সোমবার ০২ মার্চ ২০২৬

১৭ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বাধ্যতামূলক অবসরে বিতর্কিত কৃষি সচিব ড. এমদাদ উল্লাহ

রানার প্রতিবেদক, ঢাকা অফিস

প্রকাশিত: ০৪:৩৭, ২ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ০৫:০০, ২ মার্চ ২০২৬

বাধ্যতামূলক অবসরে বিতর্কিত কৃষি সচিব ড. এমদাদ উল্লাহ

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান (ফাইল ছবি)

কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিতর্কিত সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। রোববার (১ মার্চ) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন নিয়োগ-১ শাখা থেকে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। উপসচিব মোহাম্মদ রফিকুল হকের সই করা ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, যেহেতু কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের চাকরিকাল ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে এবং যেহেতু সরকার জনস্বার্থে তাকে সরকারি চাকরি থেকে অবসর প্রদান করা প্রয়োজন মর্মে বিবেচনা করে, সেহেতু সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ৪৫ ধারার প্রদত্ত ক্ষমতাবলে তাকে সরকারি চাকরি থেকে অবসর প্রদান করা হলো।
একইসাথে তিনি বিধি অনুযায়ী অবসরজনিত সুবিধাদি প্রাপ্য হবেন এবং জনস্বার্থে জারি করা এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে।

এদিকে, দেশের অতিগুরুত্বপূর্ণ কৃষি সেক্টরে নানা কারণে বিতর্কিত সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সংবাদে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। কৃষি সেক্টর সংশ্লিষ্টরা সরকারকে সাধুবাদ জানিয়ে সদ্য বিদায়ী সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের দুর্নীতি-অনিয়মের তদন্ত করে দেশে-বিদেশে গড়া অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করারও দাবি তুলেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

জানা গেছে, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে নিজেকে বৈষম্য বিরোধী সাঁজিয়ে সপ্তাহের ব্যবধানে কৃষি সচিবের পদ বাগিয়ে নেন আওয়ামী লীগ পন্থী আমলা ড. এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। এরপর জড়িয়ে পড়েন অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে। তবে সম্প্রতি নতুন সরকারের আমলেও ‘খোলস পাল্টে’ পদে টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন মহলে দেনদরবার শুরু করেছিলেন। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে নতুন সরকার শুরুতেই বিতর্কিত এই সচিবকে অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্তে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও কৃষি সেক্টরে জড়িতদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে, অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধুবাদ জানিয়েছেন সরকার সংশ্লিষ্টদেরকে।

এরআগে, আওয়ামী লীগপন্থী আমলাদের পুনর্বাসন ঠেকাতে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গঠিত নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘জুলাই ঐক্য’ সচিবালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। ওই তালিকায় অন্যতম কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের ফিরিস্থি তুলে ধরা হলেও আলোচিত এই কর্মকর্তা অন্তবর্তীকালীন সরকারের বিশেষ কয়েকজনকে ম্যানেজ করে সব অভিযোগ কাটিয়ে স্বপদে টিকে ছিলেন। এছাড়াও মন্ত্রণালয়ের সার আমদানীতে দুর্নীতি সম্পর্কিত বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে তিনি কৃষি বিটের সাংবাদিকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করলে সাংবাদিকরা কৃষি সচিবকে অবসারণ এবং শাস্তির দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ করেন। তারপরও অদৃশ্য ক্ষমতাবলে উপরিমহল ম্যানেজ করে তিনি দুর্নীতি-অনিয়ম অব্যহত রাখেন।  

কৃষি সেক্টর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ‘৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সুনজরে থাকা ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ছিলেন। তারআগে স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিকল্পনা, পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও পরিদর্শন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ছিলেন। কিন্তু ৫ আগস্টের পর সপ্তাহের ব্যবধানে তিনি নিজেকে বৈষম্য বিরোধী সাজিয়ে কৃষি সচিবের পদ বাগিয়ে নেন। ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট কৃষি সচিব পদে নিয়োগ পান তিনি।

কিছুটা নাটকীয়তার মতো নিজে আওয়ামী লীগ পন্থী আমলা হলেও সচিবের পদে বসেই তিনি মন্ত্রণালয় থেকে ‘আওয়ামী লীগ আমলে তৈরি হওয়া সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার ছবক দিয়ে উপরিমহলের নজরে আসেন।’ এরপর সিন্ডিকেট ভাঙার পরিবর্তে বিগত দিনের সব রেকর্ড ভেঙে নিজেই গড়ে তোলেন সার আমদানী সিন্ডিকেট। এমনকি, দেশে সারের সংকটের মধ্যেই এক ব্যক্তির একাধিক কোম্পানিকে সার আমদানির সুবিধা দিয়ে ভিন্ন একটি দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। ওই কর্মকাণ্ডে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশের বিষয়টি নিয়ে সেসময় দেশব্যাপী আলোচনায় আসে।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি অর্থ লোপাটে কৃষি সচিবের এমন অভিনব উদ্যোগ ইতোপূর্বের সকল দুর্নীতি-অনিয়মকে হার মানায়। ওই সময়  দরপত্র নিয়মনীতি উপেক্ষা করে বেসরকারি আমদানীকারকদের মাধ্যমে সার আমদানি করতে সচিবের যোগসাজশে মনগড়া নিয়মে একক ব্যক্তির একাধিক প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দিয়ে দেশের বাইরে বড় অংকের ঘুষ লেনদেন হয়।

সার আমদানি সংক্রান্ত পরিপত্র অনুযায়ী প্রাপ্ত দরের মধ্যে সর্ব নিম্ন দরের ক্রমানুসারে কার্যাদেশ দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু তা অমান্য করে দরপত্র প্রাপ্ত দরের বাইরে ‘নেগোসিয়েশন’ এর মাধ্যমে কার্যাদেশ দিয়ে নজির গড়েন। যে কারণে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানীর কাজ থেকে বঞ্চিত হয়।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে আরও জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই সাড়ে ৯ লাখ টন সার আমদানি একটি টেন্ডার আহ্বান করে মন্ত্রণালয়। ওই টেন্ডারের মাধ্যমে ৫ লাখ ১৫ লাখ টন টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি আমদানি কার্যাদেশ দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। বাকি ৪ লাখ ৩৫ হাজার টনের আমদানি জন্য পুনরায় টেন্ডার করে ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে আমিনুর রশিদ খান মামুনের মালিকানাধীন ‘দেশ ট্রেডিং করপোরেশন এবং বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামের দুইটি প্রতিষ্ঠান এবং ওই ব্যবসায়ীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হিসেবে পরিচিত নায়েব রশিদ খানের মালিকানাধীন ‘এনআরকে হোল্ডিং’ নামের প্রতিষ্ঠান মিলে এই তিন প্রতিষ্ঠানের নামে ২ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এছাড়া ওই ব্যবসায়ীদের যে কার্যাদেশ দেওয়া হয়, সেখানেও বিশেষ সুবিধা দিতে দেখা গেছে। মূলত, তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাজই আমিনুর রশিদ খানই নিয়েছেন বলে জনশ্রুতি আছে।

ওই কার্যাদেশে দুটি দেশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দর দিলেও পরিমাণ উল্লেখ করা হয় একসঙ্গে। যে দেশের সারের দাম বেশি সেখান থেকে পরিমাণে কম এনে যে দেশে দাম কম সেখান থেকে বেশি দামের সার আনার সুযোগ করে দেওয়া হয়, যে সুবিধাটা বাকি ১৮ আমদানিকারকের কাউকেই দেওয়া হয়নি। বাকি আমদানিকারকদের অবশ্য নিয়মানুযায়ী একটি লটের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট দামে একক দেশের অনুকূলেই সার আমদানি কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

মন্ত্রণালয় সূত্রে আরও জানা গেছে, সচিবের পছন্দের ‘দেশ ট্রেডিং করপোরেশনকে’ ৩০ হাজার মে টন টিএসপি সার আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এ ৩০ হাজার টনের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে দুটি দেশের দর অনুমোদন করা হয়েছে। মরক্কো থেকে ৬৯৪ মার্কিন ডলার এবং লেবানন থেকে ৬৮৮ মার্কিন ডলার। কিন্তু কোন দেশ থেকে কতটুকু আমদানি করবে তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি। এই ধরনের কার্যাদেশ দেওয়ার কোনো সুযোগ আইনে না থাকলেও তিনি দিয়েছেন। একইভাবে বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে ৪০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানি একটি কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এ সার একই সঙ্গে দুটি দেশ থেকে আমদানি অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ৮৭৪ মার্কিন ডলারে মিশর থেকে এবং ৮৪৮ ডলারে চীন থেকে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়।
অথচ, সচিবের পছন্দের প্রতিষ্ঠান ‘বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল শুধু নন ইউরিয়া নয়, ইউরিয়া সার পরিবহনের জন্যও বিসিআইসির তালিকাভুক্ত ঠিকাদার। ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পরিবহন ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে সার আত্মসাতের অভিযোগ উঠে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের তদন্তে সার আত্মসাতে যে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের নাম আসে তার মধ্যে একটি ছিল আমিনুর রশিদ খান মামুনের বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল।’

এছাড়াও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ভর্তুকির আওতায় বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে ২ লাখ মেট্রিক টন টিএসপি, ৫ লাখ মেট্রিক টন ডিএপি, ২ লাখ ৫০ পক্ষ মেট্রিক টন এমওপি এবং শূন্য দশমিক ২০ লক্ষ মেট্রিক টন এমএপি সার সংগ্রহের জন্য প্রথম টেন্ডার আহ্বান করে কৃষি মন্ত্রণালয়। এর বিপরীতে ৪৯টি প্রতিষ্ঠান দরপ্রস্তাবে অংশ নেয়। কিন্তু যারা এ দরপ্রস্তাবে অংশ নেন তাদের সর্বনিম্ন দর গ্রহণ করেনি মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় অংশগ্রহণকারীদের দেশভিত্তিক এক দরপ্রস্তাব করে। এ প্রস্তাবে রাজি হতে আমদানিকারকদের মৌখিকভাবে অনুরোধ করে। এ অনুরোধে যারা যারা কৃষি মন্ত্রণালয়ের দরপ্রস্তাবে রাজি হয় তারা সম্মতিপত্রের চিঠি দেয় মন্ত্রণালয়কে। এ সম্মতিপত্রেও ভুল দর উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠায় বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছিল, নির্দিষ্ট দেশ ভিত্তিক নির্ধারিত দর উল্লেখ করে এ সম্মতিপত্র দেওয়ার কথা। তবে বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল টিএসপি আমদানি জন্য ৭০৪ ডলার দাম উল্লেখ সব অরিজিনের জন্য (দেশভিত্তিক) চিঠি দেয়। অথচ ৭০৪ ডলার দর নির্ধারণ করা ছিল শুধু তিউনেশিয়ার জন্য। মরক্কোর জন্য ছিল ৬৯৪ ডলার, লেবানন ও মিশরের জন্য ৬৮৮ ডলার করে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল কৃষি মন্ত্রণালয়। অথচ বাল্ক ট্রেড টিএসপি আমদানির কার্যাদেশ দুইটি পেয়েছে মরক্কো এবং লেবানন থেকে আমদানীর জন্য। আবার প্রতিষ্ঠানটি এ সম্মতিপত্রের সঙ্গে নিয়মানুযায়ী কোন ম্যানুফ্যাকচারার্স সার্টিফিকেট সংযুক্ত করেনি। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে পুনরায় এ প্রতিষ্ঠানকে নতুন সম্মতিপত্র দেওয়ার জন্য সুযোগ দেয়। অথচ অনেক আমদানিকারক ঠিকঠাক সম্মতিপত্র দিয়েও টিএসপি আমদানি কার্যাদেশ পায়নি।

এছাড়া কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের নেতৃত্বে ‘ট্রান্সফরমিং বাংলাদেশ এগ্রিকালচার: আউটলুক ২০৫০’ শীর্ষক রোডম্যাপ ঘোষণা হয়। কৃষি সেক্টরের প্রকৃত একাধিক সমস্যার বাস্তব সমাধান না রেখেই এই রোডম্যাপ তৈরি হয়। যার বেশ কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা সমাধানের চেয়েও ভোগান্তি বাড়বে বহুগুণ। ২৫ বছর দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনামূলক মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলেও তা পুনমূল্যয়ন প্রয়োজন বলেও মনে করেন কৃষিখাত সংশ্লিষ্টরা।  

 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: