সোমবার ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অভিযানে শত শত বস্তা জব্দ, জেল-জরিমানা

সারের সরবরাহশৃঙ্খলে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা

রানার প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২:৪২, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১২:৪৩, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সারের সরবরাহশৃঙ্খলে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা

আমন মৌসুমে সারের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় সরকারি দামে সার না পাওয়া, বেশি দামে বিক্রি, অবৈধ মজুত ও এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পাচারের অভিযোগ সামনে এসেছে। গত ১৫ দিনে যশোর, মাগুরা, নড়াইল ও ঝিনাইদহে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সার জব্দ করা হয়েছে। কুষ্টিয়ায় কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে এক ডিলারকে জরিমানাও করা হয়েছে। 

কৃষকেরা অভিযোগ করছেন, সরকারি হিসাবে সার থাকলেও প্রয়োজনের সময় নির্ধারিত দামে তা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সরকারি ভর্তুকির সার কৃষকের হাতে পৌঁছানোর সরবরাহশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত ১৫ দিনে খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলা উপজেলায় অভিযান চালিয়ে অন্তত হাজার বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে মাগুরার শ্রীপুরেই দুই অভিযানে জব্দ হয়েছে ৬১৬ বস্তা। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে দুটি অভিযানে ৬১৬ বস্তা সার জব্দের ঘটনা সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতার প্রশ্নটি সামনে এনেছে। ৬ সেপ্টেম্বর আমলসার পূর্বপাড়া এলাকার তিনটি গুদামে অভিযান চালিয়ে ৩২৮ বস্তা সার জব্দ করে উপজেলা প্রশাসন। এর মাত্র চার দিন পর ১০ সেপ্টেম্বর টিকারবিলা বাজারে অভিযান চালিয়ে আরও ২৮৮ বস্তা সার জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ছিল ১৩৯ বস্তা টিএসপি ও ১৪৯ বস্তা ডিএপি। এ ঘটনায় জামিরুল ইসলামকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা ও সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘অবৈধভাবে সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করার খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় অভিযান চালিয়ে এসব সার জব্দ করা হয়েছে। জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসমাউল হুসনা পিংকি বলেন, ‘কৃষি খাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি কিংবা কোনো ধরনের অসাধু পন্থার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এর আগে নড়াইলের লোহাগড়ায় ২ সেপ্টেম্বর রাতে কালোবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে পাচারের সময় ৪০ বস্তা সরকারি সারসহ একটি নসিমন আটক করা হয়। পরে জব্দ করা সার স্থানীয় কৃষকদের কাছে ন্যায্য মূল্যে উন্মুক্ত নিলামে বিক্রি করা হয়। ঝিনাইদহের শৈলকূপাতেও ৮ সেপ্টেম্বর পাচারের সময় এক হাজার কেজি বা ২০ বস্তা সার জব্দ করা হয়।  

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ১০ সেপ্টেম্বর সময়মতো দোকান না খোলা ও কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে এক বিসিআইসি ডিলারকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
যশোরে সারের সংকট ও বাড়তি দামের অভিযোগ আরও স্পষ্ট। কৃষকেরা জানিয়েছেন, নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে তাঁদের একাধিক দোকানে ঘুরতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও বস্তাপ্রতি দ্বিগুণ টাকা বেশি দিয়ে তারা সার কিনছেন। 
যশোর সদর উপজেলার বাগডাঙ্গা গ্রামের কৃষক হজরত আলী জানান, পাঁচ বিঘা আমন জমির জন্য তাঁকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে হয়েছে। ঝিকরগাছার কৃষক আব্দুল আলিম জানান, টিএসপি না পেয়ে খোলা বাজার থেকে প্রতি কেজি ৫২ টাকা দরে কিনতে হয়েছে। অথচ সরকারিভাবে এই সারের দাম ২৭ টাকা। 

আর যশোর সদরের রাহেলাপুরের কৃষক শরিফউদ্দিনের অভিযোগ, খুচরা বাজারে ইউরিয়া তাঁকে কেজিপ্রতি ৩৫ টাকা পর্যন্ত কিনতে হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন কৃষকের ভাষ্য, ‘টাকা বেশি দিলে সার আছে, কম দিলে নেই।’
কৃষকদের এসব অভিযোগের সঙ্গে অবশ্য কৃষি বিভাগের বক্তব্যের পার্থক্য রয়েছে। কৃষি বিভাগের দাবি, জেলায় প্রয়োজন অনুযায়ী সার বরাদ্দ ও মজুত রয়েছে এবং সংকট নেই। ফলে সরকারি হিসাবে সরবরাহ থাকার পরও কৃষকেরা কেন নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছেন না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

এ ব্যাপারে জাতীয় কৃষক-খেত মজুর সমিতির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক তসলিম উর রহমান বলেন, ‘আমন মৌসুমে সার না পেয়ে ব্যাপক সংকটের মধ্যে রয়েছে কৃষক। যা আমাদের ১৫ জন কৃষককে গুলি করে হত্যার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কৃষক ক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে। যা গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিতে পারে।’

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: