প্রচলিত ধান-পাট-গম চাষে কাঙ্ক্ষিত লাভ না পেয়ে বিকল্প ফসলের সন্ধানে নেমেছিলেন যশোরের চৌগাছা উপজেলার পাতিবিলা গ্রামের কৃষক আক্তার হোসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারোমাসি সজনে চাষের সম্ভাবনা দেখে এক বিঘা জমিতে ওডিসি-৩ জাতের ৩০০টি চারা রোপণ করেন তিনি। মাত্র ২০ হাজার টাকা বিনিয়োগে শুরু করা সেই উদ্যোগে কয়েক মাসের মধ্যেই ফলন ও বিক্রি শুরু হয়। এখন বছরে একাধিকবার ফলন পাওয়া এই সজনে থেকেই ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা আয়ের প্রত্যাশা করছেন আক্তার। তাঁর সাফল্য দেখে আশপাশের কৃষকরাও আগ্রহী হয়ে উঠছেন এই নতুন ফসলে।
সরেজমিনে তার ক্ষেতে দেখা যায়, গাছজুড়ে থোকায় থোকায় ঝুলছে লম্বা, সবুজ ও সতেজ সজনে। আক্তারের দাবি, দেশি সজনে সাধারণত নির্দিষ্ট মৌসুমে ফল দিলেও বারোমাসি ওডিসি-৩ জাতের গাছে বছরের বিভিন্ন সময়ে ফুল ও ফল আসে। রোপণের ৫ থেকে ৭ মাসের মধ্যে ফলন শুরু হয় এবং একটি গাছ থেকে ৫ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। বর্তমানে তার প্রতিটি সুস্থ গাছে ৮ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত সজনে ধরছে বলে জানান তিনি।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যশোর জেলা হর্টিকালচার সেন্টারে যোগাযোগ করে ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ওডিসি-৩ জাতের চারা সংগ্রহ করেন আক্তার। প্রায় ২০ হাজার টাকা প্রাথমিক বিনিয়োগ করে এক বিঘা জমিতে ৩০০টি চারা রোপণ করেন। সেই ছোট উদ্যোগ এখন তার কাছে সম্ভাবনাময় আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।
কৃষক আক্তার হোসেন বলেন, ‘চারা কেনা, জমি তৈরি আর জন-লেবার খরচ-টরছ দিয়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আমার খরচ ইতোমধ্যে উঠে গেছে। সামনে আশা করি লাভের মুখ দেখা যাবে।’
বিক্রির হিসাব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘৯-১০ মাসে ৪০ হাজারের মতো বেচাকেনা হয়ে গেছে। নতুন করে আবার ধরা শুরু করেছে। এই মৌসুমে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা পাব বলে আশাবাদী। সজনের দামও ভালো। বর্তমান বাজারে ১০০-১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। একবার লাগালে বছরে ৩-৪ বার সজনে তোলা যায়। ফলন আরও বাড়লে, গাছ-গাছালি প্রাকৃতিক দুর্যোগে না ভাঙলে ৩-৪ লাখ, ৫ লাখ টাকাও হতে পারে।’
আক্তারের সাফল্য দেখে স্থানীয় বেকার যুবক ও প্রান্তিক কৃষকদের অনেকে সজনে চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তার দাবি, অসময়ে বাজারে পাওয়া যায় এবং আকারে লম্বা ও দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ায় ওডিসি-৩ সজনের চাহিদা বেশি।
তিনি বলেন, ‘বাজারে নিয়ে গেলেই মানে দাঁড়ানোর টাইম দেয় না। এগুলো খাতি খুব ভালো। বিক্রি হয়ে যায় সাথে সাথে। খেতে খুবই সুস্বাদু। এর শাক, ডাটা সবই খাওয়া যাবে। এমনকি পাতাও বিক্রি করা যাবে আশা করা যায়।’
চৌগাছা বাজারের সবজি বিক্রেতা জামাল হোসেন বলেন, ‘বর্তমান বাজারদরে পাইকারিতে প্রতি কেজি সজনে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বাজারে ১৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারা এই সজনে বেশি পছন্দ করছেন, কারণ এটি লম্বা ও তরতাজা।’
সজনে চাষে আগ্রহী কৃষক হোসেন মাহমুদ বলেন, ‘আক্তার ভাইয়ের ক্ষেত দেখে আমি সত্যিই অবাক ও অনুপ্রাণিত। এক বিঘা জমিতে এত আয়, আগে কখনো ভাবিনি। ধানে যেখানে খরচই ওঠে না, সেখানে সজনে চাষে লাখ টাকা লাভ হচ্ছে। আমিও আগামী মৌসুমে হর্টিকালচার সেন্টার থেকে চারা নিয়ে চাষ শুরু করব।’
চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুশাব্বির হোসাইন বলেন, ‘ওডিসি-৩ একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও উচ্চ ফলনশীল জাত। এটি রোগ প্রতিরোধী ও খরা সহনশীল হওয়ায় যশোরের আবহাওয়ার জন্য উপযোগী। আমরা উপজেলার কৃষকদের এই জাত চাষে নিয়মিত উদ্বুদ্ধ করছি ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। আক্তার হোসেন আমাদের সফলতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। আমরা তাকে কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই ধরনের পুষ্টিসমৃদ্ধ সবজির চাষ আগামীতে আরও বাড়াতে হবে। দেশে পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উৎপাদন বাড়াতে পারলে বিদেশে রপ্তানির সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।’
যশোর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক কৃষিবিদ দীপংকর দাশ বলেন, ‘টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত বারোমাসি সজনে ওডিসি-৩ জাতের মানসম্মত চারা উৎপাদন করা যাচ্ছে। রোপণের ৫-৬ মাসের মধ্যে ফলন শুরু হয়ে সারা বছর ধারাবাহিক উৎপাদন বজায় থাকে। বাণিজ্যিকভাবে কিংবা বসতবাড়িতে চাষ করে কৃষকরা কম খরচে লাভবান হতে পারেন।’
তিনি জানান, গত বছর প্রায় ৭ হাজার চারা উৎপাদন করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৬ হাজার চারা কৃষকরা নিয়েছেন। এবার ১০ হাজার চারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. তানভীর ইসলাম বলেন, ‘সজনে ও সজনে পাতা একটি সুপারফুড হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এতে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে।’
সজনে পাতাকে কেন্দ্র করে বাড়তি আয়ের সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সজনের পাতাও এখন বিশ্ববাজারে মূল্যবান। পাতাগুলো শুকিয়ে গ্রাইন্ডিং করে পাউডার করা হলে অনলাইন বা বাজারে বিক্রি করা সম্ভব। বাজারে সজনের পাতা অন্যান্য শাকের মতো আঁটি করে সরবরাহ করলেও ভালো দামে বিক্রি হতে পারে। এতে কৃষকরা ফলের পাশাপাশি পাতা বিক্রি করেও বাড়তি আয় করতে পারবেন।’
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক প্রতাপ মন্ডল বলেন, ‘ওডিসি-৩ জাতটি সারা বছর ফুল ও ফল দেয় বলে অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হলে যশোরের এই বারোমাসি সজনে দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও বাজার তৈরি করতে পারে।’


























