যশোর সদর উপজেলার নোঙরপুর মাঠে আগাম জাতের বাঁধাকপিতে ভাইরাসের আক্রমণ ও সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণে ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। জমির বাঁধাকপি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের লোকসানের কথা জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে সার-কীটনাশকের বাড়তি দাম, উৎপাদন ব্যয় এবং মাটি পরীক্ষা ও রোগবালাই শনাক্তকরণে মাঠপর্যায়ে আরও কার্যকর পরামর্শের দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।
নোঙরপুর এলাকার কৃষক সায়েদ আলী চার বিঘা জমিতে ‘প্রফিট প্লাস’ জাতের আগাম বাঁধাকপি চাষ করেছিলেন। শুধু বীজ কিনতেই তার খরচ হয়েছে ২৪ থেকে ২৫ হাজার টাকা। জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, সার, কীটনাশক ও পরিচর্যাসহ মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। কিন্তু ভাইরাসের আক্রমণ ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় তার পুরো ফসল নষ্ট হয়েছে বলে জানান তিনি।
সায়েদ আলী বলেন, ‘ফসল নষ্ট হওয়ায় নতুন করে চাষ করার মতো অর্থও হাতে নেই। পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। সরকারি বা কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতা পেলে আবার চাষে ফিরতে পারব।’
কৃষক রঞ্জন আহমেদ বলেন, ‘বাঁধাকপির গাছ কুঁকড়ে যাচ্ছে, বড় হচ্ছে না। শিকড়ও ঠিকমতো তৈরি হচ্ছে না। ভাইরাস ও মাটির সমস্যার কারণে কী করণীয়, তা নিয়ে আমরা অনিশ্চয়তায় আছি।’
একই এলাকার কৃষক মোহাম্মদ গোলাপ নবী জানান, তার দেড় বিঘা জমির বাঁধাকপি নষ্ট হয়েছে। সার, মাটি পরীক্ষা ও অন্যান্য উপকরণে ব্যয় করার পরও ফসল নষ্ট হওয়ায় নতুন করে চাষ শুরু করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
কৃষক মজাহার বিশ্বাস, কামরুজ্জামান ও মোহাম্মদ জামির সরদারও আবহাওয়া, ভাইরাসের আক্রমণ ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিতে ক্ষতির কথা জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, সার ও কীটনাশকের খরচ বাড়লেও সবজির ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে না।
কৃষক জহুরুল জানান, তার তিন বিঘা জমির বাঁধাকপিও ভাইরাসের আক্রমণে নষ্ট হয়েছে। তার ভাষ্য, বাজারে সবজির দাম কম থাকায় এবং সার-কীটনাশকের দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না কৃষকরা। মাটি পরীক্ষায় সমস্যার কথা জানা গেলেও তা মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে আরও কার্যকর পরামর্শ প্রয়োজন।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি সার নির্ধারিত দামে পাওয়া গেলেও বাকিতে কিনতে গেলে অনেক সময় বেশি দাম দিতে হয়। পাশাপাশি মাটি পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ, রোগ শনাক্তকরণ ও প্রতিকারের বিষয়ে কৃষকদের সরাসরি সহযোগিতা প্রয়োজন।
কৃষি বিভাগের বক্তব্য
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, যেকোনো ফসল চাষের আগে মাটি পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে নোঙরপুর মাঠে প্রায় ৭০ হেক্টর জমিতে করোলা চাষের সময়ও মাটি পরীক্ষা করা হয়েছিল। বর্তমানে বাঁধাকপি চাষিদের জমি থেকেও মাটির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা জানান, যশোর সদরের ইছালী, চূড়ামনকাটি ও হৈবতপুর ইউনিয়নে বাঁধাকপির চাষ বেশি হয়। চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৮০ হেক্টর জমিতে বাঁধাকপি চাষের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ইছালী ইউনিয়নেই ইতোমধ্যে ১৪ হেক্টর জমিতে আবাদ শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে ইছালী ইউনিয়নের নোঙরপুর মাঠে কিছুটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভারী বৃষ্টিতে প্রায় চার বিঘা জমির বাঁধাকপির চারা নষ্ট হয়েছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে এলে এবং কৃষকরা শুষ্ক মৌসুমে আবার চারা রোপণ করলে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।’
রাজিয়া সুলতানা আরও বলেন, নোঙরপুরের মাঠ বাঁধাকপি চাষের জন্য উপযোগী। গত বছরও ওই মাঠে প্রায় ৭০ হেক্টর জমিতে বাঁধাকপি চাষ হয়েছিল। কৃষকরা এক মৌসুমে টানা তিনবার পর্যন্ত বাঁধাকপি তুলে থাকেন। বাজারে চাহিদা থাকায় জমি থেকেই পাইকারি দরে ফসল বিক্রি করে কৃষকরা লাভবান হন।’
ফসলের ফলন বাড়ানো ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে কৃষি বিভাগ নিয়মিত কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।


























