রোববার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাগজে স্মার্ট কৃষি, মাঠে অনুমানের চাষ

বসির আহাম্মেদ, ঝিনাইদহ

প্রকাশিত: ১৭:১০, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কাগজে স্মার্ট কৃষি, মাঠে অনুমানের চাষ

ধানের চারা সবুজ হয়ে উঠেছে। মাঠজুড়ে দুলছে নতুন ফসলের স্বপ্ন। ভালো ফলনের আশায় কৃষকের ব্যস্ততাও তুঙ্গে। এরই মধ্যে আকাশে জমেছে কালো মেঘ, শুরু হয়েছে বৃষ্টি। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই জমিতে কীটনাশক স্প্রে করছিলেন ঝিনাইদহের কৃষক রয়েল হোসেন।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বৃষ্টির মধ্যে কীটনাশক প্রয়োগ করলে এর কার্যকারিতা কমে যায়।  সার বা কীটনাশক প্রয়োগের পরপর বৃষ্টি হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। তবে রয়েল হোসেনের ধারণা ভিন্ন। তাঁর বিশ্বাস, বৃষ্টির মধ্যে কিংবা কীটনাশক দেওয়ার পর বৃষ্টি হলে ধানের জন্য বরং বেশি উপকার হয়।
রয়েল হোসেনের এই ধারণা বিচ্ছিন্ন নয়। ঝিনাইদহের অনেক কৃষকের চাষাবাদের সিদ্ধান্ত এখনও নির্ভর করে আকাশের মেঘ, জমির দৃশ্যমান অবস্থা ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ওপর। কখন সার দিতে হবে, কখন সেচ দিতে হবে, কখন কীটনাশক প্রয়োগ করা নিরাপদ কিংবা বৃষ্টির আগে জমিতে কী ব্যবস্থা নিতে হবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্যের ব্যবহার এখনও সীমিত।
অথচ কৃষিকে আরও নির্ভুল ও সাশ্রয়ী করতে দেশে রয়েছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, মাটির পিএইচ পরীক্ষা, মাটির আর্দ্রতা পরিমাপ, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের তথ্য, মোবাইল অ্যাপ, সেন্সর ও স্যাটেলাইটসহ নানা প্রযুক্তি। এসব প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে আবহাওয়ার সঙ্গে মিল রেখে চাষাবাদের সময় নির্ধারণ, প্রয়োজন অনুযায়ী সার ও পানি ব্যবহার এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ঝিনাইদহের মাঠে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার এখনও প্রয়োজনের তুলনায় কম।

বড় কৃষক জনগোষ্ঠী, প্রযুক্তিতে বড় ঘাটতি
তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহ জেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮০২ হেক্টর। এসব জমিতে চাষাবাদ করেন প্রায় ৩ লাখ ৫৫ হাজার কৃষক পরিবার। জেলায় মোট কৃষকের সংখ্যা ৭ লাখ ৯২ হাজার ২৩১ জন।
বিপুল এই কৃষক জনগোষ্ঠীর কাছে স্মার্ট কৃষির প্রযুক্তি ও তথ্যভিত্তিক চাষাবাদ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও রয়েছে বড় ধরনের ব্যবধান।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঝিনাইদহে মোট ২ হাজার ৫৩টি মাটির নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। মাটির পিএইচ পরিমাপের যন্ত্র রয়েছে। বৃষ্টির পানি পরিমাপের জন্য রয়েছে রেইন গেজ যন্ত্র। তবে মাটির আর্দ্রতা মাপার যন্ত্র নেই।
ফলে জমিতে কখন সেচ প্রয়োজন এবং মাটিতে বিদ্যমান আর্দ্রতা কতটা—এসব তথ্য নির্ভুলভাবে নির্ধারণের সুযোগ সীমিত। কৃষকের অনেক সিদ্ধান্তই নিতে হচ্ছে চোখে দেখা অবস্থা, প্রচলিত ধারণা ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।

অভিজ্ঞতাই এখনও কৃষকের প্রধান ভরসা
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সার, সেচ ও কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনও অভিজ্ঞতাই তাঁদের বড় ভরসা। মাটির পুষ্টির মাত্রা কিংবা আর্দ্রতা পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষি উপকরণ ব্যবহারের চর্চা সীমিত।
ফলে কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার ও পানি ব্যবহার হচ্ছে, আবার কোথাও সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় উপকরণ না দেওয়ার কারণে ফলন ঝুঁকিতে পড়ছে। আবহাওয়ার পরিবর্তন এই অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কখনও টানা বৃষ্টি, কখনও দীর্ঘ সময় বৃষ্টিহীনতা, আবার কখনও অস্বাভাবিক তাপমাত্রা—সব মিলিয়ে কৃষকের প্রচলিত অভিজ্ঞতার হিসাবও অনেক সময় মিলছে না। ফলে ভুল সময়ে সার বা কীটনাশক প্রয়োগ, অতিরিক্ত সেচ কিংবা বৃষ্টির আগে জমিতে কাজ করার কারণে বাড়ছে উৎপাদন খরচ ও ক্ষতির আশঙ্কা।
শৈলকুপার কৃষক আব্দুল হালিম বলেন, ‘আমরা জমির অবস্থা আর আকাশ দেখে কাজ করি। কখন বৃষ্টি হবে, সেটা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে জানতে পারি না। বৃষ্টি হয়ে গেলে অনেক সময় দেওয়া সার নষ্ট হয়ে যায়। মাটিতে কতটুকু পানি আছে, সেটাও মেপে চাষ করার সুযোগ নেই। তাই অভিজ্ঞতা থেকেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’
কালীগঞ্জের কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আবহাওয়ার খবর আগে থেকে জানা গেলে জমিতে কাজের সময় ঠিক করা সহজ হয়। কিন্তু আমরা নিয়মিতভাবে এসব তথ্য নিয়ে চাষ করি না। অনেক সময় বৃষ্টি হবে কি না, বুঝে ওঠার আগেই সার বা কীটনাশক দিতে হয়।’

মহেশপুরের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, ‘আগের মতো আবহাওয়ার হিসাব মেলে না। কখন বৃষ্টি হবে, কখন গরম পড়বে, বোঝা কঠিন। তাই অনেক সময় আন্দাজ করেই জমিতে কাজ করতে হয়। প্রযুক্তির তথ্য যদি সহজে ও নিয়মিতভাবে হাতে পাওয়া যেত, তাহলে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতো।’

প্রযুক্তি আছে, কৃষকের হাতের নাগালে কতটা?

ঝিনাইদহের কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার একেবারে নেই, এমন নয়। কৃষি বিভাগ ও কৃষকদের উদ্যোগে পলিসেটে চারা উৎপাদন, কোকোপিটে চারা উৎপাদন, ড্রাগন ফল চাষে লাইটিং প্রযুক্তি, পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার, সোলারচালিত সেচব্যবস্থা, হারভেস্টারসহ বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে।
পাশাপাশি জৈব সার ব্যবস্থাপনায় ভার্মি কম্পোস্ট ও ট্রাইকো কম্পোস্ট ব্যবহারের প্রবণতাও রয়েছে। কৃষি-সংক্রান্ত তথ্য ও পরামর্শ পেতে কৃষকদের জন্য কৃষি বাতায়ন, আইকৃষিসহ বিভিন্ন মোবাইলভিত্তিক তথ্যসেবাও রয়েছে।
কৃষি আবহাওয়া তথ্যসেবার মাধ্যমে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পূর্বাভাসের পাশাপাশি ফসলভেদে করণীয় পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কৃষক কতটা নিয়মিতভাবে এসব তথ্য ব্যবহার করছেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

প্রযুক্তি ও তথ্যসেবা চালু থাকা সত্ত্বেও যদি কৃষকের দৈনন্দিন সিদ্ধান্তে তার ব্যবহার না বাড়ে, তাহলে স্মার্ট কৃষির কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের কাছে এসব তথ্য সহজ ভাষায় এবং সঠিক সময়ে পৌঁছে দেওয়া না গেলে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিধি সীমিতই থেকে যাবে।
মাটির আর্দ্রতা জানার সুযোগ নেই
ঝিনাইদহের কৃষিতে অন্যতম বড় ঘাটতি হিসেবে সামনে এসেছে মাটির আর্দ্রতা পরিমাপের সুযোগের সীমাবদ্ধতা। মাটিতে কতটুকু পানি রয়েছে, তা নির্ভুলভাবে জানা গেলে সেচ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা সম্ভব।
কিন্তু এ ধরনের যন্ত্র মাঠপর্যায়ে না থাকায় কৃষককে অনেক সময় মাটির ওপরের অংশ দেখে কিংবা হাতে মাটি নিয়ে আর্দ্রতার ধারণা নিতে হয়।
এর ফলে কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সেচ দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে, আবার কোথাও পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকা সত্ত্বেও কৃষক সেচ দিয়ে ফেলতে পারেন। এতে একদিকে পানি ও বিদ্যুতের অপচয় হতে পারে, অন্যদিকে বাড়তে পারে উৎপাদন ব্যয়।

একইভাবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানা থাকলেও সেই তথ্যকে জমির বর্তমান অবস্থা, মাটির আর্দ্রতা ও ফসলের বয়সের সঙ্গে সমন্বয় করে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।
শুধু পূর্বাভাস নয়, দরকার সিদ্ধান্তের তথ্য

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, স্মার্ট কৃষি মানে শুধু জমিতে আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করা নয়। আবহাওয়ার তথ্য, মাটির অবস্থা, ফসলের বয়স, রোগবালাইয়ের ঝুঁকি এবং কৃষকের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই স্মার্ট কৃষির মূল বিষয়।

আবহাওয়ার তথ্যের সঙ্গে মাটির আর্দ্রতা, পুষ্টির মাত্রা এবং ফসলের বর্তমান অবস্থার তথ্য যুক্ত করা গেলে কৃষিতে আরও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। এতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার, পানি ও কীটনাশক ব্যবহারের প্রবণতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে আবহাওয়াজনিত ক্ষতির ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হতে পারে।
কৃষকের মোবাইল ফোনে শুধু বৃষ্টির পূর্বাভাস পাঠালেই হবে না। কোন ফসলের ক্ষেত্রে কখন সার প্রয়োগ করা উচিত, বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে কীটনাশক প্রয়োগের সময় পরিবর্তন করা প্রয়োজন কি না, জমিতে সেচ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে কি না—এসব তথ্য সহজ ভাষায় ও সময়মতো জানানো গেলে তা কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরাসরি কাজে আসতে পারে।


কৃষি বিভাগের বক্তব্য

ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) আনিসুজ্জামান খান বলেন, ‘আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ করতে ফসলভেদে কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হয়। সঠিক সময়ে এসব তথ্য ব্যবহার করা গেলে সার, সেচ ও বালাইনাশকের ব্যবহার আরও কার্যকর করা সম্ভব। কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্মার্ট কৃষির মূল লক্ষ্য শুধু যন্ত্রের ব্যবহার নয়; তথ্যের ভিত্তিতে কৃষকের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। এজন্য আবহাওয়া, মাটি ও ফসলের তথ্যকে সমন্বিতভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।’
 

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ