সময়।

যে-সব বিষয়ে আত্ম পর্যালোচনা হবে : 

আত্ম পর্যালোচনার সময় মানুষ তাঁর কোন কোন বিষয় নিয়ে চিন্তা করবে তার ধারণা নিম্নোক্ত হাদিসে পাওয়া যায়। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মানুষ আল্লাহর সামনে এক পা অগ্রসর হতে পারবে না। তা হলো : জীবন কোথায় নিঃশেষ করেছ?, যৌবন কোথায় ব্যয় করেছ?, সম্পদ কোথা থেকে অর্জন করেছ তা কোথায় ব্যয় করেছ যা জেনেছ তার কতটা আমল করেছ’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৬)

তিন কাজে আত্ম পর্যালোচনা ফলপ্রসূ হয় : 

জীবনোন্নয়নের জন্য আত্ম পর্যালোচনাই যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন জীবনের কিছু পরিবর্তন। আর জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে নিম্নোক্ত আমলগুলো করা যেতে পারে।
১. পৃথিবীকে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখা : পার্থিব জীবনের মোহ মানুষকে আল্লাহমুখী হতে দেয় না। তাকে পাপ পরিহার করতে দেয় না। পৃথিবীকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে না দেখে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। কেননা অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখলে মানুষ সহজেই বুঝতে পারবে পৃথিবী ক্ষণস্থায়ী এবং পৃথিবী ভোগ-বিলাস আত্মপ্রবঞ্চ ছাড়া কিছুই না। তাই মুমিনের উচিত পার্থিব জীবনের ওপর পরকালকে প্রাধান্য দেওয়া। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা জেনে রাখো, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক শ্লাঘা, ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্তুতিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছু না। তার উপমা বৃষ্টি, যা দ্বারা শস্য সম্ভার কৃষকদের চমৎকৃত করে, অতঃপর তা শুকিয়ে যায়। ফলে তুমি তা পীতবর্ণ দেখতে পাও। অবশেষে তা খড়-কুটায় পরিণত হয়। পরকালে আছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব ও জীবন প্রতারণার সামগ্রী ছাড়া কিছুই না।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত : ২০)

২. মৃত্যুর স্মরণ : মৃত্যু পৃথিবীর এমন অমোঘ সত্য, যা পৃথিবীর কেউ অস্বীকার করতে পারে না। আর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পার্থিব জীবন ছেড়ে মানুষ পরকালীন জীবনে প্রবেশ করে। তাই মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে পাপকাজ পরিহারে সাহায্য করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। কেয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের কর্মফল পূর্ণ মাত্রায় দেওয়া হবে। যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই সফলকাম। পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ছাড়া কিছুই না।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৫)

৩. কবর ও পরকালের স্মরণ : কবরে প্রবেশের পরই মানুষের পার্থিব জীবনের হিসাব ও জবাবদিহি শুরু হয়। ব্যক্তির আমল অনুসারে সে কবরে ভালো ও মন্দ আচরণের মুখোমুখি হয়। সুতরাং কবর ও পরকালের চিন্তা মানুষকে পার্থিব জীবনে আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন প্রত্যেকে সে যে ভালো কাজ করেছে এবং সে যে মন্দ কাজ করেছে তা উপস্থিত পাবে, সেদিন সে তার ও আমলনামার মধ্যে ব্যবধান কামনা করবে। আল্লাহ তাঁর নিজের সম্পর্কে তোমাদের সাবধান করছেন। আল্লাহ বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৩০)

আত্ম পর্যালোচনার পুরস্কার : 
আত্ম পর্যালোচনার মাধ্যমে যে ব্যক্তি আল্লাহভীতি অর্জন করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্যের সামর্থ্য লাভ করবে তাদের জন্য কোরআনের দৃষ্টিতে তারাই সফল। ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর অবাধ্যতা হতে সাবধান থাকে। তারাই সফলকাম।’ (সুরা নুর, আয়াত : ৫২)
আল্লাহ সবাইকে আত্মশুদ্ধির তাওফিক দিন। আমিন
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: