রোববার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যশোরে আগাম মেটে আলুর দামে কৃষকের মুখে হাসি

উবাঈদ সামি, যশোর

প্রকাশিত: ১৭:৪০, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যশোরে আগাম মেটে আলুর দামে কৃষকের মুখে হাসি

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবজির অন্যতম প্রধান উৎপাদন এলাকা যশোরে এবার আগাম মেটে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। শীতের আগেই বাজারে আসা এ কন্দজাতীয় ফসলের দামও রয়েছে চড়া। কম খরচ ও তুলনামূলক কম পরিচর্যায় ভালো লাভ হওয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় মেটে আলুর চাষ বেড়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যশোরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ খরিফ-২ মৌসুমে জেলায় ৬ হাজার ৬৬৫ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৬৮০ হেক্টর জমিতে মেটে আলুর চাষ হয়েছে। গত বছর এ পরিমাণ ছিল প্রায় ৫২০ হেক্টর। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার মেট্রিক টন। সদর, ঝিকরগাছা, চৌগাছা ও শার্শায় বাণিজ্যিকভাবে এ আলুর চাষ বেশি হচ্ছে।
যশোর বড় বাজার, চৌগাছা, ঝিকরগাছা ও শার্শার বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি আগাম মেটে আলু ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর একই সময়ে দাম ছিল ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। বড় আকারের আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ৯০ টাকা পর্যন্ত।

যশোর বড় বাজারের পাইকারি সবজি ব্যবসায়ী কামরুল হাসান বলেন, ‘আগাম মেটে আলু বাজারে এলেই মানুষ কিনছে। চিংড়ি মাছ, ইলিশ মাছ দিয়ে মেটে আলুর তরকারি এ অঞ্চলের মানুষের খুব পছন্দ। এখন প্রতিদিন ১ থেকে ২ মণ মেটে আলু বিক্রি করছি। সামনে শীত বাড়লে দাম কিছুটা কমবে।’

কম খরচে বেশি লাভ
যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ তিন বছর ধরে মেটে আলু চাষ করছেন। এবার তিনি ৪০ শতক জমিতে এ আলু চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে মেটে আলু চাষ করতে খরচ হয় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। বীজ, বাঁশের মাচা আর জৈব সার দিলেই হয়। কোনো কীটনাশক লাগে না। এক বিঘা জমি থেকে ৪০ থেকে ৫০ মণ আলু পাওয়া যায়। আগাম বাজারে বিক্রি করলে ১ লাখ টাকার বেশি থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মেটে আলুর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি গরু-ছাগলে খায় না। মাচায় ঝুলে থাকে বলে পচে যাওয়ার ভয় কম। মাটির নিচেও ৫ থেকে ১০ কেজি ওজনের আলু হয়। উপরে একটা, নিচে আরেকটা—ডাবল লাভ।’
চৌগাছার ফুলসারা গ্রামের নারী কৃষক আমির হোসেন বাড়ির আঙিনার পতিত জমিতে মেটে আলু চাষ করে লাভবান হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বাড়ির পাশে ১০ শতক জমিতে ২০টি মেটে আলুর গাছ লাগিয়েছি। তেমন সার-পানি দিতে হয় না। বর্ষার সময় লাগালে এমনিতেই হয়ে যায়। গত বছর ১৫ হাজার টাকার আলু বিক্রি করেছি। এবার আরও বেশি হবে আশা করছি।’

পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তানভীর ইসলাম বলেন, ‘মেটে আলুতে শর্করা, ফাইবার, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে। এটি সহজে হজম হয় এবং শরীরে শক্তি যোগাতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যও পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে।’
তবে মেটে আলুর পুষ্টিগুণ ও রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা নিয়ে যে নির্দিষ্ট দাবিগুলো করা হচ্ছে, সেগুলোর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও প্রাসঙ্গিকতা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

চাষ বাড়াতে উদ্যোগ
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আবুল হাসান বলেন, ‘যশোরের মাটি মেটে আলু চাষের জন্য উপযোগী। বিশেষ করে উঁচু ও বেলে দোআঁশ মাটিতে ফলন ভালো হয়। আমরা কৃষকদের উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ করছি এবং মাচা পদ্ধতিতে চাষে উৎসাহিত করছি।’
তিনি বলেন, ‘মেটে আলু লাভজনক ফসল। একবার বীজ লাগালে পরবর্তী বছরগুলোতেও তা দিয়ে চাষ করা যায়। আমরা চাই, প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় অন্তত দুই-তিনটি মেটে আলুর গাছ থাকুক। এতে পারিবারিক পুষ্টি ও আয় দুটোই বাড়বে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা করা গেলে মেটে আলুর বাজার আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের বাজারে যশোরের মেটে আলুর চাহিদা তৈরি হয়েছে।
 

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ