একদিকে লবণাক্ততার বিস্তার, অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের পানির অনুপ্রবেশ—প্রকৃতির একের পর এক আঘাতে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কমছে কৃষিজমির উৎপাদনক্ষমতা, হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় বিভিন্ন ফসলের জাত। এমন পরিস্থিতিতে উপজেলার ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ধুমঘাট গ্রামের কৃষাণী অল্পনা রানী মিস্ত্রী নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন চার শতাধিক প্রজাতির দেশীয় বীজের সংগ্রহশালা।
নিজের বাড়ির একটি আলাদা কক্ষে কৌটা, বয়াম, প্যাকেট ও বস্তায় যত্নসহকারে সংরক্ষণ করছেন এসব বীজ। ধানের বিভিন্ন জাতের পাশাপাশি রয়েছে দেশীয় শাক-সবজি, ফলজ ও ঔষধি উদ্ভিদের বীজ। অল্পনা রানীর কাছে এসব বীজ শুধু ভবিষ্যৎ চাষাবাদের উপকরণ নয়, উপকূলের কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
সংগ্রহশালায় রয়েছে শতাধিক ধানের জাত, ২৪ প্রকার শিম, আট প্রকার ডাঁটাশাক, ১৫ প্রকার মরিচ, ৫০ থেকে ৬০ প্রকার সবজি, ২২ প্রকার অচাষকৃত উদ্ভিদ এবং শতাধিক ঔষধি উদ্ভিদের বীজ। বিভিন্ন এলাকা থেকে দেশীয় জাতের বীজ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিনিময়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এ ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছেন তিনি।
শুধু নিজের চাষাবাদেই এসব বীজ ব্যবহার করেন না অল্পনা। স্থানীয় কৃষকদেরও বিনামূল্যে বীজ দেন। কেউ আবার নিজেদের সংরক্ষিত বীজের সঙ্গে তাঁর বীজ বিনিময় করেন। বীজ দেওয়ার পাশাপাশি বপন, পরিচর্যা ও সংরক্ষণের পদ্ধতিও শেখান তিনি।
অল্পনা রানী বলেন, ‘হাইব্রিড বীজের ওপর বেশি নির্ভরশীল হলে কৃষককে প্রতিবছর নতুন করে বীজ কিনতে হয়। কিন্তু দেশীয় বীজ নিজেরাই সংরক্ষণ করতে পারি। এতে কৃষক নিজের বীজের মালিকানা ধরে রাখতে পারেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় কৃষকেরা যেসব জাত ব্যবহার করে আসছেন, সেগুলো সংরক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বীজভাণ্ডার গড়ে তুলছি।’
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, অল্পনা রানীর কাছ থেকে বিনামূল্যে বা বীজ বিনিময়ের মাধ্যমে পাওয়া দেশীয় ধানের বীজ তাঁরা জমিতে চাষ করছেন। সবজির বীজ নিয়ে বাড়ির আঙিনা, মাঠ ও ঘেরের ভেড়িতে চাষ করেও লাভবান হচ্ছেন। ভালো ফলন পাওয়া ফসল থেকে পরবর্তী মৌসুমের জন্য বীজ সংগ্রহ করে রাখছেন তাঁরা। এতে বীজ কেনার খরচ কমার পাশাপাশি দেশীয় জাত সংরক্ষণে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
২০০৫ সালে অল্পনা রানীর বীজ সংরক্ষণের যাত্রা শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন এলাকা থেকে দেশীয় জাতের বীজ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিনিময়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বড় হয়েছে তাঁর বীজভাণ্ডার। স্থানীয় কৃষির দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকেই এ উদ্যোগের সূচনা বলে জানান তিনি।
শ্যামনগরের মতো উপকূলীয় এলাকায় কৃষির সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকা গভীরভাবে জড়িত। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি ও লবণাক্ততার কারণে প্রতিবছর অনেক কৃষকের ফসল ও বীজ নষ্ট হয়। অল্পনা রানীর মতে, দুর্যোগের পর কৃষকের হাতে নিজস্ব বীজ থাকলে দ্রুত আবার চাষাবাদ শুরু করা সম্ভব।
বীজ সংরক্ষণের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চাও করছেন অল্পনা। রাসায়নিক কীটনাশকের পরিবর্তে নিমপাতা, মেহগনির ফল, গোবরের ঘুটের ছাই, তুঁতে ও চুনের মিশ্রণে তৈরি বালাইনাশক ব্যবহার করেন তিনি।
দীর্ঘদিনের এই উদ্যোগের স্বীকৃতিও পেয়েছেন অল্পনা রানী। ২০১৪ সালে তিনি জাতীয় কৃষি পুরস্কার পান। এছাড়া জয়িতা সম্মাননাসহ উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
শ্যামনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়ালিউল ইসলাম বলেন, ‘অল্পনা রানীর উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী। স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ কৃষি ঐতিহ্য, জীববৈচিত্র্য ও খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উপকূলীয় অঞ্চলে তাঁর উদ্যোগ ভবিষ্যৎ কৃষির একটি কার্যকর মডেল হতে পারে। দেশীয় বীজ সংরক্ষণ, জৈব কৃষি ও বীজ বিনিময়ের যে সংস্কৃতি তিনি দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তুলেছেন, তা অনুকরণীয়।’


























