সোমবার ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নারকেলে মন্দা, ডাবে ঘুরছে বাগেরহাটের অর্থনীতি

প্রতিনিধি, বাগেরহাট 

প্রকাশিত: ১৩:২০, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৩:২০, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নারকেলে মন্দা, ডাবে ঘুরছে বাগেরহাটের অর্থনীতি

ঘূর্ণিঝড় সিডরের ক্ষত, জলবায়ু পরিবর্তনের লবণাক্ততা আর সাদা মাছি ও ইঁদুরের উপদ্রব—সব মিলিয়ে দুই দশকে আশঙ্কাজনক হারে কমেছে বাগেরহাটের নারকেল উৎপাদন। একসময় জেলার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেও নারকেল তেলের শতাধিক মিল বন্ধ হয়ে গেছে কাঁচামালের অভাবে। তবে ঐতিহ্যের এই ধ্বসে আশার আলো জ্বালিয়েছে ‘কাঁচা নারকেল’ বা ডাব। পাকা নারকেলের বাজার হারালেও দেশজুড়ে তুঙ্গে থাকা ডাবের চাহিদাই এখন ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি যোগাচ্ছে উপকূলীয় এ জেলার কৃষক ও ব্যবসায়ীদের।

বাগেরহাটের দেপাড়া, মুনিগঞ্জ, বৈটপুর, সাইনবোর্ড কিংবা দৈবজ্ঞহাটির মতো অন্তত দেড় শতাধিক মোকামে প্রতিদিন চলে শত শত মণ ডাব কেনাবেচা। এসব আড়ত থেকে ট্রাকে করে ডাব চালান হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বগুড়া, রংপুরসহ দেশের বড় বড় প্রধান শহরগুলোতে।

দেপাড়া বাজারের ‘বরকত ডাব ঘর’-এর ব্যবসায়ী লিটন জানান, সাধারণত সপ্তাহে ৩-৪ দিন গড়ে দেড় হাজার ডাব চালান করলেও গ্রীষ্মের মৌসুমে প্রতিদিন ৩ হাজার পর্যন্ত ডাব পাঠান উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়। সাইনবোর্ড বা দেপাড়ার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বাগান ও ঘেরের পাড় থেকে ৪০-৮৫ টাকায় ডাব কিনে আড়তে ৭৫-১২০ টাকায় হাতবদল করেন, যা শেষপর্যন্ত শহরের খুচরা বাজারে ৮০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়।
সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি ডাটাবেজ না থাকলেও ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের মতে, জেলায় প্রায় দেড়শ আড়তদার, শতাধিক খুচরা বিক্রেতা এবং প্রায় দুই হাজারের বেশি ফড়িয়া ডাব ব্যবসার সাথে সরাসরি যুক্ত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাগেরহাটে ৩ হাজার ৬৯১ হেক্টর জমিতে নারকেলের চাষ হয়েছে, যেখানে উৎপাদন প্রায় ৩৩ হাজার ৭১২ মেট্রিক টন। জেলা কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, নারকেল ও ডাব খাত থেকে বছরে আনুমানিক ৩০০ কোটি টাকা আয় আসছে।

বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা শরীফ সরদার এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আক্ষেপ—আগে যেখানে বার্ষিক উৎপাদন ছিল লাখ মেট্রিক টনের বেশি, সেখানে কাঁচামাল সংকটে তেলের কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে অন্য ব্যবসা ধরতে বাধ্য হয়েছেন অনেকেই।

কচুয়া উপজেলার কৃষক মনির শেখ জানান, ‘গাছে আর আগের মতো নারকেল ধোবে না। রোগবালাইয়ের কারণে উৎপাদন কমলেও বাজারে ডাবের দাম ভালো পাওয়ায় কিছুটা ঘাটতি পোষাচ্ছে।’
কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আব্দুস সালাম তরফদার বলেন, ‘ডেঙ্গুর প্রকোপ ও গরম বাড়লে সারা দেশেই ডাবের চাহিদা আকাশচুম্বী হয়, যা বাগেরহাটের গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রেখেছে।’

তবে কেবল ডাব বেচে দীর্ঘমেয়াদে এ খাত ধরে রাখা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন কৃষিবিদরা। বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোতাহার হোসেনের মতে, সাদা মাছি, মাকড় ও ইঁদুর দমনে কৃষককে আধুনিক প্রযুক্তি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী এই অঞ্চলে একটি ‘নারকেল ও সুপারি গবেষণা কেন্দ্র’ স্থাপন করা গেলে এই উপকূলীয় সম্পদ আবার আগের রূপে ফিরে পেতে পারে।

 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: