দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত যশোরে বাণিজ্যিকভাবে হলুদ চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। উর্বর মাটি, অনুকূল আবহাওয়া এবং কৃষি বিভাগের কারিগরি সহায়তায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বাড়ছে হলুদের আবাদ। অনাবাদি ও ফলদ বাগানের ছায়াযুক্ত জমিতে সাথি ফসল হিসেবে চাষের সুযোগ থাকায় কৃষকদের কাছে হলুদ ক্রমেই লাভজনক ফসল হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা, শার্শা ও মণিরামপুর উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, একসময় পতিত পড়ে থাকা ও ছায়াযুক্ত জমিতে এখন হলুদের সবুজ পাতায় ভরে গেছে মাঠ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার আটটি উপজেলায় হলুদ চাষ করা হয়েছে। ‘বারি হলুদ-১’ ও ‘বারি হলুদ-২’ জাতের আবাদই বেশি।
কৃষকদের ভাষ্য, ধান ও সবজির তুলনায় হলুদ চাষে রোগবালাই ও উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম। নির্দিষ্ট সময়ে বীজ রোপণের পর অতিরিক্ত সেচ ও রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না। ফলে সঠিক পরিচর্যায় এ ফসল থেকে ভালো মুনাফা পাওয়া সম্ভব।
শার্শার নাভারন এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগে ধান ও নানা জাতের সবজি চাষ করতাম। কিন্তু সার ও সেচের চড়া দামের কারণে লাভের মুখ দেখা কঠিন হতো। গত বছর পরীক্ষামূলকভাবে এক বিঘা জমিতে হলুদ চাষ করে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৮০ হাজার টাকা লাভ হয়। সেই অনুপ্রেরণা থেকে এবার আরও এক বিঘা বাড়িয়ে মোট দুই বিঘা জমিতে আবাদ করেছি।’
তিনি বলেন, ‘মে মাসে রোপণ করা হলুদ আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসের দিকে তোলা শুরু হবে। আশা করছি এবারও ভালো মুনাফা পাব।’
বাগানের ছায়ায় বাড়তি আয়
হলুদ চাষের অন্যতম সুবিধা হলো ফলদ বাগানের ছায়াযুক্ত জমিতেও এটি চাষ করা যায়। যশোরের অনেক কৃষক আম, কাঁঠাল, লিচু ও মেহগনি বাগানের ফাঁকা জায়গায় হলুদ আবাদ করছেন।
ঝিকরগাছার নাভারণ দেউলি গ্রামের কৃষক শাহাজান আলী জানান, তাঁর তিন বিঘা আমবাগানে ছায়ার কারণে আগে অন্য কোনো ফসল চাষ করা যেত না। কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে সেখানে বারি জাতের হলুদ চাষ শুরু করেন তিনি। তাঁর দাবি, পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হওয়ায় কীটনাশকের ব্যবহারও কমেছে। এতে উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি আমবাগান থেকে বাড়তি আয় হচ্ছে।
বাড়ছে প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ
স্থানীয় বাজারে কাঁচা হলুদের পাশাপাশি সিদ্ধ, শুকানো ও গুঁড়া করে বাজারজাতের সুযোগও তৈরি হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে যশোরের হলুদ ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন মসলা প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ হচ্ছে।
সাতমাইল বাজারের পাইকারি মসলা ব্যবসায়ী সামসুল আলম বলেন, ‘যশোরের হলুদের রঙ ও সুগন্ধ ভালো হওয়ায় প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এর চাহিদা রয়েছে।’ তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কাঁচা হলুদ প্রতি মণ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং শুকনো হলুদ প্রতি মণ ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কৃষকেরা কাঁচা হলুদ বিক্রির পরিবর্তে শুকিয়ে বাজারজাত করলে বেশি লাভ পেতে পারেন।
হলুদ প্রক্রিয়াজাতকরণে গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে। হলুদ তোলা, ধোয়া, সিদ্ধ করা, শুকানো ও বাছাইয়ের কাজে যুক্ত হচ্ছেন স্থানীয় নারী শ্রমিকরা। কয়েকটি নারী উদ্যোক্তা দল ঘরে বসে হলুদ গুঁড়া করে প্যাকেটজাত করে স্থানীয় বাজার ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্রি করছেন।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. তানভীর ইসলাম বলেন, ‘হলুদ একটি মূল্যবান মসলা জাতীয় ফসল, যা পুষ্টিগুণ ও ঔষধি গুণে সমৃদ্ধ।’
হলুদে থাকা কারকিউমিনের প্রদাহনাশক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পরিমিত হলুদ গ্রহণ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়ক হতে পারে। তবে ভেজালমুক্ত হলুদ উৎপাদন ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।’
যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক প্রতাপ মণ্ডল বলেন, ‘যশোরের মাটি মসলা জাতীয় ফসল চাষের জন্য খুবই উপযোগী। কৃষকদের উচ্চমূল্যের মসলা ফসল চাষে উৎসাহিত করতে কৃষি বিভাগ উন্নত জাতের বীজ, সার ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘হলুদ একটি দীর্ঘমেয়াদি ফসল হলেও এর বাণিজ্যিক মূল্য ও সংরক্ষণ ক্ষমতা বেশি। মসলায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও আমদানি-নির্ভরতা কমাতে যশোরের এই উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে।’
যশোরে হলুদের আবাদ বাড়ার পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতব্যবস্থা আরও উন্নত হলে কৃষকের আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে এ ফসলকে ঘিরে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হতে পারে।


























