সোমবার ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পড়েই নষ্ট হচ্ছে সাড়ে ২৪ কোটি টাকার ফুল মার্কেট 

এস এ সিয়াম 

প্রকাশিত: ১৩:১০, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পড়েই নষ্ট হচ্ছে সাড়ে ২৪ কোটি টাকার ফুল মার্কেট 

ফুলচাষিদের সুবিধার জন্য সাড়ে ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক ফুল বিপণনকেন্দ্র। রয়েছে হিমাগার, কুলিং চেম্বার, প্যাকেজিং ও গ্রেডিংয়ের সুবিধা, এমনকি ফুল বিক্রির জন্য আছে শেডও। অথচ যে মার্কেট কৃষকের পদচারণায় মুখর থাকার কথা, সেটিই বছরের পর বছর পড়ে আছে অনেকটা নিস্তব্ধ। কৃষকরা ফুল নিয়ে ছুটছেন মূল সড়কের পাশের অস্থায়ী হাটে কিংবা সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরের গদখালী বাজারে। ফলে কোটি টাকার অবকাঠামো থাকলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সুফল।

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা ইউনিয়নে নির্মিত বাংলাদেশ-আমেরিকা সৌহার্দ্য ফুল বিপণনকেন্দ্রের এমন চিত্র। সংশ্লিষ্টদের মতে, মূল সমস্যা মার্কেটের অবস্থান, পর্যাপ্ত জায়গার অভাব ও কৃষকদের বাজারমুখী অভ্যাস। তবে কৃষকদের মূল সড়কের পাশে বসার প্রবণতা ঠেকিয়ে নির্ধারিত বিপণনকেন্দ্রে নিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও চলছে উদ্যোগ।
এলজিইডির ঝিকরগাছা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ৩ মে ঝিকরগাছার পানিসারা গ্রামে ফুল ও ফুলের বীজ বিপণন, সংরক্ষণ, গ্রেডিং, প্যাকেজিং, কুলিং চেম্বার ও কোল্ড স্টোরেজ সুবিধাসহ চারতলাবিশিষ্ট আধুনিক ফুল মার্কেট নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এক একর জমির ওপর ৩৫ হাজার ৬৬০ বর্গফুট আয়তনের এ মার্কেট নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ২৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। ২০২১ সালের জুনে নির্মাণকাজ শেষ হয় এবং ২০২২ সালে মার্কেটটি উদ্বোধন করা হয়।

মার্কেটটিতে ফুল ও বীজ সংরক্ষণের জন্য হিমাগার, কুলিং চেম্বার, ফুলের সর্টিং, গ্রেডিং ও প্যাকেজিংয়ের সুবিধা রয়েছে। ভবনের সামনে নির্মাণ করা হয়েছে ৩৯টি দোকানঘর। পরিকল্পনা ছিল, ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীরা এখানে ফুল বিক্রি ও সংরক্ষণের পাশাপাশি প্যাকেজিং করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাবেন এবং ভবিষ্যতে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।

কিন্তু নির্মাণের কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। মার্কেটের শেডগুলো পড়ে আছে অনেকটা অব্যবহৃত অবস্থায়। কখনো কখনো সেখানে ধানসহ অন্যান্য ফসল শুকানো হচ্ছে। অন্যদিকে প্রতিদিন মাঠ থেকে ফুল নিয়ে কৃষকরা চলে যাচ্ছেন গদখালী বাজারে। এতে আধুনিক বিপণনকেন্দ্র থাকলেও কৃষকদের সময় ও খরচ কমার বদলে অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি ভোগান্তি থেকেই যাচ্ছে।
কৃষ্ণচন্দ্রপুর এলাকার ফুলচাষি রমজান আলী প্রায় দুই বিঘা জমিতে গোলাপ, রজনীগন্ধা ও গাঁদাসহ বিভিন্ন ধরনের ফুল চাষ করেন। তিনি বলেন, মার্কেটের শেডগুলো ছোট হওয়ায় সেখানে ফুল রাখতে সমস্যা হয়। একটি শেডে গোলাপ রাখলে অন্য ফুল রাখার জায়গা থাকে না। কিছুদিন মার্কেটটি চালু থাকলেও পরে আবার বন্ধ হয়ে যায়। এর সঙ্গে যাতায়াতের সমস্যাও রয়েছে। মার্কেটটি মূল সড়কের পাশে হলে কৃষকদের জন্য সুবিধা হতো।
গদখালী ফুলচাষি ও ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি আবুল খায়ের বলেন, ফুল বিপণনকেন্দ্রের দুটি হিমাগার বর্তমানে চালু নেই। অপরিকল্পিতভাবে মার্কেটটি নির্মাণ করায় কৃষকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজে আসছে না। গদখালী থেকে দূরে হওয়ায় চাষিরা সেখানে যেতে চান না। পানিসারায় ছোট একটি ইউনিট চালু থাকলেও কৃষকরা সেখানে ফুল রাখতে আগ্রহী নন। শেডের পরিমাণ বাড়ানো হলে কৃষকরা সেখানে ফুল রাখতে পারতেন।
তিনি বলেন, গদখালী বাজার থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সহজে ফুল পাঠানো যায়। তাই ব্যবসায়ীরা দূরের মার্কেটে যেতে চান না। অনেক সময় কৃষকরা ফুল এনে রাখার জায়গা না পেয়ে তা নষ্ট হয়ে যায়। একইভাবে ফুলের বীজ সংরক্ষণেও চাষিদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। যশোর ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলার আলুর হিমাগারে বাড়তি টাকা দিয়ে বীজ সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। অনেক সময় সেখানেও জায়গা পাওয়া যায় না।
তবে কৃষকদের মূল সড়কের পাশে বসে ফুল বিক্রির প্রবণতার বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছেন কৃষি বিপণন বিভাগের কর্মকর্তারা।

যশোর জেলা সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহা বলেন, গদখালী ও পানিসারায় কৃষি বিপণন বিভাগের দুটি ফুল বিপণনকেন্দ্র রয়েছে। গতবার দুটি কেন্দ্রই ইজারা দেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। গদখালীর কেন্দ্রটি ইজারা দেওয়া হলেও পানিসারারটি ইজারা হয়নি। পানিসারার কেন্দ্রটি কিছুটা দূরে হওয়ায় কৃষকরা সেখানে যেতে চান না।

তিনি বলেন, গদখালীর কেন্দ্রটি যিনি ইজারা নিয়েছেন, তিনি সেখানে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। মাঝেমধ্যে সেখানে হাটও বসে। তবে বেশিরভাগ সময় কৃষকরা মূল সড়কের পাশে হাট বসাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাদের ধারণা, সড়কের পাশে ফুল বিক্রি করলে বেশি দাম পাওয়া যাবে এবং ক্রেতাও বেশি পাওয়া যাবে। যদিও বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়।
কিশোর কুমার সাহা আরও বলেন, মূল সড়ক থেকে ফুলের হাট সরিয়ে নির্ধারিত বিপণনকেন্দ্রে নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, এসিল্যান্ড, স্থানীয় থানা ও জেলা কৃষি বিপণন বিভাগ যৌথভাবে কাজ করছে। কৃষকদের সুবিধা এবং বাজার ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, যশোরে প্রায় সাত হাজার ফুলচাষি রয়েছেন। তারা অন্তত ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফুল চাষ করেন। এর মধ্যে ঝিকরগাছার গদখালী, পানিসারা, নাভারণ ও নির্বাসখোলা এলাকার বিভিন্ন মাঠে প্রায় ৬৫০ হেক্টর জমিতে ফুলের চাষ হয়। এসব এলাকায় গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা, জিপসি, রডস্টিক, ক্যালেন্ডোলা ও চন্দ্রমল্লিকাসহ নানা ধরনের ফুল উৎপাদিত হয়। দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ ফুল গদখালী অঞ্চলের চাষিরা সরবরাহ করেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক ফুল বিপণনকেন্দ্রগুলো কার্যকরভাবে চালু করা গেলে ফুল সংগ্রহের পর সর্টিং, গ্রেডিং ও প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে ফুলের মান ও সংরক্ষণক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি বীজ সংরক্ষণে কৃষকদের বাড়তি খরচ কমবে, কমবে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ফুল রপ্তানির সুযোগ তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।
ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবি, শুধু ভবন নির্মাণ করলেই হবে না কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী শেডের পরিমাণ বাড়ানো, হিমাগার সচল করা, যাতায়াতব্যবস্থা সহজ করা এবং নির্ধারিত বিপণনকেন্দ্রে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই সাড়ে ২৪ কোটি টাকার এ অবকাঠামো ফুলচাষিদের সত্যিকারের কাজে আসবে এবং সরকারি বিনিয়োগের সুফল মিলবে।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: