শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মঞ্চে আসছে ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’

​​​​​​​ঢাকা অফিস

প্রকাশিত: ২০:৩৯, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মঞ্চে আসছে ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই পাখি’ কবিতা ও কালজয়ী নাটক ‘রক্তকরবী’-র ভাবনা-আশ্রয়ে মঞ্চে আসছে নতুন নাট্যপ্রযোজনা ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’। স্বাধীনতা, পরাধীনতা, শোষণ ও মানবমুক্তির চিরন্তন প্রশ্নকে সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নির্মিত নাটকটির উদ্বোধনী মঞ্চায়ন হবে আজ শুক্রবার। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল হলে নাটকটি নিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হবে নাগরিক নাট্যাঙ্গন।

নাটকটির পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় রয়েছেন নাট্যশিল্পী, নাট্যকার ও নির্দেশক ষড়েশ্বর্য লাকী ইনাম। এটি নাগরিক নাট্যাঙ্গনের নবম প্রযোজনা এবং দলের ২৮তম নাট্যপ্রযোজনা।

ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং শোষণ-শাসন ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের এই সময়ে মানুষের জীবন ক্রমেই যান্ত্রিক হয়ে উঠছে। প্রযুক্তির বিস্ময় যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি আধিপত্য, নিয়ন্ত্রণ ও বৈষম্যের নতুন বাস্তবতাও তৈরি করেছে। ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’ সেই বাস্তবতার মধ্যেই খুঁজতে চায় মানুষের স্বাধীনতার অর্থ।

রবীন্দ্রনাথের ‘দুই পাখি’র খাঁচার পাখি ও বনের পাখি এখানে হয়ে ওঠে দুটি ভিন্ন জীবনদর্শনের প্রতীক। একদিকে প্রাচুর্য, বিলাসিতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যেও পরাধীন জীবন; অন্যদিকে অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি ও কষ্টের মধ্যেও স্বাধীনতার স্বাদ। একটি পাখি খাঁচায় থাকতে থাকতে উড়তে ভুলে যায়, অন্যটি ফাঁদ এড়িয়ে মুক্ত আকাশে বেঁচে থাকে। স্বাধীনতার এই দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি অবস্থান থেকেই নাটকের মূল দ্বন্দ্বের সূত্রপাত।

খাঁচার পাখি ও বনের পাখির সাক্ষাতে যখন দুই বিপরীত জীবন এক অভিন্ন মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় মিলিত হওয়ার চেষ্টা করে, তখনই আবির্ভাব ঘটে ‘রক্তকরবী’র নন্দিনীর। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট এই চরিত্র এখানে শুধু একজন নাট্যচরিত্র নয়, বরং আত্মমুক্তি ও মানবমুক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে।

‘রক্তকরবী’র যক্ষপুরীতে মকররাজের শোষণব্যবস্থায় কিশোর, ফাগুলালসহ অসংখ্য মানুষ বাধ্য হয়ে খনিতে নেমে সোনা তুলতে তুলতে যন্ত্রে পরিণত হয়। সেখানে মানুষের জীবন ও শ্রমের ওপর প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার বিরুদ্ধে নন্দিনীর অবস্থান। তার দ্রোহ, ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে মানুষের হারিয়ে যাওয়া মানবিক সত্তাকে ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায়।

এই দুই রবীন্দ্রভাবনাকে এক সূত্রে এনে ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’ নির্মাণ করেছেন ষড়েশ্বর্য লাকী ইনাম। নাটকটির পরিকল্পক ও নির্দেশক বলেন, **‘দুই পাখি’ আর ‘রক্তকরবী’—দুটোই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একই কথা বলার দুই রকম শিল্পরূপ। কথাটা হলো সর্বপ্রাণী, সর্বমানুষের স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা শুধু আবদ্ধ প্রাচীর বা খাঁচা ভাঙা নয়; প্রকৃত স্বাধীনতা হলো প্রাচীর তোলা কিংবা খাঁচায় পুরে রাখার মানসিকতা ভাঙা। সর্বপ্রাণী ও সব মানুষকে তার স্ব স্ব বৈশিষ্ট্য আঁকড়ে বাঁচতে দেওয়া, নিজে বাঁচা এবং অপরকে নিয়ে বাঁচা।’

নাটকের পান্ডুলিপি রচনার ক্ষেত্রে হৃদি হকের ভাবনা তাকে অনুপ্রাণিত করেছে বলেও জানান তিনি। অভিনয়, মঞ্চসজ্জা, আবহ সংগীত, পোশাক ও দ্রব্য সম্ভারের ক্ষেত্রে নাগরিক নাট্যাঙ্গনের নাট্যকর্মীদের সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন নির্দেশক। পাশাপাশি মঞ্চের আলোর পুরোধা ঠান্ডু রায়হান উপদেষ্টা হিসেবে আলো পরিকল্পনায় সহযোগিতা করেছেন।

নাটকটির সঙ্গে লাকী ইনামের ব্যক্তিগত জীবনও যেন এক জায়গায় এসে মিলেছে। চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর তিনি ৭৫ বছরে পদার্পণ করেছেন। দলীয় কর্মীরা তার জন্মদিন বিশেষভাবে উদযাপন করতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নাটকের নতুন সৃজন ও মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে জীবনের এই পর্যায় উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেন। তার ভাষায়, আশৈশব শিল্প-সংস্কৃতি ও নাটকের প্রতি নিবেদিত জীবনে জন্মদিন উদযাপনের সবচেয়ে অর্থবহ পথ হতে পারে নতুন একটি নাটকের জন্ম দেওয়া।

‘দুই পাখি ও নন্দিনী’তে অভিনয় করেছেন প্রলয় জামান, জুয়েল জহুর, সুমন আহমেদ, হিল্লোল সরকার, মোসাদ্দীক শাহীন, পারিশা আফরোজ, লায়লা পলি, ফারিন তামান্না, স্মৃতি সরকার, ফজলে রিফাত রাব্বী, নাজমুল, বিশাল, ইমদাদসহ আরও অনেকে।

নাটকটির সংগীতে রয়েছেন আসমা দেবযানী, আবহ সংগীতে বিশ্বজিৎ বাদল, কোরিওগ্রাফিতে সুমন আহমেদ এবং রূপসজ্জায় শংকর দাশসহ অন্যরা।

রবীন্দ্রনাথের দুই পাখির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আর নন্দিনীর দ্রোহ—এই দুই প্রবাহকে সমকালীন মানুষের জীবন ও সংকটের সঙ্গে মিলিয়ে ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’ কতটা নতুন ভাষা তৈরি করতে পারে, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা। আগামীকাল জাতীয় নাট্যশালার মূল মঞ্চে উদ্বোধনী প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে সেই যাত্রা।

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: